অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন এলাকায় পেট্রোল ও ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি প্রায় ৩ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ২৩ মার্চ- মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত ক্রমেই অনিশ্চিত দিকে এগোতে থাকায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে এবং তেলের দাম দ্রুত ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছে। অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন এলাকায় পেট্রোল ও ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি প্রায় ৩ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। শহর থেকে শুরু করে গ্রামীণ এলাকাতেও অনেক পেট্রোল পাম্পে জ্বালানি সংকট দেখা দিচ্ছে, কোথাও কোথাও সরবরাহ একেবারেই শেষ হয়ে যাওয়ার খবরও মিলছে।
তবে অস্ট্রেলিয়া সরকার এখনো বলছে, দেশে জ্বালানি সরবরাহে কোনো ঘাটতি নেই। যদিও বাস্তবে কতদিনের জন্য জ্বালানি মজুদ রয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
দেশটির জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস বোয়েন এক সাক্ষাৎকারে জানান, পেট্রোলের মজুদ কিছুটা বেড়ে বর্তমানে প্রায় ৩৮ দিনের সরবরাহ রয়েছে। অন্যদিকে ডিজেল ও জেট জ্বালানির মজুদ প্রায় ৩০ দিনের মতো, যা তুলনামূলক স্থিতিশীল অবস্থায় আছে। তিনি বলেন, কৌশলগত মজুদ থেকে অতিরিক্ত জ্বালানি ছাড়া হলেও সমুদ্রপথে নিয়মিত জাহাজ আসায় সরবরাহ বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে। পাশাপাশি দেশের তেল শোধনাগারগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় কাজ করছে এবং স্থানীয় চাহিদা পূরণেই অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
অস্ট্রেলিয়ার জ্বালানি সরবরাহের বড় অংশই আমদানিনির্ভর। দেশটির মোট তেলের মাত্র প্রায় ১০ শতাংশ নিজস্ব উৎস থেকে আসে। তবে আশ্চর্যের বিষয়, এই আমদানির বেশিরভাগই সরাসরি মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে না। দক্ষিণ কোরিয়া ও সিঙ্গাপুর অস্ট্রেলিয়ার প্রধান জ্বালানি সরবরাহকারী দেশ। এছাড়া মালয়েশিয়া, ভারত, তাইওয়ান ও চীন থেকেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তেল আসে।

অস্ট্রেলিয়ায় জ্বালানির দাম বাড়ছে। ছবিঃ সংগৃহীত
তবে এই দেশগুলোর বেশিরভাগই তাদের জ্বালানি সংগ্রহ করে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে, যেখানে সৌদি আরব, ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার ও ওমান গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী। সাম্প্রতিক সংঘাত এবং ইরানের হামলার প্রভাবে এসব দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়েছে। এর পাশাপাশি হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় জাহাজ চলাচল ব্যাহত হচ্ছে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে।
জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় রেশনিং বা সীমিত সরবরাহের প্রশ্নও সামনে এসেছে। সরকার এখনো বলছে, এমন কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, আগেভাগেই সীমিত সরবরাহ চালু করা হলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সহজ হতে পারে। তাদের মতে, সীমিত মজুদ এবং মানুষের আতঙ্কজনিত অতিরিক্ত কেনাকাটা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
প্রস্তাবিত কিছু পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে গাড়ির নম্বরপ্লেট অনুযায়ী নির্দিষ্ট দিনে জ্বালানি নেওয়ার অনুমতি, একদিন পরপর গাড়ি চালানো, বাসা থেকে কাজ করা এবং গতিসীমা কমিয়ে আনা। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এসব পদক্ষেপ সঠিকভাবে পরিচালনা না হলে উল্টো আতঙ্ক বাড়িয়ে মানুষকে আরও বেশি জ্বালানি কিনতে উদ্বুদ্ধ করতে পারে।
উপপ্রধানমন্ত্রী রিচার্ড মার্লেস বলেছেন, পরিস্থিতি অনেকটাই নির্ভর করছে এই সংঘাত কতদিন স্থায়ী হয় তার ওপর। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে ভবিষ্যতে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া ছাড়া বিকল্প নাও থাকতে পারে।
অস্ট্রেলিয়ায় সর্বশেষ জ্বালানি রেশনিং চালু হয়েছিল ১৯৭৯ সালে, যা ইরান-সংক্রান্ত বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের সঙ্গেই সম্পর্কিত ছিল। এর আগে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় দেশটিতে বড় পরিসরে জ্বালানি রেশনিং কার্যকর করা হয়েছিল।
এদিকে জ্বালানির দাম কবে কমবে, তা পুরোপুরি নির্ভর করছে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের ওপর। বর্তমানে বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যাহত হওয়ায় তেলের দাম উচ্চ অবস্থায় রয়েছে এবং তা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে মানুষের আতঙ্কজনিত অতিরিক্ত জ্বালানি ক্রয়, যা বাজারে চাপ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
সরকার জনগণকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে জ্বালানি মজুদ না করার আহ্বান জানিয়েছে। তাদের মতে, আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত কেনাকাটা করলে সরবরাহব্যবস্থা ও বাজারমূল্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে এবং সামগ্রিক সংকট আরও গভীর হতে পারে।
সূত্রঃ নাইন নিউজ