ভারতের পর্যটক ভিসা চালু হতেই বাংলাদেশজুড়ে আবেদনকারীদের ঢল। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ২ জুলাই- দীর্ঘ প্রায় দুই বছর পর বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য ভারত পর্যটক ভিসা চালু করার পর দেশজুড়ে ভারতীয় ভিসা আবেদনকেন্দ্রগুলোতে আবেদনকারীদের উপচে পড়া ভিড় দেখা দিয়েছে। সেবা পুনরায় চালুর প্রথম ২৪ ঘণ্টাতেই এক লাখ ৪০ হাজারের বেশি ভিসা আবেদন জমা পড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্কের টানাপোড়েন কিংবা ভারতবিরোধী মনোভাবের আলোচনা থাকলেও বাস্তবে ভৌগোলিক অবস্থান, চিকিৎসা, পারিবারিক যোগাযোগ এবং অর্থনৈতিক প্রয়োজনের কারণে বাংলাদেশের মানুষের কাছে ভারতের গুরুত্ব এখনও অটুট রয়েছে।
ভারতের পর্যটক ভিসা পুনরায় চালুর ঘোষণার পর ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, সিলেট ও খুলনায় পরিচালিত পাঁচটি ভারতীয় ভিসা আবেদনকেন্দ্রের সামনে কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ সারি দেখা যায়। আবেদনকারীদের বিপুল উপস্থিতি প্রমাণ করে, দীর্ঘদিন ধরে ভিসা না পাওয়ায় যে চাহিদা জমে ছিল, তা একসঙ্গে সামনে এসেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের চার হাজার কিলোমিটারেরও বেশি দীর্ঘ স্থলসীমান্ত রয়েছে। রাজধানী ঢাকার তুলনায় ভারতের কলকাতা বাংলাদেশের অনেক জেলার চেয়েও কাছাকাছি। ফলে চিকিৎসা, কেনাকাটা, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করা কিংবা স্বল্প ব্যয়ে ভ্রমণের জন্য ভারত এখনও বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত মানুষের অন্যতম প্রধান গন্তব্য।

ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর ঘোষণার পর ২৮ জুন থেকে পর্যটক ভিসা কার্যক্রম পুনরায় শুরু হয়। ছবিঃ সংগৃহীত
দুই দেশের সম্পর্কের অবনতির পরও সামাজিক, সাংস্কৃতিক, পারিবারিক ও অর্থনৈতিক যোগাযোগ কখনো পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়নি। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও ত্রিপুরায় বসবাসরত আত্মীয়দের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখতে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি নিয়মিত ভারতে যাতায়াত করে থাকেন।
ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর ঘোষণার পর ২৮ জুন থেকে পর্যটক ভিসা কার্যক্রম পুনরায় শুরু হয়। এর মধ্য দিয়ে দুই দেশ কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার একটি নতুন উদ্যোগ নিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক উল্লেখযোগ্যভাবে অবনতি ঘটে। সে সময় ঢাকায় ভারতীয় ভিসা আবেদনকেন্দ্রে হামলার ঘটনা ঘটে এবং কর্মীদের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে। এরপর ভারত পর্যটক ভিসা প্রদান স্থগিত করে। তবে সীমিত পরিসরে চিকিৎসা ভিসা চালু ছিল।
পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দুই দেশের সম্পর্কে আরও শীতলতা তৈরি হয়। পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হওয়া এবং ভারতবিরোধী বক্তব্য বাড়ায় কূটনৈতিক দূরত্ব আরও স্পষ্ট হয়। গত বছরের ডিসেম্বরে ভারতবিরোধী নেতা ওসমান হাদীর হত্যাকাণ্ডের পর ঢাকায় ভারতীয় দূতাবাসমুখী বিক্ষোভ মিছিল পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হলেও অবৈধ অভিবাসন, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং অভিন্ন নদীর পানিবণ্টনসহ কয়েকটি ইস্যুতে দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য এখনও রয়ে গেছে।
ভিসা আবেদনকারীদের অনেকে বলছেন, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা প্রয়োজন। তাদের ভাষ্য, দুই দেশের বহু পরিবারের আত্মীয়স্বজন সীমান্তের দুই পাশে বসবাস করেন। তাই পারিবারিক ও মানবিক প্রয়োজনেই ভারতে যাতায়াত অব্যাহত রাখতে হয়।
পর্যটক ভিসা চালুর অন্যতম বড় কারণ চিকিৎসাসেবা। চিকিৎসা ভিসার সংখ্যা সীমিত থাকায় অনেক রোগী পর্যটক ভিসায় ভারতে গিয়ে চিকিৎসা নিতে আগ্রহী হচ্ছেন।
ভিসার জন্য আবেদন করতে আসা শফিকুল নামে এক ব্যক্তি জানান, অসুস্থ স্ত্রী ও মায়ের চিকিৎসার জন্য দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসা ভিসার চেষ্টা করেও সফল হননি। দীর্ঘসূত্রতা ও দালালচক্রের হয়রানির কারণে তিনি বিপাকে পড়েছিলেন। পর্যটক ভিসা চালু হওয়ায় এখন তার চিকিৎসার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৪ সালের মার্চ পর্যন্ত ২১ লাখেরও বেশি বাংলাদেশি ভারত ভ্রমণ করেছিলেন। সে সময় ভারতের মোট বিদেশি পর্যটকের প্রায় ২০ শতাংশই ছিলেন বাংলাদেশি। তবে ভিসা স্থগিত হওয়ার পর ২০২৫ সালে এই সংখ্যা কমে প্রায় চার লাখ ৭০ হাজারে নেমে আসে। তাদের বেশিরভাগই চিকিৎসা ভিসায় ভারতে গিয়েছিলেন।
সম্পর্কের অবনতি হওয়ার আগে ভারত থেকে দেওয়া মোট চিকিৎসা ভিসার ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশই বাংলাদেশিদের জন্য ছিল। পরে অনেক বাংলাদেশি বিকল্প হিসেবে চীন, থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরে চিকিৎসা নিতে শুরু করেন। কিন্তু এসব দেশে চিকিৎসা ও ভ্রমণ ব্যয় তুলনামূলক বেশি হওয়ায় মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য তা দীর্ঘমেয়াদে বাস্তবসম্মত হয়ে ওঠেনি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কলকাতা, চেন্নাই, দিল্লি, হায়দরাবাদ, বেঙ্গালুরু, মুম্বাই ও গৌহাটির হাসপাতালগুলোতে প্রতিবছর হাজারো বাংলাদেশি উন্নত চিকিৎসা নিতে যান। বিশেষ করে কলকাতা ভাষাগত সুবিধা, বাঙালি চিকিৎসক, পরিচিত খাবার এবং সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে সবচেয়ে জনপ্রিয় গন্তব্যগুলোর একটি।
ভারতীয় ভিসা আবেদনকেন্দ্রে ভিড় নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন নির্বাসিত বাংলাদেশি লেখক তসলিমা নাসরিন। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, যারা অতীতে ভারতবিরোধী বিভিন্ন স্লোগান দিয়েছেন বা ভারতের সমালোচনা করেছেন, তাদের মধ্যে কতজন এখন ভারতীয় ভিসার জন্য আবেদন করছেন।
পর্যটক ভিসা পুনরায় চালু হওয়ায় ভারতের পশ্চিমবঙ্গের ব্যবসায়ীরাও আশাবাদী। বিশেষ করে কলকাতার নিউ মার্কেটসংলগ্ন ‘মিনি বাংলাদেশ’ নামে পরিচিত ব্যবসা ও আবাসনকেন্দ্র গত দুই বছরে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ে। এই এলাকায় বাংলাদেশি রোগী, পর্যটক ও ক্রেতাদের উপস্থিতিই ছিল ব্যবসার প্রধান চালিকাশক্তি।
বাংলাদেশিদের জন্য স্বল্পমূল্যের হোটেল, রেস্তোরাঁ এবং কেনাকাটার কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এই এলাকায় ২০২৪ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে প্রায় এক হাজার কোটি রুপি ব্যবসায়িক ক্ষতি হয়েছে বলে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা দাবি করেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ভারতীয় ভিসা আবেদনকেন্দ্রগুলোর সামনে দীর্ঘ সারি শুধু ভিসার চাহিদার প্রতিফলন নয়, বরং এটি বাংলাদেশের মানুষের বাস্তব প্রয়োজনেরও প্রতিচ্ছবি। রাজনৈতিক সম্পর্কের উত্থান-পতন থাকলেও চিকিৎসা, ব্যবসা, শিক্ষা, পারিবারিক যোগাযোগ এবং ভৌগোলিক সুবিধার কারণে বাংলাদেশের মানুষের কাছে ভারত এখনও অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য হিসেবে রয়ে গেছে।
সূত্রঃ ইন্ডিয়া ট্যুডে