ঢাকার জাতীয় প্রেসক্লাবে বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সংবাদ সম্মেলনে প্রকাশ করা হয় ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে সংখ্যালঘু নির্যাতনের প্রতিবেদন।
মেলবোর্ন, ২৭ জুলাই: বাংলাদেশের ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের চিত্র বদলেছে, কিন্তু উদ্বেগ কমেনি। বরং সাম্প্রতিক সময়ে বড় আকারের গণ-সহিংসতার পরিবর্তে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ব্যক্তি, পরিবার, উপাসনালয় ও সম্পত্তিকে লক্ষ্য করে সংঘটিত হামলার প্রবণতা বেড়েছে বলে দাবি করেছে বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ (বিএইচবিসিইউসি)।
সোমবার (২৭ জুলাই) ঢাকার জাতীয় প্রেসক্লাবে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটি ‘Report on Communal Atrocities Committed Upon the Religious-Ethnic Minorities in Bangladesh (January 1–June 30, 2026)’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে সংখ্যালঘু নির্যাতনের তথ্য সংগ্রহ করে আসা সংগঠনটির দাবি, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে দেশে অন্তত ২৫৭টি সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। তবে তারা বলছে, এগুলো কেবল প্রকাশিত ও সংগ্রহ করা তথ্যের ভিত্তিতে প্রস্তুত করা একটি আংশিক চিত্র; প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি।

সংবাদ সম্মেলনে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা, ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত এবং সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন প্রণয়নের দাবি জানায় বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ। ছবি: সংগৃহীত
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর থেকে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত মোট ২ হাজার ৯৬৩টি সাম্প্রদায়িক সহিংসতার তথ্য সংগৃহীত হয়েছে। এর মধ্যে ২০২৪ সালের শেষ পাঁচ মাসে ঘটেছে ২ হাজার ১৮৪টি, ২০২৫ সালে ৫২২টি এবং ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ২৫৭টি ঘটনা। সংগঠনটির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মোট ঘটনার ৭৩ দশমিক ৭ শতাংশ সংঘটিত হয়েছিল ২০২৪ সালের শেষ পাঁচ মাসে। তবে সংখ্যাগত হ্রাসকে পরিস্থিতির উন্নতি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঐক্য পরিষদের মতে, বর্তমানে সহিংসতার চরিত্রে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে। আগে যেখানে একযোগে বহু বাড়িঘর, দোকানপাট ও মন্দিরে হামলা হতো, এখন সেখানে হত্যাকাণ্ড, উপাসনালয়ে হামলা, প্রতিমা ভাঙচুর, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ, জমি দখল, নারী নির্যাতন, ধর্ম অবমাননার অভিযোগে হয়রানি এবং লক্ষ্যভিত্তিক হামলার ঘটনা বেড়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই পরিবর্তন সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার জন্য আরও বড় হুমকি তৈরি করছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০২৬ সালে সংখ্যালঘুদের হত্যার মাসিক গড় হার ২০২৫ সালের তুলনায় বেড়েছে। একই সঙ্গে উপাসনালয়ে হামলার ঘটনাও বৃদ্ধি পেয়েছে। যদিও ভূমি দখলের হার কিছুটা কমেছে, তবুও তা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। সংগঠনটির মতে, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও উপাসনার অধিকার এখনও সরাসরি আক্রমণের মুখে রয়েছে।
অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতির বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ২ হাজার ৫৫টি ঘটনায় সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। এর ফলে বহু পরিবার জীবিকা হারিয়েছে, অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতি বেড়েছে, সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে এবং আইন ও বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা কমেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে চলতি বছরের কয়েকটি আলোচিত ঘটনারও উল্লেখ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নরসিংদীতে পঞ্চাল চন্দ্র ভৌমিককে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা, শরীয়তপুরে ব্যবসায়ী খোকন চন্দ্র দাসকে কুপিয়ে হত্যা, সুনামগঞ্জে ধর্ম অবমাননার অভিযোগকে কেন্দ্র করে হিন্দু পল্লী ও মন্দিরে হামলা, টাঙ্গাইলে একটি গারো পরিবারের উচ্ছেদ, জয়পুরহাটে শ্যামল চন্দ্র মালীর হত্যাকাণ্ড, শরীয়তপুরে এক হিন্দু প্রধান শিক্ষককে মারধর, কক্সবাজারে রাখাইন সম্প্রদায়ের শ্মশানভূমি দখল, মানিকগঞ্জে কৃষ্ণ রাজবংশীর হত্যাকাণ্ড এবং টাঙ্গাইলে আট বছরের শিশু সেনজুতির হত্যার ঘটনা।
প্রতিবেদনে গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে নির্মাণাধীন ৮১ ফুট উচ্চতার রামমূর্তির উদ্যোক্তা হরিদাস চন্দ্র তরণী দাসের গ্রেপ্তার নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। সংগঠনটির দাবি, যিনি দীর্ঘদিন ধরে উগ্রবাদী গোষ্ঠীর হুমকির মুখে ছিলেন, তাকেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সংবাদ সম্মেলন থেকে তাঁর অবিলম্বে মুক্তির দাবি জানানো হয় এবং আশঙ্কা প্রকাশ করা হয় যে এই গ্রেপ্তার রামমূর্তি নির্মাণকাজে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে।
একই সঙ্গে, বাংলাদেশ সম্মিলিত সনাতনী জাগরণ জোটের মুখপাত্র চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারীর মুক্তির দাবিও পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। সংগঠনটির অভিযোগ, প্রায় দুই বছর ধরে তিনি কারাগারে রয়েছেন এবং এখনও মুক্তি পাননি। এছাড়া আগের অন্তর্বর্তী সরকারের সময় চাকরি হারানো বহু সংখ্যালঘু সরকারি কর্মকর্তা, শিক্ষক ও কর্মচারী এখনও ন্যায়বিচার পাননি বলেও দাবি করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে সরকারকে সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন প্রণয়ন, জাতীয় সংখ্যালঘু কমিশন ও সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠন, অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইনের কার্যকর বাস্তবায়ন, দেবোত্তর সম্পত্তি সুরক্ষা আইন, বৈষম্যবিরোধী আইন প্রণয়ন, রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সংখ্যালঘুদের যথাযথ প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা এবং সংখ্যালঘু ধর্মীয় উৎসবে অতিরিক্ত সরকারি ছুটি ঘোষণাসহ একাধিক দাবি জানানো হয়। পাশাপাশি ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের জন্য সংসদে সংরক্ষিত আসনের প্রস্তাবও পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে।
তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই প্রতিবেদনটি সরকারের আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যান নয়। বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ জানিয়েছে, সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য, বিভিন্ন উৎস এবং তাদের নিজস্ব তথ্য সংগ্রহের ভিত্তিতে এই প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়েছে এবং এতে উল্লেখিত ঘটনাগুলো সামগ্রিক পরিস্থিতির একটি আংশিক চিত্র মাত্র।
তবুও প্রতিবেদনটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে—বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ধরন কি কেবল বদলেছে, নাকি সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে আরও নীরব, পরিকল্পিত ও দীর্ঘস্থায়ী নির্যাতনের নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে?