নাকে অক্সিজেনের নল, মুমূর্ষু মাকে নিয়ে উত্তাল সাগর পাড়ি
নাকে অক্সিজেনের নল। পাশে অক্সিজেন সিলিন্ডার। স্বজনদের কোলে শুয়ে আছেন ৮০ বছরের মুমূর্ষু এক বৃদ্ধা। বাইরে উত্তাল সাগর, তার ওপর মুষলধারে বৃষ্টি। ঢেউয়ের ধাক্কায় কখনো…
ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কিশোরগঞ্জ ও সিলেটে সাম্প্রতিক সময়ে কনসার্ট ও নৌকাবাইচের মতো সাংস্কৃতিক ও লোকজ আয়োজনে বাধার অভিযোগ ঘিরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। কোথাও ধর্মীয় গোষ্ঠীর আপত্তি, কোথাও স্থানীয় প্রশাসনের সিদ্ধান্ত এবং কোথাও নিরাপত্তাজনিত কারণ সামনে আসায় প্রশ্ন উঠেছে, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড নির্বিঘ্ন রাখতে সরকার কতটা কার্যকর ভূমিকা পালন করছে।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর মধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পুলিশ লাইনসে আয়োজিত একটি কনসার্টে হামলা, কিশোরগঞ্জে কয়েকটি ব্যান্ডের কনসার্ট স্থগিত এবং সিলেটের বিয়ানীবাজারে নৌকাবাইচ বন্ধের দাবির ঘটনা আলোচনায় এসেছে।
এরই মধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ‘গান-বাজনা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে’ মন্তব্য করায় জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সংগঠক ও কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ হয়েছে। পরে তিনি নিজের বক্তব্যের কারণে ভুল-বোঝাবুঝি তৈরি হওয়ায় দুঃখ প্রকাশ করেন।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কনসার্টে হামলা
গত ১৮ আগস্ট ব্রাহ্মণবাড়িয়া পুলিশ লাইনসের ভেতরে জেলা পুলিশের আয়োজিত একটি কনসার্টে হামলার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় মাদ্রাসাশিক্ষার্থীদের একটি অংশ জড়িত ছিল বলে অভিযোগ ওঠে। পরে পুলিশ ও মাদ্রাসাশিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে।
তবে কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠন কওমি ঐক্য পরিষদের মুখপাত্র আব্দুল খালেক অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তাঁরা কোনো ‘অপসংস্কৃতির চর্চা’ হতে দিতে চান না। তাঁর দাবি, গভীর রাতে গান-বাজনা বন্ধ করতে বলায় উল্টো মাদ্রাসাশিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করা হয়েছিল।
ঘটনাটির পর ঢাকায় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পরিস্থিতি অন্য এলাকার তুলনায় আলাদা। তাঁর ভাষ্য, স্থানীয় পরিবেশ বিবেচনা করেই সেখানে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
সংসদে বিষয়টি তুললেন হাসনাত
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ওই বক্তব্যের পর বিষয়টি জাতীয় সংসদেও ওঠে। গত বৃহস্পতিবার সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গান-বাজনা ও নৌকাবাইচ বন্ধ হয়ে গেছে।
তিনি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।
এর প্রতিবাদে শুক্রবার রাতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কওমি ছাত্র ঐক্য পরিষদের ব্যানারে বিক্ষোভ মিছিল হয়। মিছিল থেকে হাসনাত আব্দুল্লাহকে ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে ক্ষমা না চাওয়া পর্যন্ত ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এনসিপির কোনো কর্মসূচি হতে না দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়।
পরদিন শনিবার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, তাঁর বক্তব্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষের মধ্যে ভুল-বোঝাবুঝি তৈরি হওয়ায় তিনি দুঃখিত।
তিনি একই সঙ্গে বলেন, বাংলাদেশে মসজিদ, মন্দির, গান, ওয়াজ, মাজার, কনসার্ট, মাহফিল, রথযাত্রা ও সিনেমা উৎসবসহ বিভিন্ন ধরনের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক আয়োজনের সুযোগ থাকা উচিত। তাঁর বক্তব্য, সরকারকে এমন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে কেউ অন্যের অধিকার ক্ষুণ্ন করতে না পারে।
কিশোরগঞ্জে কনসার্ট স্থগিত
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঘটনার কয়েক দিনের মধ্যেই কিশোরগঞ্জেও একটি কনসার্ট স্থগিত করা হয়। গত ১৯ আগস্ট শহরের পুরোনো স্টেডিয়ামে কয়েকটি ব্যান্ডের অংশগ্রহণে কনসার্ট আয়োজনের কথা ছিল।
কিন্তু ‘ইমাম-উলামা পরিষদ, কিশোরগঞ্জ সদর শাখা’ কনসার্ট বন্ধের দাবি জানিয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি দেয়। এরপর স্থানীয় প্রশাসন অনুষ্ঠানটি স্থগিত করে।
এ ঘটনায়ও প্রশ্ন ওঠে, ধর্মীয় কোনো গোষ্ঠীর আপত্তির কারণে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বন্ধ করা হচ্ছে কি না।
বিয়ানীবাজারে নৌকাবাইচ নিয়ে উত্তেজনা
সিলেটের বিয়ানীবাজারে সুনাই নদীতে নৌকাবাইচ আয়োজন নিয়েও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘তৌহিদী জনতা’ পরিচয়ে একটি গোষ্ঠী নৌকাবাইচ বন্ধের দাবি জানায়।
এ নিয়ে আলোচনা ও সমালোচনা তৈরি হলেও শেষ পর্যন্ত শুক্রবার নৌকাবাইচ অনুষ্ঠিত হয়। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আয়োজনের সময় ইঞ্জিনচালিত নৌকায় পুলিশ সদস্যদের টহল দিতে দেখা যায়।
অনুষ্ঠানে স্থানীয় সংসদ সদস্য এমরান আহমদ চৌধুরী বলেন, ভবিষ্যতেও ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিবছর নৌকাবাইচ আয়োজন ও উপভোগ করা হবে।
সরকারের বক্তব্য কী
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বন্ধের ঘটনাগুলোকে সরকারের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডবিরোধী অবস্থান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে জানিয়েছেন তথ্যমন্ত্রী আন্দালিভ রহমান পার্থ।
গত মঙ্গলবার সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, সাংস্কৃতিক আয়োজনের ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করা সরকারের কোনো নীতি বা মানসিকতা নয়।
একই অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, বিভিন্ন কারণে কোনো অনুষ্ঠান বাতিল হতে পারে। সব ক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর আপত্তিকেই অনুষ্ঠান বাতিলের একমাত্র কারণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
তিনি আরও বলেন, ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ের তুলনায় বর্তমান সরকারের সময়ে এ ধরনের ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। তবে দু-একটি ঘটনা যে ঘটছে না, তা-ও নয়।
আগেও বাধার মুখে পড়েছে সাংস্কৃতিক আয়োজন
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে আগের অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের বিভিন্ন ঘটনাও সামনে আসছে।
ওই সময়ে ঢাকার উত্তরায় বসন্ত উৎসব এবং ঢাকা মহানগর নাট্য উৎসব বন্ধ হওয়ার ঘটনা ঘটে। শিল্পকলা একাডেমিতে একটি নাট্যদলের প্রদর্শনী মাঝপথে বন্ধ করে দেওয়ার পর প্রতিবাদ কর্মসূচিতে নাট্যকর্মীদের ওপর হামলার অভিযোগও ওঠে।
চট্টগ্রামে আবৃত্তি সংগঠন প্রমার একটি উৎসব বন্ধ এবং টাঙ্গাইলের মধুপুরে হেফাজতে ইসলাম ও কওমি ওলামা পরিষদের আপত্তির মুখে লালন স্মরণোৎসবের তারিখ পরিবর্তনের ঘটনাও আলোচনায় আসে।
এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে বাউল গানের অনুষ্ঠান বন্ধ, হামলা এবং বাউল শিল্পী আটকের ঘটনাও সমালোচনার জন্ম দেয়।

এই ছবিটি ব্যান্ড তারকা জেমসের ২০২৩ সালের একটি কনসার্টের; সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে একাধিক কনসার্ট আয়োজনে বাধার খবর পাওয়া গেছে। ছবি: সংগৃহীত
নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ সংস্কৃতিকর্মীদের
গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের সেক্রেটারি জেনারেল কামাল বায়েজীদের মতে, সাংস্কৃতিক আয়োজনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন গোষ্ঠীর আপত্তি নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে হামলা, হুমকি ও অনুষ্ঠান বন্ধের ঘটনায় সংস্কৃতিকর্মীদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে।
তিনি মনে করেন, এ ধরনের ঘটনায় সরকারের নীরবতা পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলছে। তাঁর বক্তব্য, কনসার্ট, নৌকাবাইচ কিংবা বাউল গানের মতো আয়োজন নির্বিঘ্নে করার পরিবেশ নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক জোবাইদা নাসরীনও সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোকে ধর্মীয় আধিপত্যবাদী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত করে দেখছেন।
তাঁর মতে, আগে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে রাজনৈতিক কারণে বাধা আসলেও এখন বিভিন্ন ধর্মীয় পরিচয় ও ব্যানারে আপত্তি, হুমকি ও চাপ তৈরির প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এতে সরকার অনুষ্ঠান বন্ধ না করলেও আয়োজকদের মধ্যে এক ধরনের ভয়ের পরিবেশ তৈরি হচ্ছে।
সামনে যে প্রশ্ন
সরকার বলছে, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ করা তাদের নীতি নয় এবং সব অনুষ্ঠান বাতিলের পেছনে ধর্মীয় গোষ্ঠীর আপত্তিই একমাত্র কারণ নয়। অন্যদিকে সংস্কৃতিকর্মীদের অভিযোগ, হামলা ও হুমকির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা না নেওয়ায় নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে।
ফলে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো ঘিরে মূল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার মধ্যে ভারসাম্য রেখে সরকার কীভাবে সবার অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। একই সঙ্গে কোনো গোষ্ঠীর আপত্তি যেন অন্যের সাংস্কৃতিক অধিকার খর্ব করার কারণ না হয়, সেটিও নিশ্চিত করার দাবি উঠছে।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au