বাজেটে বাড়তে ও কমতে পারে যেসব পণ্যের দাম
মেলবোর্ন, ১২ জুন- জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপন করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বর্তমান সরকারের…
মেলবোর্ন, ১২ জুন- ভারত ও বাংলাদেশের সীমান্তে কথিত ‘পুশ-ইন’ বা জোরপূর্বক মানুষকে সীমান্ত পেরিয়ে পাঠানোর ঘটনা নিয়ে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যেই দিল্লিতে অনুষ্ঠিত সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ ও বিজিবির মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠক শেষ হয়েছে। তবে বহুল আলোচিত এই ইস্যুতে কোনো সমাধান বা সমঝোতা ছাড়াই বৈঠক শেষ হয়েছে বলে কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে।
দুই দেশের সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ৮ থেকে ১১ জুন পর্যন্ত ভারতের রাজধানী দিল্লিতে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সীমান্ত নিরাপত্তা, অবৈধ অনুপ্রবেশ, সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ, চোরাচালান ও অন্যান্য সীমান্ত-সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে আলোচনা হলেও সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয় ছিল পুশ-ইন বা পুশ-ব্যাক। কিন্তু এ বিষয়ে দুই দেশের অবস্থানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য থাকায় কোনো কার্যকর সমাধান বেরিয়ে আসেনি।
আন্তর্জাতিক সীমান্ত অতিক্রম করে ভারত থেকে কাউকে বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দেওয়ার ঘটনাকে ভারত ‘পুশ-ব্যাক’ হিসেবে উল্লেখ করলেও বাংলাদেশ এটিকে ‘পুশ-ইন’ হিসেবে বিবেচনা করে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সীমান্তের বিভিন্ন এলাকায় এমন ঘটনার অভিযোগ বাড়তে থাকায় বিষয়টি দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক আলোচনার অন্যতম প্রধান ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।
বৈঠক শেষে কোনো যৌথ সংবাদ সম্মেলন বা যৌথ বিবৃতি প্রকাশ না হওয়াকেও বিশ্লেষকরা তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন। তাদের মতে, গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোতে দুই পক্ষের মধ্যে মতৈক্য না হওয়ায় প্রচলিত কূটনৈতিক রীতি অনুসারে যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করা হয়নি।
এর আগে ৩ জুন বিএসএফের প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছিল, সীমান্তে অবৈধ অনুপ্রবেশ, সীমান্তে বেড়া নির্মাণ, সীমান্ত অপরাধ দমন এবং অন্যান্য নিরাপত্তা-সংক্রান্ত বিষয় বৈঠকের আলোচ্যসূচিতে থাকবে। তবে কূটনৈতিক সূত্রগুলোর দাবি, এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা খুব একটা সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে হয়নি এবং অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতেই কোনো সমঝোতা অর্জিত হয়নি।

এক দিনে সীমান্তের ১১ পয়েন্টে ১২৯ জনকে পুশইনের চেষ্টা। ছবিঃ সংগৃহীত
বাংলাদেশের একটি কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, যেসব ব্যক্তিকে ভারত বাংলাদেশি নাগরিক দাবি করছে, তাদের ফেরত পাঠাতে হলে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রত্যার্পণ প্রক্রিয়া, আনুষ্ঠানিক প্রোটোকল এবং স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর অনুসরণ করতে হবে। সীমান্তের আউটপোস্ট ব্যবহার করে জোরপূর্বক কাউকে বাংলাদেশের ভেতরে ঠেলে দেওয়ার প্রক্রিয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় বলে বাংলাদেশ বৈঠকে স্পষ্টভাবে জানিয়েছে।
অন্যদিকে ভারতীয় কূটনৈতিক সূত্রের বক্তব্য, নাগরিকত্ব যাচাইয়ের জন্য দুই হাজারেরও বেশি সন্দেহভাজন বাংলাদেশি নাগরিকের তালিকা দীর্ঘদিন আগে বাংলাদেশের কাছে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু এসব আবেদনের অধিকাংশই বছরের পর বছর ঝুলে আছে। ভারত মনে করে, নাগরিকত্ব যাচাই দ্রুত সম্পন্ন হলে এসব ব্যক্তিকে আনুষ্ঠানিকভাবে ফেরত পাঠানোর পথ সুগম হবে।
সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিস্থিতিও এই বৈঠকের গুরুত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে। সর্বশেষ বিধানসভা নির্বাচনের পর প্রথমবারের মতো পশ্চিমবঙ্গে সরকার গঠন করেছে ভারতীয় জনতা পার্টি। নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার এবং কথিত অবৈধ অভিবাসীদের শনাক্ত, তালিকা থেকে বাদ দেওয়া এবং নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর কর্মসূচিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলে আসছেন।
তিনি বারবার দাবি করেছেন, যেসব ব্যক্তি ভারতের নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের আওতায় পড়েন না, তারা অবৈধ অনুপ্রবেশকারী হিসেবে বিবেচিত হবেন। এরই অংশ হিসেবে গত মাস থেকে পশ্চিমবঙ্গজুড়ে কথিত অবৈধ অভিবাসীদের শনাক্ত করতে বিশেষ অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের বিভিন্ন জেলায় স্থাপিত হোল্ডিং সেন্টারে রাখা হচ্ছে।

শুভেন্দু অধিকারী। ছবি : সংগৃহীত
গত ৭ জুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী দাবি করেন, ইতোমধ্যে ৪ হাজার ৮০০ জনকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে এবং আরও ৮৬৩ জনকে বিভিন্ন হোল্ডিং সেন্টারে আটক রাখা হয়েছে। তবে এসব দাবির সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বিভিন্ন মহল।
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের বিভিন্ন এলাকা থেকে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে, যাদের পুশ-ইন করার চেষ্টা করা হচ্ছে তাদের অনেককে সীমান্তের জিরো লাইনে দিনের পর দিন আটকে রাখা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে তাদের কাছে পর্যাপ্ত খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি কিংবা চিকিৎসা সুবিধা নেই বলেও অভিযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি জানিয়েছে, চলতি মাসের ৬ জুন পর্যন্ত বিএসএফ ২০০-রও বেশি মানুষকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। তবে নাগরিকত্ব যাচাই ছাড়া কাউকে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না বলে তারা স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল গত ২৯ মে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, বাংলাদেশি নাগরিক বলে সন্দেহ করা ২ হাজার ৬৮০ জনের একটি তালিকা যাচাইয়ের জন্য বাংলাদেশের কাছে পাঠানো হয়েছে। নাগরিকত্ব নিশ্চিত হওয়ার পরই তাদের ফেরত পাঠানো সম্ভব হবে।
তিনি দাবি করেন, অনেক ক্ষেত্রেই এই যাচাই প্রক্রিয়া পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে ঝুলে আছে। ফলে বিষয়টি দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বাংলাদেশ সরকারের সহযোগিতা প্রয়োজন।
এদিকে আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার সাম্প্রতিক বক্তব্য নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। তিনি ভারতীয় গণমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দাবি করেন, দীর্ঘ আইনি প্রত্যার্পণ প্রক্রিয়ার পরিবর্তে অনেক ক্ষেত্রে আটক ব্যক্তিদের সরাসরি সীমান্তে নিয়ে গিয়ে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হচ্ছে।
তার এ বক্তব্যের পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা খলিলুর রহমান বলেন, আন্তর্জাতিক আইন ও দ্বিপক্ষীয় চুক্তি লঙ্ঘন করে কোনো ধরনের পুশ-ইন গ্রহণযোগ্য নয়। এ ধরনের ঘটনায় বাংলাদেশ প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত। ছবিঃ সংগৃহীত
ভারতের প্রচলিত আইন অনুযায়ী, বৈধ পাসপোর্ট ও ভিসা ছাড়া কোনো বিদেশি নাগরিক ভারতে প্রবেশ করলে তাকে আটক করে বিদেশি আইন অনুসারে বিচারিক প্রক্রিয়ার মুখোমুখি করা হয়। সাজা শেষে সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাসের মাধ্যমে নাগরিকত্ব যাচাই করা হয়। পরে স্থানীয় প্রশাসন, গোয়েন্দা সংস্থা এবং বিএসএফের সমন্বয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়। নাবালকদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের যাচাই-বাছাইয়ের পর প্রত্যার্পণ সম্পন্ন করা হয়।
অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মন্ত্রী অশোক কীর্তনিয়া দাবি করেছেন, যাদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে বলে উল্লেখ করা হচ্ছে, তাদের একটি বড় অংশ আসলে স্বেচ্ছায় পশ্চিমবঙ্গ ছেড়ে চলে গেছে।
রাজ্য পুলিশের তথ্যমতে, বিভিন্ন জেলায় সূত্রভিত্তিক অভিযান চালিয়ে সন্দেহভাজন অবৈধ অভিবাসীদের শনাক্ত করা হচ্ছে। যাদের কাছে ভারতীয় নাগরিকত্বের গ্রহণযোগ্য নথিপত্র নেই, তাদের হোল্ডিং সেন্টারে রাখা হচ্ছে।
এদিকে কলকাতা ও সীমান্তবর্তী বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের দাবি, সাম্প্রতিক অভিযানের কারণে বহু পরিবার আতঙ্কে পশ্চিমবঙ্গ ছেড়ে চলে যাচ্ছে। উত্তর কলকাতার নাগেরবাজার এলাকার এক বাসিন্দা জানান, কয়েক দশক ধরে সেখানে বসবাসকারী বহু বাংলাদেশি পরিবার সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এলাকা ছেড়ে গেছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব পরিবারের অনেকের কাছেই আধার কার্ড, ভোটার পরিচয়পত্র ও রেশন কার্ড ছিল। তাদের সন্তানদের অনেকেই ভারতে জন্ম নিয়েছে এবং স্থানীয় স্কুল-কলেজে পড়াশোনা করেছে। তবুও অনিশ্চয়তা, গ্রেপ্তারের ভয় এবং সামাজিক চাপের কারণে অনেক পরিবার এলাকা ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সীমান্তে পুশ-ইন ইস্যু এখন কেবল নিরাপত্তা বা অভিবাসন সমস্যা নয়, বরং এটি দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক, মানবাধিকার এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনার একটি জটিল প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। দিল্লিতে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ বিএসএফ-বিজিবি বৈঠকে কোনো সমাধান না আসায় আগামী দিনগুলোতে এ ইস্যু আরও গুরুত্ব পাবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
সূত্রঃ বিবিসি
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au