মেলবোর্ন, ১১ জুন- চার বছরের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে শুরু হতে যাচ্ছে ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে বড় আসর ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬। বিশ্বের কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর নজর এখন উত্তর আমেরিকার দিকে। বাংলাদেশ সময় আগামীকাল(১২ জুন) রাত ১টায় বর্ণাঢ্য উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে পর্দা উঠবে বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ এই টুর্নামেন্টের। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো তিন দেশ যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো যৌথভাবে আয়োজন করছে বিশ্বকাপ।
মেক্সিকো সিটি, টরন্টো ও লস অ্যাঞ্জেলসে একযোগে উদ্বোধনী আয়োজনের মধ্য দিয়ে শুরু হবে ফুটবলের মহাযজ্ঞ। বিশ্বকাপকে ঘিরে ইতোমধ্যে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়েছে আয়োজক দেশগুলোর বিভিন্ন শহরে। স্টেডিয়াম, ফ্যান জোন এবং পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে ভিড় জমাতে শুরু করেছেন বিভিন্ন দেশের সমর্থকরা।
এবারের বিশ্বকাপ সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে নতুন ফরম্যাটের কারণে। প্রথমবারের মতো ৪৮টি দল অংশ নিচ্ছে বিশ্বকাপের মূল পর্বে। দলগুলোকে ১২টি গ্রুপে ভাগ করা হয়েছে, যেখানে প্রতিটি গ্রুপে রয়েছে চারটি করে দল। গ্রুপপর্ব শেষে প্রতিটি গ্রুপের শীর্ষ দুই দল সরাসরি নকআউট পর্বে জায়গা করে নেবে। তাদের সঙ্গে যুক্ত হবে তৃতীয় স্থান অর্জনকারী দলগুলোর মধ্যে সেরা আটটি দল। ফলে শেষ ৩২-এর পর্বে অংশ নেবে মোট ৩২টি দল। নতুন এই কাঠামোর ফলে ম্যাচের সংখ্যা বেড়েছে, একই সঙ্গে বিশ্বের আরও বেশি দেশের জন্য বিশ্বকাপে অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
বিশ্বকাপের মঞ্চে এবারও দেখা যাবে ফুটবলের প্রায় সব পরাশক্তিকে। বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা শিরোপা ধরে রাখার মিশনে মাঠে নামবে। তাদের পাশাপাশি ব্রাজিল, ফ্রান্স, স্পেন, জার্মানি, ইংল্যান্ড, পর্তুগাল, নেদারল্যান্ডস, উরুগুয়ে ও বেলজিয়ামের মতো শক্তিশালী দলগুলোও শিরোপার দাবিদার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
তবে এবারের আসরের অন্যতম আকর্ষণ কয়েকটি নতুন দেশের অভিষেক। উজবেকিস্তান ও জর্ডান প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের মূল পর্বে জায়গা করে নিয়ে নিজেদের ফুটবল ইতিহাসে নতুন অধ্যায় রচনা করেছে। বিশেষ করে এশিয়ার ফুটবলের ক্রমবর্ধমান শক্তি ও উন্নয়নের প্রতিফলন হিসেবে এই অর্জনকে দেখা হচ্ছে।
অন্যদিকে বিশ্বকাপে দেখা যাবে না কয়েকটি পরিচিত দলকে। সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে ইতালির অনুপস্থিতি। চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দলটি টানা তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের মূল পর্বে জায়গা করে নিতে ব্যর্থ হয়েছে। এছাড়া চিলি, নাইজেরিয়া, ক্যামেরুন, ওয়েলস ও সার্বিয়ার মতো দলও বাছাইপর্বের বাধা পেরোতে পারেনি। ফলে এসব দেশের সমর্থকদের জন্য এবারের বিশ্বকাপ কিছুটা হতাশারও।
এবারের বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হবে উত্তর আমেরিকার ১৬টি শহরে। আয়োজক দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ হবে যুক্তরাষ্ট্রে। নিউইয়র্ক, নিউ জার্সি, লস অ্যাঞ্জেলেস, ডালাস, মিয়ামি, আটলান্টা, সিয়াটল ও হিউস্টনের মতো শহরগুলোতে অনুষ্ঠিত হবে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ। কানাডার টরন্টো ও ভ্যানকুভার এবং মেক্সিকোর মেক্সিকো সিটি, গুয়াদালাহারা ও মনতেরেও বিশ্বকাপের ম্যাচ আয়োজন করবে। টুর্নামেন্টের ফাইনাল অনুষ্ঠিত হবে নিউ জার্সির ঐতিহাসিক মেটলাইফ স্টেডিয়ামে।
বিশ্বকাপকে ঘিরে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে দুই কিংবদন্তি লিওনেল মেসি ও ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোকে নিয়ে। ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা এই দুই তারকার জন্য এটি হতে পারে শেষ বিশ্বকাপ। প্রায় দুই দশক ধরে বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে রাজত্ব করা এই দুই মহাতারকাকে শেষবারের মতো বিশ্বকাপে দেখার সম্ভাবনা সমর্থকদের মধ্যে বিশেষ আবেগ সৃষ্টি করেছে। ফলে এবারের বিশ্বকাপ কেবল শিরোপার লড়াই নয়, এটি হতে পারে দুই কিংবদন্তির বিদায়ের মঞ্চও।
শুধু মেসি ও রোনালদো নন, ক্রোয়েশিয়ার অভিজ্ঞ মিডফিল্ডার লুকা মদরিচের জন্যও এটি শেষ বিশ্বকাপ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। একই সময়ে নতুন প্রজন্মের ফুটবলাররা নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পে, ইংল্যান্ডের জুড বেলিংহাম, স্পেনের লামিন ইয়ামাল, ব্রাজিলের ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, জার্মানির জামাল মুসিয়ালা এবং নরওয়ের আর্লিং হলান্ডের দিকে থাকবে বিশেষ নজর। অনেক ফুটবল বিশ্লেষকের মতে, এই বিশ্বকাপই হতে পারে সেই মঞ্চ যেখানে আনুষ্ঠানিকভাবে এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মের হাতে ফুটবলের নেতৃত্ব হস্তান্তর হবে।
শিরোপার লড়াইয়ে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে এগিয়ে রাখা হলেও ব্রাজিল, ফ্রান্স, স্পেন, ইংল্যান্ড, জার্মানি ও পর্তুগালের মতো দলগুলোও সমানভাবে শক্তিশালী। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক ফুটবলে প্রতিযোগিতা বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। ফলে কোনো অঘটন বা নতুন শক্তির উত্থান ঘটলেও সেটি খুব বেশি বিস্ময়ের হবে না।
বিশ্বকাপ কেবল একটি ফুটবল টুর্নামেন্ট নয়, এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া উৎসব। এটি আবেগ, স্বপ্ন, গৌরব, হতাশা এবং নতুন ইতিহাস সৃষ্টির মঞ্চ। আগামী কয়েক সপ্তাহ বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ চোখ রাখবে উত্তর আমেরিকার মাঠগুলোর দিকে। কেউ লিখবেন নতুন ইতিহাস, কেউ গড়বেন নতুন রেকর্ড, আবার কোনো কিংবদন্তি হয়তো শেষবারের মতো বিশ্বমঞ্চকে বিদায় জানাবেন। সবকিছুর সূচনা হতে যাচ্ছে আগামীকাল রাতেই। উদ্বোধনী বাঁশি বাজলেই শুরু হবে বিশ্ব ফুটবলের নতুন অধ্যায়।