নাকে অক্সিজেনের নল, মুমূর্ষু মাকে নিয়ে উত্তাল সাগর পাড়ি
নাকে অক্সিজেনের নল। পাশে অক্সিজেন সিলিন্ডার। স্বজনদের কোলে শুয়ে আছেন ৮০ বছরের মুমূর্ষু এক বৃদ্ধা। বাইরে উত্তাল সাগর, তার ওপর মুষলধারে বৃষ্টি। ঢেউয়ের ধাক্কায় কখনো…
গত ১১ আগস্ট মানিকগঞ্জের শিবালয়ে বিউটি টোব্যাকো নামের একটি কোম্পানিতে পুলিশ ও কাস্টমসের যৌথ দল অভিযান চালায়। অভিযানে ‘কিং ব্ল্যাক’, ‘ডি অ্যান্ড জি’, ‘ডলার’, ‘সেনর গোল্ড’ ও ‘বার্বি’ ব্র্যান্ডের ৩ লাখ ৭০ হাজার শলাকা সিগারেট এবং ১৩ হাজার ট্যাক্স স্ট্যাম্প বা ব্যান্ডরোল জব্দ করা হয়। পরবর্তীতে যাচাই-বাছাই করে ৯০ হাজার শলাকায় নকল ব্যান্ডরোল ও ১৩ হাজার পিস অব্যবহৃত নকল ব্যান্ডরোলের উপস্থিতি মেলে, যার মাধ্যমে প্রায় সাড়ে ১১ লাখ টাকা শুল্ক-কর ফাঁকির চেষ্টা করা হয়েছিল।
এর আগে ২০২৫ সালের ৪ ডিসেম্বর ঈশ্বরদীর ইউনাইটেড টোব্যাকো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের কারখানায় অভিযান চালিয়ে প্রায় ৯ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির প্রমাণ পায় ভ্যাট গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। সেই অভিযানে ৬ লাখ ৩৪ হাজার ৫৯০ শলাকা জাল ব্যান্ডরোলযুক্ত সিগারেট এবং ১০ লাখ ২৯ হাজার পিস অব্যবহৃত জাল ব্যান্ডরোল জব্দ করা হয়।
বিভিন্ন সময়ে পরিচালিত অভিযানে এমন অসংখ্য উদাহরণ পাওয়া যায়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)-সহ সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, শুধু ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাজস্ব ফাঁকি ও জাল ব্যান্ডরোল চক্রের বিরুদ্ধে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ১৮ হাজার অভিযান পরিচালিত হয়েছে। অর্থাৎ আড়ালেই সবসময় নকল সিগারেট, নকল ও পুনর্ব্যবহৃত ব্যান্ডরোল, চোরাচালান এবং সর্বোচ্চ খুচরা মূল্যের (এমআরপি) চেয়ে বেশি দামে বিক্রির মাধ্যমে বিপুল রাজস্ব ফাঁকির প্রক্রিয়া সক্রিয় রয়েছে।
ওই অর্থবছরে সিগারেট খাত থেকে এনবিআর ৪৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকার রাজস্ব আদায় করতে সক্ষম হয়েছে। তবে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘বিউরো অব ইকোনমিক রিসার্চ’ এবং ‘বাংলাদেশ নেটওয়ার্ক ফর টোব্যাকো ট্যাক্স পলিসি’ (বিএনটিটিপি)-র যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, কেবল বিক্রির ধাপেই এই খাতে বছরে প্রায় ৫ হাজার ১৮২ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি হয়। আর কাঁচা তামাকপাতা সংগ্রহ থেকে শুরু করে।
কারখানা, সরবরাহ ব্যবস্থা ও খুচরা বাজার পর্যন্ত পুরো চেইনে ফাঁকি আটকাতে পারলে আরও অন্তত ১০ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব আদায় সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

কেবল বিক্রির ধাপেই এই খাতে বছরে প্রায় ৫ হাজার ১৮২ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি হয় / প্রতীকী ছবি
তামাক খাত থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৪৭, ৫০০ কোটি টাকার রাজস্ব আদায় হলেও কাঁচামাল সংগ্রহ, উৎপাদন ও বিপণনের পুরো চেইনে ফাঁকি আটকাতে পারলে আরও অন্তত ১০ হাজার কোটি টাকা আদায় সম্ভব।
রাজস্ব ফাঁকি ও নকল ব্যান্ডরোল চক্র রুখতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ১১ সদস্যের উচ্চপর্যায়ের কেন্দ্রীয় মনিটরিং কমিটি এবং মাঠপর্যায়ে কঠোর তদারকির জন্য ২৭টি বিশেষ এনফোর্সমেন্ট টিম গঠন করেছে
এমন পরিস্থিতিতে তামাক খাতে রাজস্ব সুরক্ষায় কেন্দ্র থেকে মাঠপর্যায়ে তদারকি জোরদার করেছে এনবিআর। এ খাত থেকে যথাযথ রাজস্ব আদায় নিশ্চিত করতে ইতোমধ্যে উচ্চপর্যায়ের ১১ সদস্যের কেন্দ্রীয় মনিটরিং কমিটি গঠন করা হয়েছে। পাশাপাশি গঠন করা হয়েছে ২৭টি এনফোর্সমেন্ট টিম, যারা সবুজ তামাকপাতা থেকে শুরু করে কারখানা ও খুচরা দোকান পর্যন্ত অভিযান ও তদারকি চালাবে।
এই নতুন উদ্যোগের আওতায় শুধু বৈধ-অবৈধ সিগারেট শনাক্ত নয়; বরং ব্যান্ডরোলের ব্যবহার, কাঁচামাল, প্যাকেজিং পেপার থেকে শুরু করে উৎপাদন ও বিপণনের প্রতিটি ধাপ যাচাই করা হবে।
এ বিষয়ে এনবিআরের ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা (সদস্য) নাম প্রকাশ না করে ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘কেন্দ্রীয় কমিটি গঠনের পর গত ২৫ আগস্ট তামাক সংশ্লিষ্ট সব কোম্পানির প্রতিনিধি এবং কমিশনারেট অফিসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। মূল উদ্দেশ্য ছিল সর্বোচ্চ রাজস্ব আদায় নিশ্চিত করা। বৈঠকে ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ দেশের ২৭টি কমিশনারেট ভিত্তিক পৃথক এনফোর্সমেন্ট কমিটি গঠন ও বেশকিছু কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আমরা এখন মাঠপর্যায়ে নজরদারির ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দিচ্ছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রতিটি কাস্টমস ও ভ্যাট কমিশনারেট অফিস থেকে পাঁচ সদস্যের এনফোর্সমেন্ট টিম কাজ করবে। যেসব এলাকায় বিড়ি-সিগারেটের কারখানা রয়েছে, সেদিকে বিশেষ নজর থাকবে।
এই টিমগুলো সপ্তাহে অন্তত পাঁচ দিন বাজার, কারখানা ও খুচরা দোকানে অভিযান চালাবে। আমাদের লক্ষ্য নকল বিড়ি, নকল সিগারেট ও নকল ব্যান্ডরোল নির্মূল করা। রিটেইল পর্যায় পর্যন্ত আমাদের পৌঁছাতে হবে; কারণ দোকানদারদের সচেতন ও সতর্ক করা গেলে নকল সিগারেট বিক্রি কঠিন হয়ে পড়বে। দিন ও রাতের অভিযানের জন্য পৃথক প্রস্তুতি রাখা হয়েছে।’
এনবিআর সদস্য আরও যুক্ত করেন, “আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ‘গ্রিন লিফ প্রসেসিং’ বা কাঁচা তামাক প্রক্রিয়াজাতকরণ পর্যায় থেকে তদারকি বাড়ানো। যেখান থেকে সিগারেটের কাগজ আমদানি বা বিক্রি করা হয়, সেখানেও কঠোর মনিটরিং থাকবে। বর্তমানে দেশে সাতটি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান এবং দুটি স্থানীয় পেপার প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে; সবগুলোকে কঠোর নজরদারির আওতায় আনা হবে।”

গাজীপুরের কৌলটিয়ায় ভার্গো সিগারেট ফ্যাকটরিতে অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ অবৈধ ব্যান্ডরোলসহ বিপুল পরিমাণ জব্দ করেছে ভ্যাট গোয়েন্দা অধিদফতর / ছবি- সংগৃহীত
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বিশ্বজুড়ে অবৈধ তামাক বাণিজ্যে সরকারগুলো বছরে ৪০.৫ বিলিয়ন ডলার রাজস্ব হারায়। বাংলাদেশেও মোট সিগারেট বাজারের ১৩.১ শতাংশ অবৈধ পণ্যের দখলে। দেশের পাবনা, কুষ্টিয়া, মানিকগঞ্জ ও রংপুরের মতো কেন্দ্রগুলোতে নকল বা পুনর্ব্যবহৃত ব্যান্ডরোল ব্যবহার করে ৬৭টিরও বেশি ব্র্যান্ডের অবৈধ সিগারেট তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম ও টেকনাফ নৌপথ ব্যবহারে বিদেশি চোরাচালানকৃত সিগারেট দেশে ঢুকছে
তামাক খাতে রাজস্ব ফাঁকি ও এনবিআরের নতুন উদ্যোগের বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এবং বাংলাদেশ নেটওয়ার্ক ফর টোব্যাকো ট্যাক্স পলিসির (বিএনটিটিপি) কনভেনর অধ্যাপক ড. রুমানা হক ঢাকা পোস্টকে বলেন, “সরকারের দিক থেকে আমরা একটি দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার আশা করি, যেন তারা তাদের সর্বাত্মক চেষ্টা চালায়।
সফল হতে হলে শুরুতেই এই প্রতিশ্রুতি প্রয়োজন। কারণ, অনেক সময় তামাক কোম্পানিগুলো সরকারের নীতি নির্ধারণে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে, যাকে আমরা ‘ইন্ডাস্ট্রি ইনফ্লুয়েন্স’ বলি। তামাক শিল্পের প্রভাবমুক্ত থেকে ডব্লিউএইচও-র এফসিটিসি নীতি মেনে এনবিআর ও অর্থ মন্ত্রণালয়কে কাজ করতে হবে। কোম্পানিগুলোর সঙ্গে কোনো গোপন বৈঠক করা যাবে না।”
তিনি আরও যোগ করেন, ‘উৎপাদন থেকে বাজার পর্যন্ত তামাকপণ্যের গতিপথ নজরদারিতে দ্রুত ট্র্যাকিং-ট্রেসিং এবং কিউআর কোডভিত্তিক ডিজিটাল প্রযুক্তি চালু করা জরুরি। যেমন— যেকোনো সাধারণ পণ্যে কিউআর কোড স্ক্যান করে সঠিক ট্যাক্স দেওয়া হয়েছে কি না বা উৎপাদক কে— তা জানা যায়, তামাক পণ্যেও এটি করা উচিত। কেবল সিগারেট নয়, জর্দা ও গুলের মতো অত্যন্ত ক্ষতিকর পণ্যেও কিউআর কোড বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন।’
কেন্দ্রীয় কমিটি ও ২৭ এনফোর্সমেন্ট টিমের রূপরেখা
তামাক খাত থেকে যথাযথ রাজস্ব আদায় ও ফাঁকি প্রতিরোধে নিরীক্ষা গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে আহ্বায়ক এবং এনবিআরের মূসক বাস্তবায়ন (পণ্য) শাখার দ্বিতীয় সচিবকে সদস্য সচিব করে ১১ সদস্যের একটি মনিটরিং কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিতে মহাপরিচালক (সিআইসি), মহাপরিচালক (কাস্টমস গোয়েন্দা) এবং বৃহৎ করদাতা ইউনিট (এলটিইউ-ভ্যাট) সহ ঢাকা (পূর্ব), চট্টগ্রাম, রংপুর, যশোর, গাজীপুর ও রাজশাহীর কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনাররা সদস্য হিসেবে রয়েছেন।
কমিটির কার্যপরিধি ও দায়িত্বের বিষয়ে এনবিআর সূত্রে জানা যায়, কমিটি তামাকের কাঁচামাল থেকে শুরু করে ভোক্তা পর্যায় পর্যন্ত সার্বিক বাজার মনিটরিং ও রাজস্ব সুরক্ষায় দায়িত্ব পালন করবে। যার মধ্যে রয়েছে-
এই কমিটির যাবতীয় কর্মকাণ্ড তদারকি করছেন এনবিআরের মূসক বাস্তবায়ন ও আইটি বিষয়ক সদস্য। কমিটি তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন সরাসরি এনবিআর চেয়ারম্যানের কাছে দাখিল করবে।
তামাক খাতে রাজস্ব আদায়ের চিত্র
এনবিআরের হালনাগাদ তথ্যানুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সিগারেট খাত থেকে মোট রাজস্ব আদায় হয়েছে ৪৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে কেবল বৃহৎ করদাতা ইউনিট (ভ্যাট) থেকে এসেছে ৪৩ হাজার ৬৩৮ কোটি টাকা। বাকি রাজস্ব এসেছে অন্যান্য মাঠপর্যায়ের উইং থেকে, যা নির্দেশ করে যে আঞ্চলিক বা মাঠপর্যায়ে রাজস্ব আদায়ে তৎপরতা বাড়ানোর আরও সুযোগ রয়েছে।

চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিপুল পরিমাণ বিদেশি সিগারেট ও আইফোনসহ সাড়ে ৫ কোটি টাকার পণ্য জব্দ করা হয় / ছবি- সংগৃহীত
প্রতিটি কাস্টমস ও ভ্যাট কমিশনারেট অফিস থেকে পাঁচ সদস্যের এনফোর্সমেন্ট টিম কাজ করবে। যেসব এলাকায় বিড়ি-সিগারেটের কারখানা রয়েছে, সেদিকে বিশেষ নজর থাকবে। এই টিমগুলো সপ্তাহে অন্তত পাঁচ দিন বাজার, কারখানা ও খুচরা দোকানে অভিযান চালাবে। আমাদের লক্ষ্য নকল বিড়ি, নকল সিগারেট ও নকল ব্যান্ডরোল নির্মূল করা। রিটেইল পর্যায় পর্যন্ত আমাদের পৌঁছাতে হবে; কারণ দোকানদারদের সচেতন ও সতর্ক করা গেলে নকল সিগারেট বিক্রি কঠিন হয়ে পড়বেএনবিআরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা (সদস্য, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক)
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ খাত থেকে রাজস্ব এসেছিল ৪০ হাজার ৪১১ কোটি টাকা, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৩৭ হাজার ৯১৫ কোটি, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৩২ হাজার ৮১৬ কোটি, ২০২১-২২ অর্থবছরে ২৯ হাজার ৬৫৪ কোটি এবং ২০২০-২১ অর্থবছরে ২৭ হাজার ৯৩০ কোটি টাকা।
অবৈধ সিগারেটে বছরে রাজস্ব ফাঁকি ১০ হাজার কোটি টাকা
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে অবৈধ তামাক বাণিজ্যের কারণে সরকারগুলো বছরে প্রায় ৪ হাজার ৫০ কোটি (৪০.৫ বিলিয়ন) মার্কিন ডলার রাজস্ব হারায়। বিশ্বব্যাপী মোট ব্যবহৃত সিগারেটের প্রায় ১১.৬ শতাংশই অবৈধ বাজারের অন্তর্ভুক্ত। বাংলাদেশেও অবৈধ সিগারেটের বিক্রি আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ইনসাইট ম্যাট্রিক্স’-এর দাবি অনুযায়ী, দেশের মোট সিগারেট বাজারের ১৩.১ শতাংশই এখন অবৈধ পণ্যের দখলে। এদিকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘বিউরো অব ইকোনমিক রিসার্চ’ এবং ‘বাংলাদেশ নেটওয়ার্ক ফর টোব্যাকো ট্যাক্স পলিসি’ (বিএনটিটিপি)-র যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, কেবল নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে সিগারেট বিক্রির কারণেই বছরে ৫ হাজার ১৮২ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি হচ্ছে।
স্তর ভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, অতিউচ্চ স্তরে ৫১০.৩১ কোটি, উচ্চ স্তরে ১২৪.৪০ কোটি, মধ্যম স্তরে ১,৯২৫.৫৮ কোটি এবং নিম্ন স্তরে ২,৬২১.২৪ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হচ্ছে।
সরকারের দিক থেকে আমরা একটি দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার আশা করি, যেন তারা তাদের সর্বাত্মক চেষ্টা চালায়। সফল হতে হলে শুরুতেই এই প্রতিশ্রুতি প্রয়োজন। কারণ, অনেক সময় তামাক কোম্পানিগুলো সরকারের নীতি নির্ধারণে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে, যাকে আমরা ‘ইন্ডাস্ট্রি ইনফ্লুয়েন্স’ বলি। তামাক শিল্পের প্রভাবমুক্ত থেকে ডব্লিউএইচও-র এফসিটিসি নীতি মেনে এনবিআর ও অর্থ মন্ত্রণালয়কে কাজ করতে হবে। কোম্পানিগুলোর সঙ্গে কোনো গোপন বৈঠক করা যাবে না
অধ্যাপক ড. রুমানা হক, কনভেনর, বিএনটিটিপি
প্রকাশিত গবেষণায় আরও দেখা যায়, অন্যান্য নিত্যপণ্য সর্বোচ্চ খুচরা মূল্যে (এমআরপি) বেচাকেনা হলেও তামাক পণ্যে এই নিয়ম মানা হচ্ছে না। উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে কিনে খুচরা বিক্রেতারা প্যাকেটে লেখা নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি দামে ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করছেন।

তামাক খাতে রাজস্ব সুরক্ষায় কেন্দ্র থেকে মাঠপর্যায়ে তদারকি জোরদার করেছে এনবিআর। ছবি: সংগৃহীত
সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশীয় নকল সিগারেট ও জাল ব্যান্ডরোলের হিসাব যুক্ত করলে এই রাজস্ব ফাঁকির পরিমাণ বছরে ১০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গড়ে উঠেছে অবৈধ সিগারেট উৎপাদনের শক্ত নেটওয়ার্ক।
বিশেষ করে পাবনা, কুষ্টিয়া, নাটোর, মানিকগঞ্জ, বগুড়া ও রংপুরকে দেশীয় অবৈধ তামাক পণ্যের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব এলাকার কারখানাগুলোতে নকল বা পুনর্ব্যবহৃত ট্যাক্স স্ট্যাম্প ব্যবহার করে ‘ব্ল্যাক’, ‘পদ্মা’, ‘রকেট’, ‘পার্টনার’, ‘টপ টেন’সহ ৬৭টিরও বেশি ব্র্যান্ডের অবৈধ সিগারেট উৎপাদিত হচ্ছে।
বাজার মনিটরিংয়ের মূল চাবিকাঠিই হলো ডিজিটালাইজড পদ্ধতি। কেবল তামাক কোম্পানিগুলোর দেওয়া তথ্যের ওপর নির্ভর না করে এনবিআরের নিজস্ব ডাটা ও মনিটরিং ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে। সেই সঙ্গে কোম্পানিগুলোর নানা ধরনের প্রণোদনা ও প্রভাব বিস্তারের অপচেষ্টাকেও কঠোর নজরদারির আওতায় আনা প্রয়োজন। আন্তরিকতা ও দক্ষ জনবল থাকলে এটি অর্জন করা কোনো অসম্ভব বিষয় নয়।
অধ্যাপক ড. রুমানা হক, কনভেনর, বিএনটিটিপি
দেশীয় নকল সিগারেটের পাশাপাশি সমুদ্র ও আকাশপথে বিদেশি চোরাচালান করা সিগারেটও বাজারে প্রবেশ করছে। কাস্টমস ও বন্দরের নজরদারি থাকা সত্ত্বেও চট্টগ্রাম, কর্ণফুলী চ্যানেল, টেকনাফ ও বিমানবন্দর ব্যবহার করে ‘মণ্ড’, ‘ব্ল্যাক’, ‘ইজি’, ‘প্যাট্রোন’সহ বিভিন্ন বিদেশি সিগারেট দেশে ঢুকিয়ে সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।
এমন পরিস্থিতিতে এনবিআরের মাঠপর্যায়ের তদারকি জোরদার, দক্ষ জনবল বৃদ্ধি ও গবেষণা বিভাগকে সক্রিয় করার দাবি জানিয়েছেন অধ্যাপক ড. রুমানা হক।
ঢাকা পোস্টকে তিনি বলেন, ‘এনবিআরের মাঠপর্যায়ের নজরদারি জোরদারের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির দক্ষ জনবল বৃদ্ধি, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ এবং গবেষণা বিভাগকে আরও কার্যকর করতে হবে। তামাক নিয়ন্ত্রণে সক্রিয় গবেষণাপ্রতিষ্ঠান, এনজিও ও গবেষকদের সঙ্গে সমন্বয় বাড়িয়ে মাঠপর্যায়ের তথ্য সংগ্রহের জোরালো ব্যবস্থা করা যেতে পারে; প্রয়োজনে গ্রহণ করা যেতে পারে সমন্বিত উদ্যোগ। পাশাপাশি নকল ও অবৈধ তামাকপণ্য শনাক্তে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হটলাইন কিংবা ডিজিটাল অভিযোগ কেন্দ্র চালু করা জরুরি।’
তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তামাকপাতা সংগ্রহ থেকে শুরু করে উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের প্রতিটি ধাপের নির্ভরযোগ্য তথ্য এনবিআরের নিজস্ব তদারকি ব্যবস্থায় সংগ্রহ করে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিশ্লেষণ করা। বাজার মনিটরিংয়ের মূল চাবিকাঠিই হলো ডিজিটালাইজড পদ্ধতি।
কেবল তামাক কোম্পানিগুলোর দেওয়া তথ্যের ওপর নির্ভর না করে এনবিআরের নিজস্ব ডাটা ও মনিটরিং ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে। সেই সঙ্গে কোম্পানিগুলোর নানা ধরনের প্রণোদনা ও প্রভাব বিস্তারের অপচেষ্টাকেও কঠোর নজরদারির আওতায় আনা প্রয়োজন। আন্তরিকতা ও দক্ষ জনবল থাকলে এটি অর্জন করা কোনো অসম্ভব বিষয় নয়।’
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au