দুর্গাপূজার পর দিল্লিতে আবারও ‘জ্ঞানেশ হটাও’ আন্দোলনের ডাক
দুর্গাপূজা, দশেরা ও নবরাত্রির উৎসব শেষ হতেই ভারতের রাজধানী দিল্লিতে আবারও মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড়…
নাকে অক্সিজেনের নল। পাশে অক্সিজেন সিলিন্ডার। স্বজনদের কোলে শুয়ে আছেন ৮০ বছরের মুমূর্ষু এক বৃদ্ধা। বাইরে উত্তাল সাগর, তার ওপর মুষলধারে বৃষ্টি। ঢেউয়ের ধাক্কায় কখনো ওপরে উঠছে স্পিডবোট, আবার আছড়ে পড়ছে নিচে। বৃষ্টির পানি থেকে বৃদ্ধাকে বাঁচাতে সাদা পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখার চেষ্টা চলছে। এভাবেই গুরুতর অসুস্থ মাকে নিয়ে সন্দ্বীপ থেকে চট্টগ্রামের পথে সাগর পাড়ি দিতে হয়েছে ছেলে জাহাঙ্গীর কবিরকে।
রোববার সকালে সেই যাত্রার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। সন্দ্বীপভিত্তিক একাধিক ফেসবুক আইডি থেকে ভিডিওটি প্রকাশ করা হয়।
ভিডিওতে দেখা যায়, বৈরী আবহাওয়ার মধ্যে স্পিডবোটে শুয়ে আছেন রওশন আরা বেগম। তাঁকে অক্সিজেন দেওয়া হচ্ছে। বৃষ্টির পানি থেকে রক্ষা করতে পলিথিন দিয়ে শরীর ঢেকে রাখা হলেও বাতাসে সেটি বারবার সরে যাচ্ছিল। ফলে বৃষ্টির মধ্যে ভিজতে হচ্ছিল গুরুতর অসুস্থ ওই বৃদ্ধাকে।
ঘটনাটি সামনে আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই তাঁর শারীরিক অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। একই সঙ্গে জরুরি অবস্থায় সন্দ্বীপ থেকে গুরুতর অসুস্থ রোগীদের নিরাপদে চট্টগ্রামে নেওয়ার ব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে।
রওশন আরা বেগম সন্দ্বীপ পৌরসভার তালতলি বাজারসংলগ্ন ছটাই বাড়ির বাসিন্দা। তাঁর ছেলে জাহাঙ্গীর কবির জানান, তাঁর মা কয়েক বছর ধরে শ্বাসকষ্টে ভুগছেন। শনিবার সন্ধ্যার পর থেকে তাঁর শ্বাসকষ্ট হঠাৎ বেড়ে যায়।
রোববার সকালে তাঁকে স্থানীয় বেসরকারি হাসপাতাল সন্দ্বীপ মেডিক্যাল সেন্টারে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকেরা দ্রুত তাঁকে চট্টগ্রামে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, সকাল ১০টার দিকে হাসপাতাল থেকে রওনা দেন স্বজনেরা। পরে জনপ্রতি ৩০০ টাকা ভাড়ায় একটি স্পিডবোটে চট্টগ্রামের উদ্দেশে যাত্রা করেন তাঁরা। প্রায় চার ঘণ্টা পর বেলা দুইটার দিকে চট্টগ্রাম শহরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে পৌঁছান।
বর্তমানে রওশন আরা ওই হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন। জাহাঙ্গীর জানান, তাঁর মায়ের শারীরিক অবস্থা কিছুটা উন্নতি হয়েছে। তবে চিকিৎসকেরা তাঁকে এখনো আশঙ্কামুক্ত বলছেন না।
জাহাঙ্গীর বলেন, মায়ের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় দ্রুত চট্টগ্রামে নেওয়া ছাড়া তাঁদের সামনে কোনো বিকল্প ছিল না। কিন্তু ওই সময় আবহাওয়া ভালো ছিল না, সাগরও ছিল উত্তাল।
জরুরি রোগী পারাপারের জন্য ঘাটে গিয়ে কোনো বিশেষ সহায়তা পাননি বলেও অভিযোগ করেন তিনি। শেষ পর্যন্ত অন্য যাত্রীদের সঙ্গে একটি স্পিডবোটে করে চট্টগ্রামের পথে রওনা হতে হয়।
জাহাঙ্গীরের ভাষায়, ‘এমন দুর্ভাগ্য আমাদের, জরুরি চিকিৎসায় পারাপারের ব্যবস্থা নেই। উল্টো জীবনের শঙ্কা নিয়েই রোগী নিয়ে সাগরে ঝাঁপ দিতে হয়।’
সন্দ্বীপের মানুষের জন্য জরুরি রোগী পরিবহনের একটি বড় সংকট হলো সি-অ্যাম্বুলেন্সের অচলাবস্থা। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, দ্বীপটিতে দুটি সি-অ্যাম্বুলেন্স থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে কোনোটিই সচল নেই।
এর একটি ২০০৮ সাল থেকে গুপ্তছড়া ঘাটের কাছে কেওড়াবাগানে পড়ে আছে। স্থানীয়দের দাবি, সেটি এক দিনের জন্যও রোগী পরিবহনে ব্যবহার করা হয়নি।
২০১৫ সালে ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের মাধ্যমে আরও একটি সি-অ্যাম্বুলেন্স সন্দ্বীপে দেওয়া হয়। সেটিও নিয়মিত চলাচল করেনি। বর্তমানে সেটি হারামিয়া ২০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল প্রাঙ্গণে পড়ে আছে বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।
ফলে দ্বীপের কোনো রোগীর দ্রুত উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন হলে স্বজনদের অনেক সময় বেসরকারি স্পিডবোট বা অন্য নৌযানের ওপর নির্ভর করতে হয়।
দুটি সি-অ্যাম্বুলেন্স দীর্ঘদিন ধরে অচল থাকার বিষয়টি স্বীকার করেছেন সন্দ্বীপ উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা মানস বিশ্বাস।
তিনি বলেন, ‘ওই দুটি সি-অ্যাম্বুলেন্স অচল হয়ে আছে দীর্ঘদিন ধরে। আমরা নতুন সি-অ্যাম্বুলেন্সের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে আবেদন জানিয়ে এখনো কোনো সাড়া পাইনি।’
রওশন আরাকে নিয়ে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি তাই শুধু একটি অসুস্থ বৃদ্ধার ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রার দৃশ্য নয়, বরং দ্বীপাঞ্চলের জরুরি চিকিৎসা পরিবহনব্যবস্থার সীমাবদ্ধতারও একটি চিত্র সামনে এনেছে।
সন্দ্বীপের মতো বিচ্ছিন্ন দ্বীপে গুরুতর রোগীদের জন্য নিরাপদ ও দ্রুত নৌ-অ্যাম্বুলেন্স ব্যবস্থা না থাকলে জরুরি চিকিৎসা পেতে রোগী ও স্বজনদের এমন ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা কতদিন চালিয়ে যেতে হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au