নর্থ অস্ট্রেলিয়ার উপকূলীয় এলাকা ফিনিস আসনে বিজয়ী স্বতন্ত্র প্রার্থী লু নিকলসন। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ৩০ মার্চ- নর্থ অস্ট্রেলিয়ার নির্বাচনে এক ঐতিহাসিক ও নজিরবিহীন ফলাফল সামনে এসেছে, যা পছন্দক্রমভিত্তিক ভোটব্যবস্থার একটি বিরল উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। দেশটির অভিজ্ঞ নির্বাচন বিশ্লেষক অ্যান্টনি গ্রিন এই ফলাফলকে অত্যন্ত বিস্ময়কর বলে উল্লেখ করেছেন।
তার মতে, এই নির্বাচনে এমন একটি ঘটনা ঘটেছে যেখানে প্রাথমিক ভোটে চতুর্থ অবস্থানে থাকা একজন প্রার্থী শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়েছেন, যা পছন্দক্রমভিত্তিক ভোটব্যবস্থায় খুবই বিরল। নর্থ অস্ট্রেলিয়ার উপকূলীয় এলাকা ফিনিস আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী লু নিকলসন এই অবিশ্বাস্য জয় অর্জন করেছেন।
প্রাথমিক গণনায় তিনি চতুর্থ স্থানে থাকলেও পরবর্তীতে অন্যান্য প্রার্থীদের বাদ পড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের ভোটের পছন্দক্রম তার পক্ষে আসতে শুরু করে। ফলে ধাপে ধাপে তিনি এগিয়ে গিয়ে প্রথমে লেবার প্রার্থীকে এবং পরে ওয়ান নেশন প্রার্থীকে অতিক্রম করে চূড়ান্ত ফলাফলে জয় নিশ্চিত করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এই জয়ের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে ওয়ান নেশন দলের ভোটারদের পছন্দক্রম। নির্বাচনের আগে এটি অনিশ্চিত ছিল যে এই দলের ভোটাররা কাকে দ্বিতীয় পছন্দ হিসেবে বেছে নেবেন। শেষ পর্যন্ত সেই ভোটের বড় অংশ নিকলসনের পক্ষে যাওয়ায় তার জয় নিশ্চিত হয়।
এই ফলাফল একই সঙ্গে ওয়ান নেশন দলের ভূমিকা সম্পর্কেও নতুন দৃষ্টিভঙ্গি সামনে এনেছে। নির্বাচনের আগে ধারণা করা হচ্ছিল, দলটি রাজ্যজুড়ে দ্বিতীয় অবস্থানে উঠে আসতে পারে এবং আসনও জিততে পারে। তবে বাস্তবে অন্তত ফিনিস আসনে দলটি সরাসরি জয়ী না হয়ে বরং অন্য প্রার্থীর জয়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ‘প্রেফারেন্স’ সরবরাহকারী হিসেবে ভূমিকা রেখেছে।
পুরো নির্বাচনে ওয়ান নেশন উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছে। ২০২৬ সালের নর্থ অস্ট্রেলিয়া নির্বাচনে দলটি মোট ছয়টি আসন পেয়েছে, যার মধ্যে তিনটি হাউস অব অ্যাসেম্বলিতে এবং তিনটি লেজিসলেটিভ কাউন্সিলে। দলটি প্রায় ২২ দশমিক ৮ শতাংশ প্রাথমিক ভোট অর্জন করেছে, যা তাদের জন্য একটি বড় অগ্রগতি। এমনকি লিবারেল পার্টির অন্যতম শক্ত ঘাঁটি ম্যাককিলপ আসনটিও তাদের দখলে গেছে।
তবে এই নির্বাচনের সামগ্রিক চিত্রে দেখা যাচ্ছে, লেবার পার্টি রাজ্যজুড়ে বড় ব্যবধানে জয় পেলেও বিরোধী ভোট একাধিক দলে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। লিবারেল, ওয়ান নেশন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে ভোট ভাগ হয়ে যাওয়ায় অনেক আসনে অপ্রত্যাশিত ফলাফল তৈরি হয়েছে।
জাতীয় রাজনীতিতেও এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। সাম্প্রতিক জনমত জরিপে দেখা গেছে, প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ নেতৃত্বাধীন সরকারের জনপ্রিয়তা গত নির্বাচনের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। একই সময়ে কোয়ালিশন জোটের সমর্থনও খুব একটা বাড়েনি, যদিও নেতৃত্বে পরিবর্তন আনা হয়েছে।
অন্যদিকে অর্থনৈতিক চাপ, বিশেষ করে ইরান যুদ্ধের প্রভাব, মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি এবং জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ার মতো বিষয়গুলো ভোটারদের মধ্যে বড় প্রভাব ফেলেছে। জরিপে দেখা গেছে, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির জন্য অধিকাংশ ভোটার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-কে দায়ী করেছেন।
সব মিলিয়ে নর্থ অস্ট্রেলিয়ার এই নির্বাচন শুধু একটি রাজ্যের ফলাফল নয়, বরং পছন্দক্রমভিত্তিক ভোটব্যবস্থার প্রভাব, ভোট বিভাজনের বাস্তবতা এবং পরিবর্তিত রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতির একটি স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে চতুর্থ স্থান থেকে উঠে এসে স্বতন্ত্র প্রার্থীর জয় প্রমাণ করেছে, এই ব্যবস্থায় শেষ পর্যন্ত ফল নির্ধারণে ভোটারদের দ্বিতীয় ও তৃতীয় পছন্দ কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।