১২ হাজার রোগীর চিকিৎসা দিয়েছে দিনাজপুরের ধানজুড়ি কেন্দ্র। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ১১ জুন- বাংলাদেশে কুষ্ঠরোগ নির্মূলে দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে দিনাজপুরের ধনজুড়ি কুষ্ঠরোগ কেন্দ্র। প্রায় এক শতাব্দী আগে ইতালীয় ধর্মযাজক ফাদার জোসেফ ওবার্টের হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত এই কেন্দ্রটি বর্তমানে দেশের অন্যতম প্রধান কুষ্ঠরোগ চিকিৎসা ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
১৯২৭ সালে দিনাজপুরে প্রতিষ্ঠিত এই কেন্দ্রটি শুরুতে ছোট পরিসরে যাত্রা করলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা একটি পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে এখানে ৭০ শয্যার আধুনিক হাসপাতাল রয়েছে, যেখানে কুষ্ঠরোগের চিকিৎসা, ক্ষত পরিচর্যা, শারীরিক পুনর্বাসন, ফিজিওথেরাপি এবং রোগীদের জন্য বিশেষ সুরক্ষামূলক জুতা তৈরির ব্যবস্থা রয়েছে।
ধনজুড়ি কুষ্ঠরোগ কেন্দ্রের তথ্যমতে, প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ১২ হাজার কুষ্ঠরোগীকে সফলভাবে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। শুধু কেন্দ্রীয় হাসপাতালই নয়, দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় পরিচালিত ১৩টি ক্লিনিকের মাধ্যমে নতুন রোগী শনাক্ত ও চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর তিন হাজারের বেশি নতুন কুষ্ঠরোগী শনাক্ত হয়। কুষ্ঠরোগের বোঝা বহনকারী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বের চতুর্থ। যদিও ১৯৯৮ সালে বাংলাদেশে কুষ্ঠরোগ নির্মূল হয়েছে বলে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল, তবুও রোগটির সংক্রমণ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। বর্তমানে প্রতি ১০ লাখ মানুষের মধ্যে প্রায় ২১ জন নতুন রোগী শনাক্ত হচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রোগটি প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা গেলে সম্পূর্ণ নিরাময় সম্ভব। তবে রোগ নির্ণয়ে বিলম্ব, সচেতনতার অভাব এবং স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতার কারণে এখনো নতুন রোগী পাওয়া যাচ্ছে। ২০৩০ সালের মধ্যে কুষ্ঠরোগের বিস্তার শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার লক্ষ্যে কাজ চলছে।
চিকিৎসার পাশাপাশি কুষ্ঠরোগীদের সামাজিক জীবনে ফিরে আসার সংগ্রামও কম নয়। এখনও সমাজে কুষ্ঠরোগ নিয়ে নানা ভুল ধারণা রয়েছে। অনেকেই মনে করেন এটি অত্যন্ত সংক্রামক বা বংশগত রোগ, যদিও চিকিৎসাবিজ্ঞান তা সমর্থন করে না। ফলে অসংখ্য রোগীকে সামাজিক বৈষম্য, অবহেলা এবং পারিবারিক বঞ্চনার শিকার হতে হয়।
দিনাজপুরের বিরামপুর উপজেলার বিনাইল গ্রামের ৫১ বছর বয়সী ফুরকুন বেগম তেমনই একজন ভুক্তভোগী। প্রায় ৩০ বছর ধরে তিনি কুষ্ঠরোগ নিয়ে জীবনযাপন করছেন। দ্বিতীয় সন্তানের গর্ভধারণের সময় তার শরীরে রোগটি ধরা পড়ে। পরে বিষয়টি এলাকায় জানাজানি হলে তাকে গ্রাম ছাড়তে বাধ্য করা হয়। ভেঙে যায় তার সংসারও।
বর্তমানে তার সন্তানরা বড় হলেও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এখনও কাটেনি। ফুরকুন বেগম বলেন, “কেউ আমাকে ভালোবাসে না। পরিবার ও আত্মীয়স্বজন আমাকে ঘৃণা করে। আমি সুস্থ হতে চাই, ভালোভাবে বাঁচতে চাই এবং সন্তানদের সঙ্গে শান্তিতে থাকতে চাই।”
ধনজুড়ি কুষ্ঠরোগ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক আগাপিত টুডু জানান, প্রতিষ্ঠানটি এখনও কুষ্ঠরোগ প্রতিরোধ ও চিকিৎসা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। শুধু ২০২৫ সালেই কেন্দ্রটি ২৩১ জন নতুন রোগী শনাক্ত করেছে, যাদের অনেকেই আগে কখনও চিকিৎসা পাননি। তিনি বলেন, “এ পর্যন্ত ১২ হাজারের বেশি রোগী চিকিৎসা নিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে গেছেন।”
কেন্দ্রটির চিকিৎসা ও সেবাকার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন সেবিকারা এবং স্বাস্থ্যকর্মীরা। তাদের একজন সিস্টার সুজাতা কাট্টুলা, যিনি ২০২৩ সাল থেকে এখানে কাজ করছেন। তিনি বলেন, “এখানকার মানুষগুলো আমার পরিবারের সদস্যদের মতো হয়ে গেছে। রোগীদের সেবা করতে গিয়ে মনে হয় নিজের পরিবারের সদস্যদেরই সেবা করছি।”
প্রতিদিন সকালে রোগী ও কর্মীরা একসঙ্গে প্রার্থনায় অংশ নেন। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই সুস্থতা ও নতুন জীবনের প্রত্যাশায় একত্রিত হন। এরপর শুরু হয় চিকিৎসা, ওষুধ বিতরণ, ক্ষত পরিচর্যা এবং পুনর্বাসন কার্যক্রম।
কেন্দ্রটির চিকিৎসক ডা. আবু হেনা মোস্তফা কামাল প্রায় এক দশক ধরে এখানে কর্মরত আছেন। তিনি বলেন, “কুষ্ঠরোগের চিকিৎসা সাধারণত ছয় মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত চলতে পারে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সচেতনতা। পরিবার ও সমাজকে রোগ সম্পর্কে সঠিক ধারণা দিতে হবে। একই সঙ্গে রোগীদের নিয়মিত চিকিৎসা ও আত্মসচেতনতার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।”
তিনি জানান, কুষ্ঠরোগ মানুষের স্নায়ুতন্ত্রকে আক্রান্ত করে। ফলে অনেক রোগী হাত-পায়ের অনুভূতি হারিয়ে ফেলেন। এতে অজান্তেই আঘাত লাগে, ক্ষত সৃষ্টি হয় এবং তা দীর্ঘমেয়াদি আলসারে রূপ নিতে পারে।
ধনজুড়ি কুষ্ঠরোগ কেন্দ্রের লক্ষ্য শুধু রোগ নিরাময় নয়, বরং রোগীদের পুনর্বাসন, সামাজিকভাবে পুনঃএকীভূতকরণ এবং তাদের মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করা। প্রায় ১০০ বছরের যাত্রায় প্রতিষ্ঠানটি কুষ্ঠরোগের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের পাশাপাশি হাজারো মানুষের জীবনে নতুন আশার আলো জ্বালিয়ে চলেছে।