অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের মর্মান্তিক মৃত্যু, ছবি : সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ৩১ মার্চ- ভারতের টালিউড অঙ্গনের পরিচিত মুখ অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়-এর আকস্মিক মৃত্যু ঘিরে শোকের মধ্যেই সামনে এসেছে প্রাথমিক ময়নাতদন্তের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। এতে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, পানিতে ডুবে যাওয়ার কারণেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে। সোমবার কলকাতায় সম্পন্ন হয়েছে তাঁর শেষকৃত্য, যেখানে সহকর্মী, বন্ধু, ভক্ত ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের উপস্থিতিতে আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
রোববার তালসারিতে একটি শুটিং চলাকালে দুর্ঘটনার পর গুরুতর অবস্থায় তাঁকে প্রথমে দিঘা স্টেট জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে তাঁর মরদেহ পাঠানো হয় তাম্রলিপ্ত গভর্নমেন্ট মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের মর্গে। সোমবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে শুরু হয় ময়নাতদন্ত।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, প্রাথমিক ময়নাতদন্তে তাঁর ফুসফুস ও খাদ্যনালিতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বালু ও নোনাপানি পাওয়া গেছে। চিকিৎসকদের মতে, এটি পানিতে ডুবে মৃত্যুর একটি সুস্পষ্ট লক্ষণ। এমনকি তাঁর শ্বাসনালিতেও বালুকণার উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে, যা সাধারণত দীর্ঘ সময় পানির নিচে অবস্থান করলে ঘটে।
ময়নাতদন্তে আরও দেখা যায়, তাঁর ফুসফুস অস্বাভাবিকভাবে ফুলে গিয়ে প্রায় দ্বিগুণ আকার ধারণ করেছিল। চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, বালু ও পানি প্রবেশের ফলে ফুসফুসের ভেতরের বায়ুথলিগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং অক্সিজেন আদান-প্রদান বন্ধ হয়ে যায়, যা ডুবে মৃত্যুর ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া।
হাসপাতাল সংশ্লিষ্টরা ধারণা করছেন, শরীরে যে পরিমাণ বালু ও নোনাপানি পাওয়া গেছে, তাতে তিনি অন্তত এক ঘণ্টার বেশি সময় পানির নিচে ছিলেন। এ ছাড়া তাঁর শরীরে বড় ধরনের আঘাতের কোনো স্পষ্ট চিহ্ন পাওয়া যায়নি, যা ঘটনাটিকে দুর্ঘটনাজনিত ডুবে মৃত্যুর দিকেই ইঙ্গিত করছে। তবে এটি প্রাথমিক প্রতিবেদন, পূর্ণাঙ্গ ফরেনসিক রিপোর্ট প্রকাশ হলে মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট সময় ও পরিস্থিতি সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানা যাবে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা।
ময়নাতদন্তের সময় মর্গের সামনে স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। প্রিয় অভিনেতাকে শেষবারের মতো দেখতে সেখানে জড়ো হন অসংখ্য ভক্ত। হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স ও শিক্ষার্থীদের মধ্যেও শোকের আবহ দেখা যায়।
ময়নাতদন্ত শেষে দুপুরে তাঁর মরদেহ কলকাতার উদ্দেশে রওনা হয় এবং বেলা ২টা ৪৫ মিনিটের দিকে পৌঁছায় বিজয়গড়ের বাসভবনে। সেখানে আগে থেকেই উপস্থিত ছিলেন সহকর্মী, প্রতিবেশী ও ঘনিষ্ঠজনেরা। অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শোক জানিয়ে বলেন, প্রিয় মানুষটির নিথর দেহের মুখোমুখি হওয়ার শক্তি তাঁদের নেই।
বিকেল ৪টা ১০ মিনিটে তাঁর মরদেহ কেওড়াতলা মহাশ্মশানের উদ্দেশে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে পৌঁছানোর পর কিছু সময়ের জন্য বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয় বলে জানা গেছে। অভিযোগ ওঠে, বেছে বেছে নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের ভেতরে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছিল, যা নিয়ে শৈশবের বন্ধুদের সঙ্গে বাগ্বিতণ্ডা হয়।
শেষ বিদায়ে উপস্থিত ছিলেন টালিউডের অনেক পরিচিত মুখ। তাঁদের মধ্যে ছিলেন প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়, কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়, চূর্ণী গঙ্গোপাধ্যায়, গৌরব চক্রবর্তী, ঋদ্ধিমা ঘোষ, অনন্যা চট্টোপাধ্যায়, রুকমা রায়, অঙ্কুশ হাজরা, রুদ্রনীল ঘোষ ও ইন্দ্রাশিস আচার্য। এর আগে তাঁর বাসভবনে উপস্থিত ছিলেন আবির চট্টোপাধ্যায় ও রূপম ইসলামসহ আরও অনেকে।
পরিবারের ইচ্ছা অনুযায়ী ব্যক্তিগত পরিসরেই তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হয়। ছেলের হাতের অগ্নিসংযোগের মধ্য দিয়ে চিরবিদায় নেন এই অভিনেতা।
শেষযাত্রায় তাঁর ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও পছন্দের নানা প্রতিফলনও দেখা যায়। বামপন্থী নেতা-কর্মীরা তাঁকে ‘লাল সালাম’ জানান এবং লাল পতাকায় মোড়া হয় শববাহী গাড়ি। ফুটবলপ্রেমী হিসেবে পরিচিত এই অভিনেতার প্রতি ভালোবাসা জানাতে ইস্ট বেঙ্গল ও আর্জেন্টিনার সমর্থকদের উপস্থিতিও লক্ষ্য করা যায়।
হঠাৎ এই মৃত্যু টালিউড অঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া ফেলেছে। সহকর্মীরা বলছেন, তিনি শুধু একজন জনপ্রিয় অভিনেতাই ছিলেন না, বরং ছিলেন সবার কাছের একজন মানুষ। তাঁর এই অকাল প্রয়াণে শোক নেমে এসেছে শিল্পীসমাজ থেকে সাধারণ দর্শকের মাঝেও।