বিভিন্ন দেশের কারাগার থেকে ৪৯৫ বাংলাদেশিকে ফেরত আনল সরকার। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ২২ জুন- বন্দিবিনিময় চুক্তি ছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে গত এক বছরের বেশি সময়ে ৪৯৫ বাংলাদেশি নাগরিককে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। ২০২৪ সালের শুরু থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্ট (এমএলএআর) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এসব নাগরিককে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হয়। পুরো কার্যক্রমের সমন্বয় করেছে বাংলাদেশ পুলিশের ওভারসিজ অ্যাফেয়ার্স বিভাগ।
পুলিশের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, দেশে ফিরিয়ে আনা এসব বাংলাদেশি বিভিন্ন দেশে কারাদণ্ড ভোগ করছিলেন। তাদের প্রত্যাবর্তনের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোল কিংবা ইন্টারপোলের বাংলাদেশ শাখা ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরোর (এনসিবি) কোনো সরাসরি সহায়তা প্রয়োজন হয়নি। সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক ও আইনি সমন্বয়ের মাধ্যমেই তাদের দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে।
এদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতে গ্রেপ্তার সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক বেনজীর আহমেদকে দেশে ফেরানোর বিষয়টিও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। জানা গেছে, তাকে প্রত্যর্পণের জন্য প্রয়োজনীয় নথিপত্র ইতোমধ্যে আমিরাত সরকারের কাছে পাঠিয়েছে বাংলাদেশ সরকার।
পুলিশের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এমএলএআর প্রক্রিয়ায় দেশে ফেরত আসা ব্যক্তিদের মধ্যে বাহরাইন থেকে আনা সাত বাংলাদেশিও রয়েছেন। তারা দীর্ঘদিন দেশটির কারাগারে যাবজ্জীবন সাজা ভোগ করছিলেন। বর্তমানে তারা বাংলাদেশের কারাগারে তাদের অবশিষ্ট সাজা ভোগ করছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত থেকে দণ্ডপ্রাপ্ত বাংলাদেশিদের দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। একইভাবে বাংলাদেশের কারাগারে থাকা অনেক ভারতীয় জেলেকেও নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে।
কর্মকর্তাদের মতে, বিদেশে কারাবন্দি বাংলাদেশিদের দীর্ঘদিন আটক থাকা শুধু তাদের পরিবারের জন্য কষ্টকর নয়, এটি মানবাধিকার এবং কনস্যুলার সুরক্ষার সঙ্গেও সম্পর্কিত। তাই বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে দ্রুত এসব নাগরিককে দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
তারা আরও জানান, কোনো দেশের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বন্দিবিনিময় চুক্তি না থাকলেও পারস্পরিক কূটনৈতিক সম্পর্কের ভিত্তিতে বন্দি বা সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানো সম্ভব। বর্তমানে ভারতের পাশাপাশি থাইল্যান্ড ও দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে বাংলাদেশের বন্দিবিনিময় চুক্তি রয়েছে।
এমএলএআর ছাড়াও ‘ডিপোর্টি’ বা বহিষ্কৃত নাগরিক হিসেবেও নিয়মিত বাংলাদেশিদের দেশে ফেরত পাঠানো হচ্ছে। সাধারণত ভিসার শর্ত লঙ্ঘন, অবৈধভাবে অবস্থান, অননুমোদিত প্রবেশ কিংবা বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার কারণে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো তাদের ফেরত পাঠায়।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারিতে ৪৪৫ জন, ফেব্রুয়ারিতে ৩৫২ জন, মার্চে ৩২৩ জন এবং এপ্রিলে ৫০৩ জন বাংলাদেশি ডিপোর্টি হিসেবে দেশে ফিরেছেন। ফলে চার মাসেই দেশে ফিরেছেন এক হাজার ৬২৩ জন।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এ ধরনের প্রত্যাবর্তন কার্যক্রমে চুক্তির চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো দুই দেশের পারস্পরিক আস্থা ও কূটনৈতিক সম্পর্কের গভীরতা। সম্পর্ক যত শক্তিশালী হবে, নাগরিকদের ফিরিয়ে আনা এবং আইনি সহযোগিতা তত সহজ হবে।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান বলেন, এমএলএআর এবং ডিপোর্টি উভয় প্রক্রিয়াতেই দেশে ফেরত আসা নাগরিকদের সহায়তা করে ব্র্যাক। দেশে ফিরে তাদের পুনর্বাসন এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়ার বিষয়েও কাজ করা হয়।
এদিকে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও জোরদার করতে আগামী ২৯ জুন ঢাকায় বিদেশি দূতাবাস, হাইকমিশন, কনস্যুলেট, আন্তর্জাতিক সংস্থা, পুলিশ অ্যাটাশে এবং নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণে একটি সমন্বয় সভার আয়োজন করেছে বাংলাদেশ পুলিশের ওভারসিজ অ্যাফেয়ার্স বিভাগ।
রাজধানীর একটি হোটেলে অনুষ্ঠিতব্য এই সভায় স্বরাষ্ট্র সচিব, পররাষ্ট্র সচিব এবং বিভিন্ন দেশের শতাধিক কূটনীতিক অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। আয়োজকদের মতে, কূটনৈতিক নিরাপত্তা সহযোগিতা বৃদ্ধি, তথ্য আদান-প্রদান এবং সক্ষমতা উন্নয়নই হবে এ সভার মূল লক্ষ্য।
অন্যদিকে প্রবাসী সুরক্ষা এবং বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে দূতাবাসগুলোতে পুলিশ কর্মকর্তা নিয়োগের দাবিও নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। যদিও দূতাবাসে পুলিশের জন্য আলাদা পদ নেই, তবু বিভিন্ন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের সেখানে নিয়োগের সুযোগ রয়েছে। ইতোমধ্যে বিদেশে দায়িত্ব পালনের আগ্রহ প্রকাশ করে ১০৫ জন পুলিশ কর্মকর্তা আবেদন করেছেন।
পুলিশ সপ্তাহ-২০২৬ উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে পুলিশ সদরদপ্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি রায়হান উদ্দিন খান সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, দুবাই, ইতালি, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশ দূতাবাসে লিয়াজোঁ কর্মকর্তা ও লিগ্যাল অ্যাটাশে হিসেবে পুলিশ কর্মকর্তাদের নিয়োগের প্রস্তাব দেন।
তার মতে, এসব দেশে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মরত থাকায় পুলিশ কর্মকর্তাদের উপস্থিতি প্রবাসীদের আইনি ও নিরাপত্তাজনিত সমস্যা দ্রুত সমাধানে সহায়ক হবে। পাশাপাশি পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে এবং আন্তঃদেশীয় অপরাধ মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও কার্যকর হবে।