মার্কিন কংগ্রেস। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ২২ মার্চ- জাতিসংঘের ‘কনভেনশন অন দ্য প্রিভেনশন অ্যান্ড পানিশমেন্ট অব দ্য ক্রাইম অব জেনোসাইড’ অনুযায়ী গণহত্যা বলতে বোঝায় কোনো জাতীয়, জাতিগত, নৃগোষ্ঠীগত বা ধর্মীয় গোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে পরিচালিত যেকোনো কর্মকাণ্ড। এই সংজ্ঞার আলোকে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মানুষের ওপর পাকিস্তানি বাহিনীর চালানো নৃশংসতার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি নিশ্চিত করার দাবি আবারও জোরালো হয়েছে।
মানবতাবিরোধী অপরাধ, যুদ্ধাপরাধ ও গণহত্যার মতো ইতিহাসের ভয়াবহ ঘটনাগুলো ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নথিবদ্ধ ও সংরক্ষণ করা জরুরি উল্লেখ করে প্রতিনিধি পরিষদে একটি প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, এসব ঘটনার স্মৃতি সংরক্ষণ করলে একদিকে যেমন ভুক্তভোগীদের প্রতি সম্মান জানানো সম্ভব হয়, অন্যদিকে ভবিষ্যতে এ ধরনের নৃশংসতা প্রতিরোধেও তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
উত্থাপিত প্রস্তাবে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে বাংলাদেশের নিরস্ত্র মানুষের ওপর পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনীর চালানো নৃশংসতার তীব্র নিন্দা জানানো হয়েছে। ওই রাতে শুরু হওয়া দমন-পীড়ন অভিযানে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ, ধরপাকড় এবং নির্যাতনের মাধ্যমে একটি জাতিকে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা চালানো হয় বলে এতে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রস্তাবে আরও বলা হয়, পাকিস্তান সেনাবাহিনী এবং তাদের সহযোগী ইসলামপন্থী গোষ্ঠীগুলো ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে জাতিগত বাঙালিদের ওপর নির্বিচার হত্যাকাণ্ড চালায়। একই সঙ্গে রাজনৈতিক নেতা, বুদ্ধিজীবী, পেশাজীবী এবং শিক্ষার্থীদের টার্গেট করে হত্যা করা হয়। হাজার হাজার নারীকে যৌন সহিংসতার শিকার করা হয় এবং অনেককে জোরপূর্বক যৌনদাসী হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
বিশেষভাবে হিন্দু ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের লক্ষ্য করে পরিকল্পিতভাবে গণহত্যা, গণধর্ষণ, জোরপূর্বক ধর্মান্তর এবং দেশছাড়া করার মতো ঘটনাগুলো ঘটানো হয়েছিল বলেও প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়। এসব কর্মকাণ্ড একটি নির্দিষ্ট জাতিগত ও ধর্মীয় গোষ্ঠীকে ধ্বংসের উদ্দেশ্যেই পরিচালিত হয়েছিল বলে এতে তুলে ধরা হয়েছে।
তবে প্রস্তাবে এ বিষয়টিও স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, কোনো নির্দিষ্ট জাতিগোষ্ঠী বা ধর্মীয় সম্প্রদায়কে তাদের কোনো সদস্যের অপরাধের জন্য দায়ী করা যায় না। অর্থাৎ ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর অপরাধের দায় সমগ্র জাতি বা ধর্মের ওপর বর্তায় না।
সবশেষে প্রস্তাবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে, যেন ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনী এবং তাদের সহযোগী জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে বাঙালি জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর চালানো নৃশংসতাকে আনুষ্ঠানিকভাবে মানবতাবিরোধী অপরাধ, যুদ্ধাপরাধ ও গণহত্যা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
এই প্রস্তাবটি গৃহীত হলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত গণহত্যার স্বীকৃতি আরও জোরদার হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। একই সঙ্গে এটি ইতিহাসের সত্য প্রতিষ্ঠা এবং ভুক্তভোগীদের প্রতি ন্যায্য সম্মান প্রদর্শনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।