‘পৃথিবীর প্রথম তারকা বহর’ ঘোষণা করল নাসা । ছবি : সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ১১ জুন- মানুষকে আবার চাঁদে ফিরিয়ে নেওয়া এবং ভবিষ্যতে মঙ্গল গ্রহে মানব অভিযান পরিচালনার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় বড় পদক্ষেপ নিল মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা। সংস্থাটি তাদের বহুল প্রতীক্ষিত আর্টেমিস-৩ মিশনের জন্য চার নভোচারীর দল ঘোষণা করেছে, যাদের নাসা আখ্যা দিয়েছে ‘পৃথিবীর প্রথম তারকা বহর’ হিসেবে।
নাসার আর্টেমিস কর্মসূচির মূল লক্ষ্য শুধু চাঁদে মানুষের প্রত্যাবর্তন নয়, বরং সেখানে স্থায়ী গবেষণা অবকাঠামো গড়ে তোলা এবং ভবিষ্যতের গভীর মহাকাশ অভিযানের ভিত্তি নির্মাণ করা। এই কর্মসূচির অংশ হিসেবেই ২০২৭ সালে উৎক্ষেপণের পরিকল্পনা করা হয়েছে আর্টেমিস-৩ মিশন।
তবে প্রচলিত ধারণার বিপরীতে এই মিশনে নভোচারীরা সরাসরি চাঁদের মাটিতে অবতরণ করবেন না। বরং পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে অবস্থান করে বিভিন্ন মহাকাশযান, প্রযুক্তি এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার সমন্বিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো হবে। নাসার মতে, চাঁদে মানুষ পাঠানোর আগে মহাকাশে জটিল প্রযুক্তিগত কার্যক্রম নিরাপদভাবে পরিচালনা করা সম্ভব কি না, তা নিশ্চিত করাই এই মিশনের প্রধান উদ্দেশ্য।
আর্টেমিস-৩ মিশনের নেতৃত্ব দেবেন অভিজ্ঞ মার্কিন নভোচারী ও সাবেক মেরিন কর্নেল র্যান্ডি ব্রেসনিক। এর আগে তিনি ১৫০ দিনের বেশি সময় মহাকাশে কাটিয়েছেন। পাইলট হিসেবে থাকছেন ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার অভিজ্ঞ নভোচারী লুকা পারমিতানো, যিনি আর্টেমিস কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া প্রথম ইউরোপীয় প্রতিনিধি।
মিশনের আরেক সদস্য ফ্র্যাঙ্ক রুবিও ইতোমধ্যেই একজন মার্কিন নভোচারী হিসেবে টানা ৩৭১ দিন মহাকাশে অবস্থান করার রেকর্ড গড়েছেন। চতুর্থ সদস্য হিসেবে দলে রয়েছেন প্রকৌশলী ও রোবট প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ আন্দ্রে ডগলাস। এটি হবে তার প্রথম মহাকাশ অভিযান।
নাসার প্রশাসক জ্যারেড আইজ্যাকম্যান দলটির পরিচয় করিয়ে দিতে গিয়ে ‘আর্থস ফার্স্ট স্টারফ্লিট’ বা ‘পৃথিবীর প্রথম তারকা বহর’ শব্দবন্ধ ব্যবহার করেন। তার মতে, ভবিষ্যতের মহাকাশ অনুসন্ধান আর কোনো একক দেশের উদ্যোগে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, বেসরকারি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন দেশের যৌথ অংশগ্রহণের মাধ্যমেই নতুন যুগের মহাকাশ অভিযান পরিচালিত হবে।
এই কর্মসূচিতে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে কাজ করছে মার্কিন মহাকাশ প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্স এবং ব্লু অরিজিন। চাঁদে মানুষ অবতরণের জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও অবতরণযান তৈরির কাজ করছে প্রতিষ্ঠান দুটি। পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশও প্রযুক্তি, সরঞ্জাম এবং মানবসম্পদ দিয়ে সহযোগিতা করছে।
এদিকে চন্দ্র অভিযানের জন্য নতুন প্রজন্মের স্পেসস্যুট তৈরির ক্ষেত্রেও নতুনত্ব এসেছে। ইতালির বিলাসবহুল ব্র্যান্ড প্রাডা প্রযুক্তিগত সহায়তায় অংশ নিয়েছে অ্যাক্সিয়ম স্পেসের সঙ্গে। তাদের যৌথভাবে তৈরি নতুন অ্যাক্সইএমইউ স্পেসস্যুট চাঁদের চরম তাপমাত্রা, বিকিরণ এবং ধুলাবালু থেকে নভোচারীদের সুরক্ষা দেবে। এতে অত্যাধুনিক শীতলীকরণ ব্যবস্থাও যুক্ত করা হয়েছে।
নাসার পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৮ সালে আর্টেমিস-৪ মিশনের মাধ্যমে মানুষকে আবার চাঁদের মাটিতে অবতরণ করানো হতে পারে। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে, ১৯৭২ সালে অ্যাপোলো-১৭ মিশনের পর প্রথমবারের মতো মানুষ আবার চাঁদে পা রাখবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আর্টেমিস-৩ মিশন চাঁদে না নামলেও এর গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। কারণ এই মিশনের সফলতাই নির্ধারণ করবে ভবিষ্যতের চন্দ্র ঘাঁটি নির্মাণ, দীর্ঘমেয়াদি মহাকাশ গবেষণা এবং একদিন মানুষের মঙ্গল গ্রহে যাত্রার পথ কতটা বাস্তবসম্মত হবে।
মানবজাতির মহাকাশ অভিযানের নতুন অধ্যায়ে তাই আর্টেমিস-৩ শুধু একটি মহাকাশ মিশন নয়, বরং চাঁদ থেকে মঙ্গল পর্যন্ত বিস্তৃত ভবিষ্যৎ স্বপ্নের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।