সুজনের সংবাদ সম্মেলন। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ৭ মে- সংরক্ষিত নারী আসনে নির্বাচিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সদস্যদের হলফনামা বিশ্লেষণ করে ঋণ, আয়, সম্পদ, শিক্ষা ও পেশাগত তথ্য নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)। সংস্থাটির বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সংরক্ষিত নারী আসনের ৫০ জন সংসদ সদস্যের মধ্যে ১০ জনের ঋণ ও দায়-দেনা রয়েছে, যা মোট নির্বাচিত সদস্যের ২০ শতাংশ। এদের মধ্যে চারজনের ঋণ ও দায়-দেনার পরিমাণ কোটি টাকারও বেশি। ঋণগ্রহীতাদের শীর্ষ তালিকায় থাকা ১০ জনের মধ্যে ৯ জনই বিএনপি থেকে নির্বাচিত এবং একজন জামায়াতে ইসলামীর।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী মিলনায়তনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরে সুজন। “ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের তথ্য উপস্থাপন” শীর্ষক ওই সংবাদ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন সুজনের সম্পাদক ও প্রধান নির্বাহী ড. বদিউল আলম মজুমদার। তথ্য উপস্থাপন করেন সংস্থাটির কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী দিলীপ কুমার সরকার।
সুজনের বিশ্লেষণে বলা হয়, দ্বাদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্যদের মধ্যে ঋণগ্রহীতার সংখ্যা ছিল ১৩ জন বা ২৬ শতাংশ। সেই তুলনায় ত্রয়োদশ সংসদে ঋণগ্রহীতার হার কিছুটা কমে ২০ শতাংশে নেমে এসেছে। তবে ঋণের পরিমাণের দিক থেকে কয়েকজন সংসদ সদস্যের দায়-দেনা বেশ বড় আকারের।
শীর্ষ ঋণগ্রহীতাদের তালিকায় রয়েছেন বিএনপির সেলিমা রহমান, হেলেন জেরিন খান, শিরিন সুলতানা, নিপুণ রায় চৌধুরী, মারদিয়া মমতাজ, সাকিলা ফারজানা, সুলতানা আহমেদ, সানজিদা ইসলাম ও ফাহমিদা হক। এছাড়া জামায়াতে ইসলামীর সাবিকুন্নাহারও রয়েছেন এই তালিকায়।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সংরক্ষিত নারী আসনে নির্বাচিতদের মধ্যে সর্বোচ্চ আয়কারীদের তালিকায় থাকা ১০ জনের সবাই বিএনপি থেকে নির্বাচিত। এ তালিকায় রয়েছেন শামীম আরা বেগম স্বপ্না, জহরত আদিব চৌধুরী, সাকিলা ফারজানা, আন্না মিনজ, সুলতানা আহমেদ, সানজিদা ইসলাম, নিপুণ রায় চৌধুরী, বীথিকা বিনতে হোসাইন, হেলেন জেরিন খান ও সেলিমা রহমান।
তাদের মধ্যে কোটি টাকার বেশি আয় করেছেন চারজন সংসদ সদস্য। সর্বোচ্চ আয়কারী শামীম আরা বেগম স্বপ্নার বাৎসরিক আয় ৪ কোটি ২৬ লাখ ১০ হাজার ৫০৬ টাকা। এরপর রয়েছেন জহরত আদিব চৌধুরী, যার আয় ৩ কোটি ১৭ লাখ ২৮ হাজার ৩৯৩ টাকা। সাকিলা ফারজানার আয় ৩ কোটি ৭১ হাজার ১২৩ টাকা এবং আন্না মিনজের আয় ১ কোটি ১৩ লাখ ৩৩ হাজার ২৪৬ টাকা।
সুজনের তথ্য অনুযায়ী, সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচিত ৫০ জন সংসদ সদস্যের মধ্যে নির্ভরশীল সদস্যসহ বছরে ৫ লাখ টাকা বা তার কম আয় করেন ১৬ জন। এছাড়া সাতজন তাদের আয়ের ঘর পূরণ করেননি। এই দুই শ্রেণি মিলিয়ে মোট ২০ জন বা ৪০ শতাংশ সংসদ সদস্যের আয় বছরে ৫ লাখ টাকার কম বা অঘোষিত অবস্থায় রয়েছে।
অন্যদিকে বছরে ৫ লাখ থেকে ২৫ লাখ টাকা আয় করেন ১৯ জন সংসদ সদস্য। ২৫ লাখ থেকে ৫০ লাখ টাকা আয় করেন পাঁচজন। ৫০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকা আয় করেন দুজন এবং ১ কোটি টাকার বেশি আয় করেন চারজন।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ৫ লাখ টাকার কম আয়কারী বা আয়ের তথ্য না দেওয়া ২০ জনের মধ্যে ১১ জনই জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট থেকে নির্বাচিত হয়েছেন।
সুজন তুলনামূলক বিশ্লেষণে বলেছে, দ্বাদশ জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনে স্বল্প আয়কারীর হার ছিল ২৪ শতাংশ, যা ত্রয়োদশ সংসদে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪০ শতাংশে। একইসঙ্গে কোটি টাকার বেশি আয়কারীর হারও ৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ৮ শতাংশ হয়েছে। অর্থাৎ একদিকে যেমন নিম্ন আয়ের সদস্যের সংখ্যা বেড়েছে, অন্যদিকে উচ্চ আয়ের সদস্যের সংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েছে।
শিক্ষাগত যোগ্যতার দিক থেকে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্যদের বড় অংশ উচ্চশিক্ষিত বলে জানিয়েছে সুজন। নির্বাচিত ৫০ জনের মধ্যে ৩০ জন স্নাতকোত্তর এবং ১৪ জন স্নাতক ডিগ্রিধারী। এছাড়া দুজন এইচএসসি পাস, একজন এসএসসি পাস এবং দুজন স্বশিক্ষিত। একজন সংসদ সদস্য তার শিক্ষাগত যোগ্যতার তথ্য উল্লেখ করেননি।
পেশাগত পরিচয়ের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নির্বাচিত নারী সংসদ সদস্যদের মধ্যে ১৫ জন আইনজীবী। ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ১০ জন এবং শিক্ষকতা পেশায় রয়েছেন চারজন। এছাড়া একজন চাকরিজীবী, পাঁচজন গৃহিণী এবং ছয়জন সরাসরি রাজনীতিকে পেশা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। আরও আটজন বিভিন্ন ধরনের পেশার সঙ্গে যুক্ত বলে হলফনামায় উল্লেখ করেছেন। তিনজন পেশার ঘর পূরণ করেননি।
সংবাদ সম্মেলনে আরও বক্তব্য দেন সুজনের ঢাকা মহানগর কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ক্যামেলিয়া চৌধুরী ও সদস্য সজল ঘোষ। তারা বলেন, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের আর্থিক অবস্থা, পেশা, শিক্ষাগত যোগ্যতা ও দায়-দেনার তথ্য জনগণের সামনে তুলে ধরা গণতান্ত্রিক জবাবদিহির অংশ। এসব তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে নির্বাচনী রাজনীতির বাস্তব চিত্র আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।