গুরুতর আহত মোজতবা খামেনি জন্য প্রয়োজন কৃত্রিম পা ও মুখে প্লাস্টিক সার্জারি
মেলবোর্ন, ২৪ এপ্রিল- ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি গুরুতর আহত অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন এবং তাঁর শারীরিক অবস্থার কারণে ভবিষ্যতে কৃত্রিম পা সংযোজন ও প্লাস্টিক সার্জারির…
মেলবোর্ন, ২৪ এপ্রিল- দেশে হামের প্রকোপ হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে স্বাস্থ্য খাতের নাজুক বাস্তবতা আবারও সামনে এসেছে। বিশেষ করে শিশুদের নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম নিয়ে তৈরি হয়েছে বড় ধরনের উদ্বেগ। একদিকে মাঠপর্যায়ে টিকা ঘাটতির কথা বলছে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা, অন্যদিকে সরকারের উচ্চপর্যায়ের বক্তব্যে উঠে আসছে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। এই দ্বৈত অবস্থান জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে।
দেশজুড়ে শিশুদের নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে হামসহ বিভিন্ন প্রতিরোধযোগ্য রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। বিশেষ করে ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে এই ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।
সরকারিভাবে প্রান্তিক পর্যায়ে টিকা সরবরাহের দায়িত্বে থাকা সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দেশে হামের সংক্রমণ হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় তাদের সংরক্ষিত টিকা থেকে প্রায় দুই কোটি ডোজ এখন জরুরি ভিত্তিতে শিশুদের দেওয়া হচ্ছে। ফলে নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমের জন্য নির্ধারিত মজুত দ্রুত কমে আসছে। তাদের আশঙ্কা, আগামী দুই মাসের মধ্যে নতুন করে টিকা সংগ্রহ করা সম্ভব না হলে নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে।
বর্তমানে দেশে এই কর্মসূচির আওতায় নয় ধরনের টিকার মাধ্যমে ১২টি রোগ প্রতিরোধ করা হয়। শিশুদের জন্য নির্ধারিত টিকাগুলোর মধ্যে রয়েছে যক্ষ্মা প্রতিরোধে বিসিজি, পাঁচটি রোগ প্রতিরোধে পেন্টা, নিউমোনিয়া প্রতিরোধে পিসিভি, পোলিও নির্মূলে ওপিভি ও আইপিভি, টাইফয়েড প্রতিরোধে টিসিভি এবং হাম ও রুবেলা প্রতিরোধে এমআর টিকা। এছাড়া কিশোরীদের জন্য জরায়ুমুখ ক্যানসার প্রতিরোধে এইচপিভি এবং নারীদের জন্য টিডি টিকাও প্রদান করা হয়।
তবে ইপিআইয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, শিশুদের জন্য নির্ধারিত সাতটি টিকার মধ্যে আইপিভি ও টিসিভি ছাড়া বাকি পাঁচটি টিকার মজুত বর্তমানে কেন্দ্রীয় গুদামে শূন্য। অর্থাৎ যক্ষ্মা, নিউমোনিয়া, হাম-রুবেলা এবং একাধিক সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ টিকাগুলোর কোনো কেন্দ্রীয় মজুত নেই।
এ বিষয়ে ইপিআইয়ের সহকারী পরিচালক ডা. হাসানুল মাহমুদ বলেন, কেন্দ্রীয়ভাবে টিকার মজুত না থাকলেও মাঠপর্যায়ে কিছু টিকা এখনও রয়েছে, যা দিয়ে আপাতত কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। তিনি জানান, সরকার ইতোমধ্যে ৬০৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে এবং নতুন টিকা কেনার প্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। তবে আন্তর্জাতিক প্রক্রিয়া ও ক্রয়সংক্রান্ত জটিলতার কারণে তাৎক্ষণিকভাবে টিকা সংগ্রহ করা সম্ভব নয়।
তিনি আরও বলেন, কোনো এলাকায় সাময়িকভাবে টিকার ঘাটতি দেখা দিলে শিশুরা পরে সেই টিকা নিতে পারবে, এতে দীর্ঘমেয়াদে বড় কোনো সমস্যা হবে না বলে তারা আশা করছেন। তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এই বক্তব্যের সঙ্গে পুরোপুরি একমত নন।
এদিকে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন সম্পূর্ণ ভিন্ন দাবি করেছেন। রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে তিনি জানান, দেশে সব ধরনের টিকার পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে এবং আগামী ছয় মাস টিকাদান কার্যক্রমে কোনো সমস্যা হবে না। তিনি বিশেষভাবে যক্ষ্মাসহ অন্যান্য টিকার কোনো ঘাটতি নেই বলেও দাবি করেন।
সাংবাদিকরা যখন ইপিআইয়ের তথ্য তুলে ধরে টিকার সংকট নিয়ে প্রশ্ন করেন, তখন মন্ত্রী সেই তথ্য নাকচ করে দেন এবং ভিন্নমত পোষণ করেন। ফলে সরকারি বক্তব্য ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার মধ্যে স্পষ্ট বৈপরীত্য সামনে আসে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইপিআইয়ের এক কর্মকর্তা জানান, নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম কখনোই বন্ধ হয়নি। তিনি বলেন, প্রতি তিন মাস অন্তর দেশের প্রতিটি সিভিল সার্জন কার্যালয়ে টিকা সরবরাহ করা হয়। তবে বর্তমানে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ টিকার মজুত শেষ হয়ে গেছে। মাঠপর্যায়ে কিছু টিকা থাকলেও কেন্দ্রীয় পর্যায়ে ঘাটতি প্রকট।
তিনি আরও বলেন, অতীতে অপারেশন প্ল্যানের মাধ্যমে টিকা ক্রয় করা হতো। কিন্তু ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই পদ্ধতি বন্ধ করে দেওয়ায় টিকা সংগ্রহে জটিলতা তৈরি হয়। অর্থ ছাড়ে বিলম্ব হওয়ায় সময়মতো টিকা কেনা সম্ভব হয়নি, যার ফলে বর্তমান সংকট তৈরি হয়েছে।
জনস্বাস্থ্য ও টিকা বিশেষজ্ঞ ডা. তাজুল ইসলাম বারী মনে করেন, হামের টিকার ক্ষেত্রে সরাসরি ঘাটতি না থাকলেও অন্যান্য টিকার ক্ষেত্রে পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। তিনি বলেন, গত বছর ইউনিসেফের মাধ্যমে যে টিকা দেশে আসে, তা নির্ধারিত সময়ে প্রয়োগ করা সম্ভব হয়নি রাজনৈতিক অস্থিরতা ও স্বাস্থ্যকর্মীদের আন্দোলনের কারণে। সেই টিকাগুলো এখন হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় ব্যবহার করা হচ্ছে।
তার মতে, প্রকৃত সমস্যা হলো সমন্বয়হীনতা। পরিকল্পনা অনুযায়ী টিকা ব্যবহার না হওয়া, ক্রয় প্রক্রিয়ায় বিলম্ব এবং প্রশাসনিক অসঙ্গতির কারণে একাধিক টিকার ঘাটতি তৈরি হয়েছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, বাস্তবতা অস্বীকার করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাবে না। বরং দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, যদি দ্রুত টিকা সরবরাহ স্বাভাবিক করা না যায়, তাহলে শুধু হাম নয়, অন্যান্য প্রতিরোধযোগ্য রোগও নতুন করে বিস্তার লাভ করতে পারে। এতে শিশুস্বাস্থ্য মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে এবং দীর্ঘদিনের অর্জনও হুমকির মুখে পড়তে পারে।
সব মিলিয়ে দেশে টিকাদান কার্যক্রম নিয়ে তৈরি হওয়া এই দ্বৈত অবস্থান স্বাস্থ্য খাতের ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের বক্তব্যের মধ্যে যে ফারাক তৈরি হয়েছে, তা দ্রুত দূর না হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au