স্বাস্থ্য ও শিশুযত্ন নিয়ে হ্যানসনের মন্তব্যে চাপে ওয়ান নেশন ।ছবি : সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ২১ জুন- অস্ট্রেলিয়ার রাজনীতিতে নতুন এক প্রতিদ্বন্দ্বীর মুখোমুখি হয়ে পুরোনো পরীক্ষিত কৌশলেই এগোতে চাইছে ক্ষমতাসীন লেবার পার্টি। দেশটির ডানপন্থী দল ওয়ান নেশনের নেত্রী পলিন হ্যানসনের সাম্প্রতিক কিছু মন্তব্যকে কেন্দ্র করে স্বাস্থ্যসেবা, শিশুযত্ন ও পিতামাতার ছুটি নিয়ে নতুন রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, আগামী নির্বাচনের আগে এসব ইস্যুই লেবার ও ওয়ান নেশনের মধ্যে অন্যতম প্রধান সংঘাতের ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে।
সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ার ন্যাশনাল প্রেস ক্লাবে দীর্ঘ বক্তব্য দেন ওয়ান নেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও সিনেটর পলিন হ্যানসন। প্রায় ১৩ হাজার শব্দের সেই বক্তব্যে তিনি অভিবাসন, অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, শিশুযত্ন, কর্মসংস্থানসহ নানা বিষয়ে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন। তবে রাজনৈতিক মহলের নজর কেড়েছে তার স্বাস্থ্য ও শিশুযত্নসংক্রান্ত কয়েকটি মন্তব্য।
শিশুযত্ন কেন্দ্রগুলোতে উচ্চশিক্ষিত কর্মী নিয়োগের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে পলিন হ্যানসন বলেন, সন্তান লালন-পালনের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি থাকা বাধ্যতামূলক নয়। তার মতে, বর্তমানে শিশুযত্ন খাতে অপ্রয়োজনীয় জটিলতা তৈরি করা হয়েছে।
একই সঙ্গে পিতামাতার বেতনসহ ছুটি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কেউ কর্মস্থলে কাজ না করলে তার বেতন কেন প্রতিষ্ঠান বহন করবে, সেটিও পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। এছাড়া স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে ফেডারেল ও রাজ্য সরকারের সমান্তরাল প্রশাসনিক কাঠামো কমিয়ে ব্যয় সংকোচনের পক্ষে মত দেন তিনি।
হ্যানসনের এসব মন্তব্যের পরপরই লেবার পার্টি রাজনৈতিকভাবে পাল্টা আক্রমণ শুরু করেছে। সরকারের জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী মারে ওয়াট অভিযোগ করেন, পলিন হ্যানসনের প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা ব্যয় বেড়ে যাবে এবং শিশুযত্ন ব্যবস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
লেবার পার্টি দীর্ঘদিন ধরেই স্বাস্থ্যসেবা ও শিশুযত্নকে নিজেদের রাজনৈতিক শক্তির প্রধান ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজের নেতৃত্বে ২০২২ সালের নির্বাচনী প্রচারণায় মেডিকেয়ার ও শিশুযত্ন খাত ছিল অন্যতম প্রধান ইস্যু। ক্ষমতায় আসার পর সরকার পিতামাতার বেতনসহ ছুটির মেয়াদ বৃদ্ধি, জিপিদের জন্য বাল্ক-বিলিং প্রণোদনা সম্প্রসারণ এবং জরুরি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র স্থাপনের মতো নানা উদ্যোগ গ্রহণ করে।
চলতি সপ্তাহেই লেবার সরকার শিশুযত্ন খাতের কর্মীদের জন্য মজুরি সহায়তা কর্মসূচির মেয়াদ আরও দুই বছর বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। প্রায় ৩ দশমিক ৬ বিলিয়ন অস্ট্রেলিয়ান ডলারের এই কর্মসূচির মাধ্যমে কর্মীদের বেতন বৃদ্ধি নিশ্চিত করার পাশাপাশি সেবার মান ও নিরাপত্তা উন্নত করার চেষ্টা চলছে।
সরকারের মতে, এসব উদ্যোগের মাধ্যমে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো এবং কর্মজীবী অভিভাবকদের সহায়তা করা সম্ভব হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পলিন হ্যানসনের বক্তব্য লেবার পার্টির জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। অতীতে লিবারেল পার্টির বিরুদ্ধে যেভাবে স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষা ইস্যুতে প্রচারণা চালানো হয়েছিল, এবার একই কৌশল ওয়ান নেশনের বিরুদ্ধেও ব্যবহার করতে পারে লেবার।
এরই মধ্যে লেবার পার্টির কয়েকজন সংসদ সদস্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হ্যানসনের বক্তব্যের ভিডিও প্রচার শুরু করেছেন। তারা দাবি করছেন, শিশুযত্ন কর্মীদের মজুরি বৃদ্ধি, পিতামাতার ছুটি এবং স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের মতো জনপ্রিয় কর্মসূচির বিপরীতে অবস্থান নিয়েছেন ওয়ান নেশনের নেত্রী।
বিশ্লেষকদের ধারণা, অস্ট্রেলিয়ায় জীবনযাত্রার ব্যয়, স্বাস্থ্যসেবা ও শিশুযত্ন নিয়ে ভোটারদের উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে। ফলে আগামী দিনে এসব ইস্যু ঘিরে লেবার ও পলিন হ্যানসনের ওয়ান নেশনের মধ্যে রাজনৈতিক লড়াই আরও তীব্র হতে পারে। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত পরিবার, কর্মজীবী নারী ও তরুণ ভোটারদের সমর্থন অর্জনে দুই পক্ষই স্বাস্থ্য ও শিশুযত্নকে প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করবে বলে মনে করা হচ্ছে।