বাংলাদেশ

জাতিসংঘে খলিলুর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশের আদিবাসী অধিকার নিয়ে প্রশ্ন

  • 1:36 pm - September 12, 2026
  • পঠিত হয়েছে:৩২ বার
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান।ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার নিয়ে নতুন করে আন্তর্জাতিক মনোযোগের দাবি জানিয়েছেন লেখক পূর্ণ লাল চাকমা। তাঁর মতে, জাতিসংঘে ‘সবার জন্য কার্যকর একটি জাতিসংঘ’ প্রতিষ্ঠার কথা বলার পাশাপাশি বাংলাদেশে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর পরিচয়, ভূমি, সংস্কৃতি, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও নিরাপত্তার মতো দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত বিষয়গুলোও গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।

ইউরেশিয়া রিভিউতে প্রকাশিত এক মতামতধর্মী নিবন্ধে পূর্ণ লাল চাকমা এসব বিষয় তুলে ধরেছেন। নিবন্ধে বলা হয়েছে, খলিলুর রহমান ‘আস্থা পুনরুদ্ধার, রূপান্তর ব্যবস্থাপনা: সবার জন্য কার্যকর একটি জাতিসংঘ’ এই প্রতিপাদ্য সামনে রেখে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। বাংলাদেশের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অর্জন হলেও একই সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরীণ মানবাধিকার ও অন্তর্ভুক্তির বিষয়গুলো নিয়ে পর্যালোচনার সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন লেখক।

খলিলুর রহমানের দায়িত্ব গ্রহণকে বাংলাদেশের জন্য একটি উল্লেখযোগ্য কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে উল্লেখ করে নিবন্ধে বলা হয়েছে, জাতিসংঘের সঙ্গে কয়েক দশকের অভিজ্ঞতা থাকা একজন বাংলাদেশি কূটনীতিক বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক দায়িত্বে এসেছেন। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ১৯৩টি সদস্যরাষ্ট্রের কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব তাঁর নেতৃত্বের সঙ্গে যুক্ত। তবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের নেতৃত্ব যত দৃশ্যমান হচ্ছে, দেশের ভেতরে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের উদ্বেগগুলোও তত বেশি গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে বলে মত দিয়েছেন লেখক।

নিবন্ধে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে আদিবাসীদের অধিকার নিয়ে আলোচনা প্রায়ই ‘আদিবাসী’ শব্দটির সাংবিধানিক স্বীকৃতিকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। বাংলাদেশের সংবিধানের ২৩ক অনুচ্ছেদে ‘উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃগোষ্ঠী ও সম্প্রদায়’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। তবে ‘আদিবাসী জনগোষ্ঠী’ শব্দটি সেখানে উল্লেখ নেই। লেখকের মতে, সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর কাছে বিষয়টি শুধু একটি শব্দের ব্যবহার নিয়ে বিতর্ক নয়। এর সঙ্গে তাদের পরিচয়, পূর্বপুরুষের ভূমি, সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব, প্রতিনিধিত্ব ও নিজেদের পরিচয় নির্ধারণের অধিকার জড়িত।

পূর্ণ লাল চাকমা মনে করেন, আদিবাসী অধিকারকে শুধু পার্বত্য চট্টগ্রামের বিষয় হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যাবে না। পার্বত্য চট্টগ্রামের পাশাপাশি দেশের সমতল, বনাঞ্চল ও উপকূলীয় এলাকাতেও বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠী বসবাস করে। তাদের ইতিহাস ও বাস্তবতা এক নয়, তবে ভূমি হারানো, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষা, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব এবং নিজেদের পরিচয় নির্ধারণের অধিকার নিয়ে অনেক জনগোষ্ঠীর উদ্বেগ রয়েছে।

নিবন্ধে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিষয়টি বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে। এই অঞ্চলের দীর্ঘ সশস্ত্র সংঘাতের অবসান ও রাজনৈতিক সমাধানের লক্ষ্যে ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তিতে আঞ্চলিক প্রতিষ্ঠান, ভূমি বিরোধ, বাস্তুচ্যুত মানুষ এবং স্থানীয় প্রশাসনসহ বিভিন্ন বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল।

তবে প্রায় তিন দশক পরও শান্তিচুক্তির বাস্তবায়ন নিয়ে সরকারের সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মতপার্থক্য রয়েছে বলে নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, চুক্তির অধিকাংশ ধারা বাস্তবায়িত হয়েছে বা বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। অন্যদিকে, সরকারের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরকারী পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি দাবি করে, ভূমি, আঞ্চলিক কর্তৃত্ব ও বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখনো অমীমাংসিত।

এই বিরোধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে ভূমির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। লেখকের মতে, অনেক আদিবাসী জনগোষ্ঠীর কাছে ভূমি শুধু অর্থনৈতিক সম্পদ নয়। এটি তাদের জীবিকা, পূর্বপুরুষের স্মৃতি, সমাধিস্থল, পবিত্র স্থান এবং ভাষা ও সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখার অন্যতম ভিত্তি। ফলে ঐতিহ্যগত ভূমি হারানোর প্রভাব শুধু আর্থিক ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না।

পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকারবিষয়ক বিভিন্ন সংস্থার উদ্বেগের কথাও নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে। জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ ও বিভিন্ন মানবাধিকার ব্যবস্থার প্রতিবেদনে ভূমি দখল, বাস্তুচ্যুতি, আদিবাসী নেতা ও মানবাধিকারকর্মীদের ভয়ভীতি প্রদর্শন, বৈষম্য ও সহিংসতার অভিযোগের কথা উঠে এসেছে। পাশাপাশি হত্যাকাণ্ড, গুম, যৌন ও লৈঙ্গিক সহিংসতা, বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা এবং শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদে বিধিনিষেধের অভিযোগও বিভিন্ন পর্যায়ে উত্থাপিত হয়েছে।

তবে এসব অভিযোগকে আদালতে প্রমাণিত সত্য হিসেবে ধরে নেওয়া উচিত নয় বলেও নিবন্ধে সতর্ক করা হয়েছে। লেখকের মতে, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ ও ন্যায়সংগত তদন্ত প্রয়োজন। একই সঙ্গে এসব অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে আদিবাসীদের অধিকারকে শুধু সাংবিধানিক পরিভাষার বিতর্ক হিসেবে দেখা উচিত নয়।

পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরে সমতলের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সমস্যার কথাও নিবন্ধে তুলে ধরা হয়েছে। উত্তর বাংলাদেশের সাঁওতাল সম্প্রদায় দীর্ঘদিন ধরে ভূমি নিয়ে বিরোধের মুখোমুখি হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। একইভাবে উপকূলীয় অঞ্চলের রাখাইন সম্প্রদায় তাদের ঐতিহ্যগত ভূমি ও শ্মশান দখল বা সংকুচিত হয়ে যাওয়ার বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে।

লেখক অবশ্য উল্লেখ করেছেন, এসব জনগোষ্ঠীর পরিস্থিতি এক নয়। রাঙামাটির চাকমা পরিবার, বান্দরবানের ম্রো সম্প্রদায়, উত্তরাঞ্চলের সাঁওতাল জনগোষ্ঠী কিংবা উপকূলীয় রাখাইন সম্প্রদায়ের ইতিহাস ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ভিন্ন। তাই সবাইকে একটি অভিন্ন ও সমজাতীয় গোষ্ঠী হিসেবে দেখা হলে তাদের স্বতন্ত্র বাস্তবতা উপেক্ষিত হতে পারে।

তবে তাদের অনেক উদ্বেগের সঙ্গে একটি মৌলিক প্রশ্নের সম্পর্ক রয়েছে। ভূমি, সংস্কৃতি, পরিচয় ও ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীগুলো নিজেদের মতামত দেওয়ার কতটা সুযোগ পাচ্ছে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন লেখক।

নিবন্ধে বলা হয়েছে, শুধু ‘আদিবাসী’ শব্দটি ব্যবহার করলেই ভূমি বিরোধের সমাধান হবে না কিংবা পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির সব ধারা বাস্তবায়িত হবে না। তবে স্বীকৃতির প্রশ্নটি জনগোষ্ঠীগুলোর নিজেদের পরিচয় নির্ধারণের অধিকার, ভূমির সঙ্গে তাদের ঐতিহাসিক সম্পর্ক এবং নিজেদের জীবনকে প্রভাবিত করে এমন সিদ্ধান্তে অংশগ্রহণের বিষয়টির সঙ্গে যুক্ত।

আন্তর্জাতিক আদিবাসী অধিকারবিষয়ক মানদণ্ডের সঙ্গেও বাংলাদেশের সম্পর্ক রয়েছে বলে নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশ ১৯৭২ সালে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার আদিবাসী ও উপজাতীয় জনগোষ্ঠীসংক্রান্ত কনভেনশন ১০৭ অনুসমর্থন করে। ২০০৭ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকারবিষয়ক ঘোষণাপত্র গ্রহণ করার সময় বাংলাদেশ ভোটদানে বিরত ছিল।

তবে লেখক বাংলাদেশের সরকারের অবস্থানও তুলে ধরেছেন। সরকারের পক্ষ থেকে অভিন্ন বাংলাদেশি জাতীয় পরিচয়, সাংবিধানিক সমতা এবং ‘আদিবাসী’ শব্দটির ঐতিহাসিক ও আইনগত প্রভাব নিয়ে উদ্বেগের কথা বলা হয়। পূর্ণ লাল চাকমার মতে, এ যুক্তিগুলোও গুরুত্ব দিয়ে শোনা প্রয়োজন। একই সঙ্গে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বক্তব্যও সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।

নিবন্ধে বলা হয়েছে, আদিবাসী জনগোষ্ঠীগুলো নিজেদের অধিকার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কথা বলে আসছে। রাজনৈতিক সংগঠন, ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন, অধিকারকর্মী, শিক্ষার্থী, লেখক ও সাধারণ পরিবারের মাধ্যমে তারা নিজেদের দাবি তুলে ধরছে। তবে তাদের ভূমি, পরিচয় ও ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় তাদের কণ্ঠ কতটা কার্যকরভাবে পৌঁছাচ্ছে, সেটিই বড় প্রশ্ন।

এখানেই জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে খলিলুর রহমানের দায়িত্বকে প্রাসঙ্গিক বলে মনে করেন লেখক। তবে তাঁর মতে, খলিলুর রহমান বাংলাদেশের আদিবাসী নীতি তৈরি করেননি এবং জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশের সংবিধান পরিবর্তন বা পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি বিরোধের সরাসরি সমাধান করার ক্ষমতাও তাঁর নেই। তাঁর দায়িত্ব মূলত কূটনৈতিক এবং বিভিন্ন পক্ষকে আলোচনায় নিয়ে আসার সঙ্গে সম্পর্কিত।

তাই বিষয়টি ক্ষমতার চেয়ে বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্ন বলেই দেখেছেন পূর্ণ লাল চাকমা। তাঁর মতে, দেশের ভেতরে আদিবাসীদের স্বীকৃতি, ভূমি, সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন অমীমাংসিত থাকলে আন্তর্জাতিক মঞ্চে মর্যাদা, অন্তর্ভুক্তি ও ন্যায়বিচারের বিষয়ে বাংলাদেশের বক্তব্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে।

তবে এটিকে খলিলুর রহমানের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত অভিযোগ হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই বলেও নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে। বরং তাঁর জাতিসংঘের দায়িত্বকে বাংলাদেশের জন্য একটি সুযোগ হিসেবে কাজে লাগানো যেতে পারে বলে মনে করেন লেখক।

নিবন্ধে বলা হয়েছে, নিজেদের সমাজের কঠিন ও অমীমাংসিত বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করলে কোনো দেশের শক্তি কমে যায় না। জাতীয় ঐক্যের জন্য সাংস্কৃতিক অভিন্নতাও অপরিহার্য নয়। বাংলাদেশি নাগরিকত্ব ও আদিবাসী পরিচয়কে পরস্পরবিরোধী হিসেবে দেখারও প্রয়োজন নেই। একটি রাষ্ট্র একই সঙ্গে তার সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে পারে এবং স্বীকার করতে পারে যে, কিছু নাগরিকের স্বতন্ত্র ইতিহাস, সংস্কৃতি ও পূর্বপুরুষের ভূমির সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে।

লেখকের মতে, মূল পরীক্ষা হওয়া উচিত বাস্তব ক্ষেত্রে। আদিবাসী জনগোষ্ঠীগুলো তাদের ভূমি নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে অর্থবহভাবে অংশ নিতে পারছে কি না, বৈধ ভূমি বিরোধ ন্যায়সংগতভাবে সমাধান হচ্ছে কি না, তাদের ভাষা ও সংস্কৃতি টিকে থাকার সুযোগ পাচ্ছে কি না এবং সহিংসতা, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও ভূমি দখলের অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত হচ্ছে কি না, এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ।

পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষেত্রে এই প্রশ্নগুলো শেষ পর্যন্ত ১৯৯৭ সালের শান্তিচুক্তির বাস্তবায়নের বিষয়টির সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। একটি শান্তিচুক্তির কার্যকারিতা শুধু কাগজে স্বাক্ষরের ওপর নির্ভর করে না। যারা সেই চুক্তির ওপর আশা রেখেছিল, তারা ভূমি নিষ্পত্তি, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, আঞ্চলিক প্রতিষ্ঠান ও দৈনন্দিন নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বাস্তব পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছে কি না, তার ওপর চুক্তিটির বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ভর করে।

অন্যদিকে পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরে থাকা আদিবাসী জনগোষ্ঠীগুলোর জন্য একই ধরনের রাজনৈতিক কাঠামো নেই। তাদের বিষয়গুলো হয়তো তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত, তবে পূর্বপুরুষের ভূমি, সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব ও প্রতিনিধিত্ব নিয়ে তাদের উদ্বেগও গুরুত্বপূর্ণ বলে নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ কারণে বাংলাদেশে আদিবাসীদের অধিকার নিয়ে আলোচনায় পাহাড় ও সমতল উভয় অঞ্চলকে অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে। শুধু পার্বত্য চট্টগ্রামকে গুরুত্ব দিলে বিষয়টি আঞ্চলিক নিরাপত্তার ইস্যু হিসেবে সীমাবদ্ধ হয়ে যেতে পারে। আবার পার্বত্য চট্টগ্রামকে বাদ দিলে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সঙ্গে রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক চুক্তির বিষয়টি উপেক্ষিত হবে।

নিবন্ধে রোহিঙ্গা ইস্যুতেও বাংলাদেশের অবস্থানের প্রসঙ্গ এসেছে। রোহিঙ্গাদের পরিচয় অস্বীকার বা নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করার প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিকভাবে অবস্থান নিয়েছে এবং তাদের মর্যাদা, সুরক্ষা ও মিয়ানমারে নিরাপদ প্রত্যাবাসনের পক্ষে কথা বলেছে। তবে রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ঐতিহাসিক ও আইনগত পরিস্থিতি এক নয় বলেও লেখক স্পষ্ট করেছেন।

লেখকের মতে, উভয় ক্ষেত্র থেকেই একটি বিষয় বোঝা যায়, ইতিহাস, পরিচয় ও অধিকারের সঙ্গে যখন কোনো জনগোষ্ঠীর অস্তিত্বের প্রশ্ন জড়িত থাকে, তখন পরিচয় শুধু একটি শব্দের বিষয় থাকে না।

এই প্রেক্ষাপটে খলিলুর রহমানের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্বকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়েছে। তাঁর সভাপতিত্বের মূল প্রতিপাদ্য যখন আস্থা পুনরুদ্ধার এবং সবার জন্য কার্যকর একটি জাতিসংঘ গড়ে তোলা, তখন দেশের অভ্যন্তরেও দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত প্রশ্নগুলোর দিকে মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন বলে মত দিয়েছেন লেখক।

বাংলাদেশে আদিবাসীদের অধিকার নিয়ে একটি শক্তিশালী জাতীয় আলোচনা গড়ে তুলতে সরকারের প্রতিটি অভিযোগ বা রাজনৈতিক দাবি মেনে নেওয়া প্রয়োজন নেই। বরং গুরুত্ব দিয়ে কথা শোনা, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, বৈধ বিরোধের সমাধান, রাজনৈতিক অঙ্গীকার বাস্তবায়ন এবং মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করে এমন সিদ্ধান্তে সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে নিবন্ধে বলা হয়েছে।

পূর্ণ লাল চাকমার মতে, বাংলাদেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠীগুলোর পরিচয় নির্ধারণ করে দেওয়ার জন্য জাতিসংঘের প্রয়োজন নেই। তারা নিজেরাই নিজেদের পরিচয় সম্পর্কে জানে। তাদের প্রয়োজন নিজেদের কথা বলার সুযোগ, অধিকার হুমকির মুখে পড়লে সুরক্ষা এবং এমন প্রতিষ্ঠান, যারা রাজনৈতিকভাবে অস্বস্তিকর হলেও তাদের বক্তব্য শুনতে প্রস্তুত।

খলিলুর রহমান এখন এমন একটি সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন, যেখানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও জনগোষ্ঠী যুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি, বৈষম্য, পরিচয় ও মানবাধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুলবে। একই সময়ে বাংলাদেশের পাহাড়, সমতল, বন ও উপকূলীয় অঞ্চলের জনগোষ্ঠীগুলোও স্বীকৃতি, ভূমি, সংস্কৃতি, প্রতিনিধিত্ব এবং অমীমাংসিত প্রতিশ্রুতি নিয়ে নিজেদের প্রশ্ন তুলে চলেছে।

লেখাটির সার্বিক বক্তব্য হলো, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির পদে বাংলাদেশের একজন কূটনীতিকের আসীন হওয়া যেমন দেশের জন্য গর্বের বিষয়, তেমনি এটি দেশের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতা পর্যালোচনারও একটি সুযোগ। ‘সবার জন্য কার্যকর একটি জাতিসংঘ’ গড়ার লক্ষ্য যদি সত্যিই সামনে থাকে, তাহলে বাংলাদেশের ভেতরে সেই ‘সবাই’-এর মধ্যে আদিবাসী জনগোষ্ঠীগুলোর অধিকার, পরিচয় ও মর্যাদার বিষয়গুলোও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

নিবন্ধের শেষ বক্তব্য অনুযায়ী, দেশের বাইরে ন্যায়বিচারের পক্ষে বাংলাদেশের অবস্থান তখনই আরও বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠবে, যখন দেশের মানুষও নিজেদের জীবনে সেই ন্যায়বিচারের প্রতিফলন দেখতে পাবে।

এই শাখার আরও খবর

সিডনিতে এক মঞ্চে দুই বাংলার রক তারকা জেমস-রূপম

অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে একই মঞ্চে পারফর্ম করতে যাচ্ছেন বাংলাদেশের জনপ্রিয় রক তারকা নগরবাউল জেমস ও ওপার বাংলার ব্যান্ড ‘ফসিলস’-এর ভোকাল রূপম ইসলাম। দুই বাংলার জনপ্রিয় এই…

এ কেমন রাষ্ট্র? এ কেমন মানবিকতা?

কারাগারের লোহার দরজা খুলেছিল মাত্র পাঁচ ঘণ্টার জন্য। মুক্তির আনন্দে নয়, মায়ের শেষকৃত্যে অংশ নিতে। প্রায় দুই বছর ধরে বন্দী সনাতনী ধর্মীয় নেতা,  সনাতন জাগরণ…

রংপুরে ৪ খুনের ঘটনায় বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি আইনজীবী ঐক্য পরিষদের

রংপুর নগরীতে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চারজন নিহত হওয়ার ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ আইনজীবী…

মোদি ও পুতিনের বৈঠকে কী কথা হলো?

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন দুই দেশের বিশেষ ও কৌশলগত সম্পর্ক আরও জোরদার করার বিষয়ে সম্মত হয়েছেন। শুক্রবার নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত বৈঠকে…

কার্ডে বাজার সদাই: তারেক সরকারের ছয় মাসে মূল্যস্ফীতি প্রবৃদ্ধি ও খেলাপি ঋণের বাস্তব হিসাব

তিন পর্বের ধারাবাহিক আয়োজনের প্রথম পর্ব আজ প্রকাশিত হলো। শিগগিরই প্রকাশিত হবে দ্বিতীয় পর্ব। সঙ্গে থাকুন ওটিএন বাংলার সঙ্গে। ভার্জিনিয়া, ইউএসএ: তারেক রহমানের সরকার কেমন…

ট্রাম্পের শুল্কনীতি ও ডলারের আধিপত্যের সামনে দিল্লিতে কতটা সফল হবে ব্রিকস সম্মেলন?

নয়াদিল্লিতে যখন বিশ্বের উদীয়মান শক্তিগুলোর অন্যতম জোট ব্রিকসের শীর্ষ সম্মেলন বসছে, তখন সম্মেলনের টেবিলে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো আসন নেই। কিন্তু আলোচনার বাইরে রাখাও কঠিন হয়ে…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au