নাকে অক্সিজেনের নল, মুমূর্ষু মাকে নিয়ে উত্তাল সাগর পাড়ি
নাকে অক্সিজেনের নল। পাশে অক্সিজেন সিলিন্ডার। স্বজনদের কোলে শুয়ে আছেন ৮০ বছরের মুমূর্ষু এক বৃদ্ধা। বাইরে উত্তাল সাগর, তার ওপর মুষলধারে বৃষ্টি। ঢেউয়ের ধাক্কায় কখনো…
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ২৫ বছরের বড় ধরনের তেল চুক্তি করার পরও ভেনেজুয়েলার প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর দেশের মালিকানা ও সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ণ থাকবে বলে জানিয়েছেন অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ। চুক্তির আওতায় দেশটির ৬৫ বিলিয়ন ব্যারেলের বেশি প্রমাণিত তেল মজুদের ওপর যুক্তরাষ্ট্র সংখ্যাগরিষ্ঠ নিয়ন্ত্রণ পাবে বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
রোববার (৩০ আগস্ট) ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক বক্তব্যে ডেলসি রদ্রিগেজ বলেন, ‘একটি বিষয় অবশ্যই স্পষ্ট করতে হবে, প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর ভেনেজুয়েলার মালিকানা ও সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ণ আছে।’
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা চুক্তিটি ২৫ বছর কার্যকর থাকবে বলে জানান তিনি। চুক্তির আওতায় ভেনেজুয়েলার ১৭টি কৌশলগত তেলক্ষেত্র উন্নয়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে দেশটির দৈনিক অপরিশোধিত তেল উৎপাদন ১৫ লাখ ব্যারেলের বেশি করার পরিকল্পনা রয়েছে।
ডেলসি বলেন, চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার তেল খাতে মূলধন, প্রযুক্তি ও পরিচালন সক্ষমতা নিয়ে আসবে। দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা, বিনিয়োগের ঘাটতি ও অবকাঠামোগত সংকটে দেশটির তেল শিল্প যে উৎপাদন সক্ষমতা হারিয়েছে, তা পুনরুদ্ধার করাই এই চুক্তির অন্যতম লক্ষ্য।
এর আগে শুক্রবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলার মধ্যে একটি ঐতিহাসিক তেল চুক্তি হয়েছে। ট্রাম্পের দাবি, এই চুক্তির মাধ্যমে ভেনেজুয়েলার ৬৫ বিলিয়ন ব্যারেলের বেশি প্রমাণিত তেল মজুদের ওপর যুক্তরাষ্ট্র সংখ্যাগরিষ্ঠ নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করেছে। তিনি এটিকে ‘বিশ্বের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় তেল চুক্তি’ হিসেবে বর্ণনা করেন।
চুক্তির আওতায় ১৭টি অনুন্নত বা নতুন তেলক্ষেত্র নিয়ে কাজ করার কথা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে একটি নতুন কোম্পানি এসব ক্ষেত্রের উন্নয়নে যুক্ত হবে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের কার্যকর উৎপাদন অংশীদারিত্ব ৫৫ শতাংশ হতে পারে। তবে চুক্তির বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ শর্ত এখনো পুরোপুরি প্রকাশ করা হয়নি।
ট্রাম্পের দাবি, এই চুক্তিতে মার্কিন করদাতাদের অর্থ ব্যয় হবে না। বরং বেসরকারি বিনিয়োগের মাধ্যমে ভেনেজুয়েলার তেল শিল্প পুনর্গঠন করা হবে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর মতে, চুক্তির ফলে ভেনেজুয়েলায় প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলার বেসরকারি বিনিয়োগ আসতে পারে।
চুক্তির আর্থিক দিক তুলে ধরে ডেলসি রদ্রিগেজ বলেন, প্রতি ব্যারেল তেল ৬৫ ডলার দরে বিক্রি হলে চুক্তির মাধ্যমে ভেনেজুয়েলা প্রায় ২০৯.৩ বিলিয়ন ডলার রাজস্ব পেতে পারে। উৎপাদিত ও বিক্রি হওয়া প্রতি ব্যারেলে প্রায় ১৯ ডলার সরাসরি ভেনেজুয়েলার সরকারের কাছে যাবে বলেও জানান তিনি।
ভেনেজুয়েলার সরকার মনে করছে, চুক্তিটি দেশটির দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে উঠতে সহায়তা করবে। একই সঙ্গে তেল উৎপাদন বাড়লে সরকারি রাজস্ব বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ধসে পড়া জ্বালানি অবকাঠামো পুনর্গঠনের সুযোগ তৈরি হবে।
ডেলসি রদ্রিগেজ বলেন, ভবিষ্যতে Chevron, Repsol, Eni, Shell ও BP-এর মতো বড় কোম্পানির সঙ্গে আরও চুক্তি করা হতে পারে। তাঁর লক্ষ্য ভেনেজুয়েলাকে আবার একটি বড় জ্বালানি শক্তিতে পরিণত করা।
তবে চুক্তিটি ঘোষণার পর ভেনেজুয়েলার ভেতরে সমালোচনাও শুরু হয়েছে। দেশটির বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষের সমালোচকরা প্রশ্ন তুলেছেন, একটি অন্তর্বর্তী সরকার এত দীর্ঘমেয়াদি ও কৌশলগত চুক্তি করার কতটা বৈধ ক্ষমতা রাখে।
সমালোচকদের একটি অংশ মনে করছে, চুক্তির মাধ্যমে দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর বিদেশি প্রভাব অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাবে। কেউ কেউ এটিকে ভেনেজুয়েলার তেল সম্পদের ওপর মার্কিন হস্তক্ষেপ হিসেবেও দেখছেন। চুক্তির পূর্ণ আইনি কাঠামো, বেসরকারি অংশীদার কারা এবং বিনিয়োগের অর্থ কীভাবে আসবে, এসব বিষয়ও এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়।
অন্যদিকে রদ্রিগেজ সরকারের দাবি, চুক্তিতে তেলের মালিকানা ভেনেজুয়েলার কাছেই থাকবে। যুক্তরাষ্ট্র ও বেসরকারি কোম্পানিগুলো মূলত বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও উৎপাদন ব্যবস্থাপনায় ভূমিকা রাখবে।
ভেনেজুয়েলার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের এই তেল চুক্তির রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও গুরুত্বপূর্ণ। চলতি বছরের জানুয়ারিতে মার্কিন সামরিক অভিযানে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর ডেলসি রদ্রিগেজ অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেন।
মাদুরো সরকারের সময় থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কারণে ভেনেজুয়েলার তেল শিল্প ব্যাপক সংকটে পড়ে। দেশটিতে বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রমাণিত তেল মজুদ থাকলেও বিনিয়োগের ঘাটতি, অবকাঠামোর দুরবস্থা, ব্যবস্থাপনার সমস্যা ও নিষেধাজ্ঞার কারণে উৎপাদন দীর্ঘদিন ধরে সম্ভাবনার তুলনায় অনেক কম।
ট্রাম্প প্রশাসনের জন্যও চুক্তিটি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণ এবং ভবিষ্যৎ তেল সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি দেশটির কৌশলগত তেল মজুদ শক্তিশালী করাও এর অন্যতম উদ্দেশ্য বলে মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
ট্রাম্প দাবি করেছেন, ভেনেজুয়েলার বিপুল তেল মজুদ যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়াবে এবং দীর্ঘমেয়াদে দেশটিতে জ্বালানির দাম কমাতে সহায়তা করতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, ভেনেজুয়েলার তেল অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় উৎপাদন দ্রুত বাড়ানো সম্ভব হবে না। এর সুফল পেতে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে।
ফলে যুক্তরাষ্ট্র-ভেনেজুয়েলার নতুন এই তেল চুক্তি একদিকে দেশটির অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের বড় সুযোগ তৈরি করেছে, অন্যদিকে প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর বিদেশি নিয়ন্ত্রণ ও চুক্তিটির রাজনৈতিক বৈধতা নিয়ে বিতর্কও তৈরি করেছে। তবে ডেলসি রদ্রিগেজ স্পষ্ট করে বলেছেন, মার্কিন বিনিয়োগ ও নিয়ন্ত্রণ বাড়লেও ভেনেজুয়েলার তেল সম্পদের মালিকানা ও দেশের সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ণ থাকবে।
সূত্র- এমটিআই
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au