অসুস্থ মাকে দেখতে প্যারোলও মিলল না চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের
চট্টগ্রামে কারাগারে বন্দি সন্ন্যাসী চিন্ময় কৃষ্ণ দাসকে অসুস্থ মাকে দেখতে প্যারোলে মুক্তি দেওয়ার আবেদনও নাকচ করা হয়েছে। ৭১ বছর বয়সী তাঁর মা সন্ধ্যারানি ধর দীর্ঘদিন…
সনাতনী জাগরণ জোটের মুখপাত্র চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারীর মুক্তি এবং তাঁর প্রতি মানবিক ও আইনগত সহযোগিতার দাবিতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে স্মারকলিপি দিয়েছে বাংলাদেশ সনাতন পার্টি (বিএসপি)। একই সঙ্গে রংপুরে একই পরিবারের চারজন হত্যাকাণ্ডের বিচার, নারায়ণগঞ্জের একটি কটন মিলের মন্দির পুনরুদ্ধার এবং সংখ্যালঘুদের জানমাল ও অধিকার রক্ষায় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা জোরদারসহ আরও কয়েকটি দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
বুধবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বিএসপির সভাপতি অনুপ কুমার দত্ত ও সাধারণ সম্পাদক সুমন কুমার রায়ের স্বাক্ষর করা স্মারকলিপিটি জমা দেন তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল। প্রতিনিধিদলে ছিলেন বিএসপির স্থায়ী কমিটির সদস্য প্রনবানন্দ মহারাজ ও টনি মল্লিক এবং জাগো হিন্দু পরিষদের সভাপতি সঞ্জয় বণিক। বিএসপির সাধারণ সম্পাদক সুমন কুমার রায় স্মারকলিপি দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে দেওয়া স্মারকলিপিতে চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের মুক্তির বিষয়ে সরকারের সদয় দৃষ্টি ও সার্বিক সহযোগিতা কামনা করা হয়েছে। এতে বলা হয়, দেশের সনাতন ধর্মাবলম্বী জনগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ও প্রত্যাশার বিষয়টি বিবেচনা করে চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের মুক্তির বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
স্মারকলিপিতে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিভিন্ন দাবি, নিরাপত্তা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার বিষয়ে চিন্ময় কৃষ্ণ দাস প্রকাশ্যে প্রতিবাদ ও আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। বিশেষ করে সনাতন সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা, অধিকার ও ন্যায়বিচারের দাবিতে ঘোষিত আট দফা দাবির পক্ষে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন বলে দাবি করেছে বিএসপি।
সংগঠনটির ভাষ্য, পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে একটি মামলায় চিন্ময় কৃষ্ণ দাসকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর আরও কয়েকটি মামলায় তাঁকে আসামি করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে তাঁর হাজতবাসের বিষয়টি আইন, ন্যায়বিচার, মৌলিক অধিকার ও মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন রয়েছে বলে স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
চট্টগ্রামে আইনজীবী সাইফুল ইসলাম হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গও স্মারকলিপিতে তুলে ধরেছে বিএসপি। এতে বলা হয়েছে, আইনজীবী সাইফুল ইসলাম যখন হত্যাকাণ্ডের শিকার হন, তখন চিন্ময় কৃষ্ণ দাস আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে ছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ ও মামলাগুলোর প্রেক্ষাপট যথাযথভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন বলেও দাবি করা হয়েছে।
স্মারকলিপিতে আরও বলা হয়, সংশ্লিষ্ট সব তথ্য-প্রমাণ ও আইনগত বিষয় নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা করা হলে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন করা সম্ভব হবে। এ কারণে চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগ ও মামলাগুলোর বিষয়েও নিরপেক্ষ আইনি পর্যালোচনার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের পারিবারিক পরিস্থিতির বিষয়টিও স্মারকলিপিতে বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়, তাঁর জন্মের আগেই তাঁর বাবা মারা যান। বর্তমানে তাঁর মা গুরুতর অসুস্থ এবং হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তাঁর শারীরিক অবস্থা সংকটাপন্ন বলেও স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ অবস্থায় অসুস্থ মায়ের সঙ্গে চিন্ময় কৃষ্ণ দাসকে দেখা করার সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে বিএসপি। সংগঠনটির দাবি, দীর্ঘদিনের হাজতবাসের কারণে মায়ের সংকটাপন্ন অবস্থায় তাঁর পাশে থাকার সুযোগ থেকে চিন্ময় কৃষ্ণ দাস বঞ্চিত হচ্ছেন। এমন পরিস্থিতিতে মানবিক বিবেচনায় তাঁকে প্রয়োজনীয় সুযোগ দেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।
চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের মুক্তির পাশাপাশি স্মারকলিপিতে আরও আটটি দাবি জানানো হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে রংপুরে একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় অবিলম্বে বিচারিক তদন্ত শুরু করা এবং তদন্তের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত ঘটনা ও নেপথ্যের কারণ উদ্ঘাটন করা।
হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দায়ী ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের শনাক্ত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবিও জানিয়েছে বিএসপি। একই সঙ্গে নিহতদের পরিবারকে প্রয়োজনীয় রাষ্ট্রীয় সহায়তা ও নিরাপত্তা দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
স্মারকলিপির আরেকটি দাবিতে নারায়ণগঞ্জের একটি কটন মিলের মন্দির উদ্ধারের কথা বলা হয়েছে। মন্দিরটি পুনরুদ্ধার করে সেখানে পূজা-অর্চনার ব্যবস্থা করা এবং পুরোহিতসহ সর্বসাধারণের জন্য তা উন্মুক্ত করতে দ্রুত কার্যকর সরকারি উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
এ ছাড়া ওই মিলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শ্রমিক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও অন্যান্য অংশীজনের স্বার্থ রক্ষার বিষয়টিও স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
ভবিষ্যতে এ ধরনের হত্যাকাণ্ড, সহিংসতা ও সম্পদ-সংক্রান্ত অনিয়ম প্রতিরোধে কার্যকর প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে বিএসপি। একই সঙ্গে দেশের সব নাগরিকের জানমাল, সম্পদ ও মৌলিক অধিকার রক্ষায় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক ভূমিকা পালনের আহ্বান জানানো হয়েছে।
স্মারকলিপিতে বিএসপি বলেছে, চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের বিষয়টি শুধু একটি ব্যক্তির আইনি পরিস্থিতি হিসেবে নয়, বরং দেশের সনাতন ধর্মাবলম্বী জনগোষ্ঠীর উদ্বেগ, নিরাপত্তা ও অধিকারসংক্রান্ত বৃহত্তর প্রেক্ষাপটেও বিবেচনা করা প্রয়োজন। এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে মানবিক ও আইনগত দৃষ্টিকোণ থেকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ প্রত্যাশা করেছে সংগঠনটি।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au