চিন্ময়কৃষ্ণের পাশে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের সমালোচনায় নওশাদ সিদ্দিকি। ছবিঃ সংগৃহীত
অসুস্থ মায়ের সঙ্গে শেষ দেখাটাও করতে পারেননি বাংলাদেশে কারাবন্দি হিন্দু সন্ন্যাসী চিন্ময়কৃষ্ণ দাস। প্যারোলে মুক্তির আবেদন নাকচ হওয়ার পরই মারা যান তাঁর মা সন্ধ্যারানি দাস। পরে মায়ের শেষকৃত্যে অংশ নিতে পাঁচ ঘণ্টার জন্য প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হয় চিন্ময়কৃষ্ণকে। মায়ের নিথর দেহ জড়িয়ে তাঁর কান্নার ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের ভূমিকার সমালোচনা করেছেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের ভাঙড়ের বিধায়ক ও ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্টের নেতা নওশাদ সিদ্দিকি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে নওশাদ সিদ্দিকি বলেন, ‘দক্ষিণ এশিয়ায় সংখ্যালঘু হয়ে জন্মানোটা বোধহয় সবচেয়ে বড় অপরাধ।’ তাঁর দাবি, চিন্ময়কৃষ্ণ দাসের মায়ের সঙ্গে তাঁর শেষ দেখা করতে না পারার ঘটনা দক্ষিণ এশিয়ার বর্তমান মানবাধিকার পরিস্থিতির একটি নির্মম প্রতীক হয়ে উঠেছে।
চিন্ময়কৃষ্ণ দাসের বিরুদ্ধে অভিযোগ ও তাঁর বিরুদ্ধে চলমান আইনি প্রক্রিয়ার বিষয়টি উল্লেখ করেও নওশাদ বলেন, একজন অভিযুক্ত ব্যক্তিকেও মানবিক মর্যাদা দেওয়া উচিত। তাঁর ভাষায়, ‘একজন অভিযুক্ত ব্যক্তি প্রথমে একজন মানুষ। আর মানবাধিকার সেই মানুষের মৌলিক অধিকার।’
বাংলাদেশে সংখ্যালঘু, বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা ও অধিকার নিয়েও নিজের অবস্থান তুলে ধরেন নওশাদ। তাঁর দাবি, বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের একাধিক অভিযোগ ক্রমাগত সামনে আসছে। এসব ঘটনার প্রতিবাদ ভারতসহ বিভিন্ন দেশ ও সংগঠনের পক্ষ থেকে হওয়া স্বাভাবিক বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
নওশাদ বলেন, ‘বাংলাদেশের হিন্দুদের নিরাপত্তা, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক অধিকার রক্ষার দাবি সম্পূর্ণ ন্যায়সংগত।’
তবে একই বক্তব্যে ভারতের মানবাধিকার পরিস্থিতির প্রসঙ্গও টেনে আনেন পশ্চিমবঙ্গের এই বিধায়ক। তাঁর মতে, মানবাধিকারের প্রশ্নে বাংলাদেশ ও ভারতের ক্ষেত্রে একই নৈতিক মানদণ্ড প্রয়োগ করা উচিত। তা না হলে মানবাধিকারের বিষয়টি ভূরাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ উঠতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এ প্রসঙ্গে তিনি ভারতের কারাবন্দি দুই রাজনৈতিক কর্মী শারজিল ইমাম ও উমর খালিদের বিষয়ও তুলে ধরেন। ২০২০ সালে দিল্লির সাম্প্রদায়িক সহিংসতার সঙ্গে সম্পর্কিত ষড়যন্ত্রের মামলায় তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের জামিনের আবেদনও আদালতে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে বলে উল্লেখ করেন নওশাদ।
একই সঙ্গে তিনি বেআইনি কার্যকলাপ প্রতিরোধ আইনে গ্রেপ্তার হওয়া খ্রিস্টান ধর্মযাজক ফাদার স্ট্যান স্বামীর প্রসঙ্গও তুলে ধরেন। এসব উদাহরণ দিয়ে নওশাদ বোঝাতে চেয়েছেন, মানবাধিকারের প্রশ্নে রাষ্ট্রভেদে ভিন্ন মানদণ্ড গ্রহণ করা উচিত নয়।
নওশাদের বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেছেন পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির মুখপাত্র দেবজিৎ সরকার। তিনি বাংলাদেশের সংখ্যালঘু হিন্দুদের বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে ভারতের সংখ্যালঘুদের অবস্থার তুলনা করার বিরোধিতা করেন।
দেবজিৎ সরকার বাংলাদেশের জনসংখ্যায় হিন্দুদের অনুপাতের ঐতিহাসিক পরিবর্তনের প্রসঙ্গ তুলে ধরে দাবি করেন, ১৯৪৭ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে হিন্দু জনগোষ্ঠীর হার ছিল প্রায় ৩২ শতাংশ। পরে তা কমে ২৮ শতাংশ হয় এবং ১৯৭১ সালে প্রায় ১৮ শতাংশে নেমে আসে। তাঁর দাবি, বর্তমানে বাংলাদেশে হিন্দু জনগোষ্ঠীর হার ৬ শতাংশেরও নিচে।
বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কেউ রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী হতে পারেননি বলেও দাবি করেন দেবজিৎ। বিপরীতে ভারতের রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যরা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ও রাষ্ট্রীয় পদে দায়িত্ব পালন করেছেন বলে উল্লেখ করেন তিনি।
দুই দেশের সংখ্যালঘুদের পরিস্থিতি তুলনা করার ক্ষেত্রে নওশাদের বক্তব্যের সমালোচনা করে দেবজিৎ বলেন, ‘সংখ্যালঘু বিষয়টাকে গুলিয়ে দিলে হবে না। উনি বলছেন উনার মতো করে, কারণ নির্দিষ্ট একটা সিস্টেম আছে।’
চিন্ময়কৃষ্ণ দাসের বিষয়টি ঘিরে বাংলাদেশ ও ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। একদিকে তাঁর বিরুদ্ধে থাকা মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া এবং অন্যদিকে তাঁর মায়ের সঙ্গে শেষ দেখা করতে না পারা ও পরবর্তী সময়ে প্যারোলে মুক্তির ঘটনাকে কেন্দ্র করে মানবিক ও অধিকারসংক্রান্ত প্রশ্ন তুলছেন নওশাদসহ ভারতের কয়েকজন রাজনৈতিক ব্যক্তি। অন্যদিকে বিজেপির পক্ষ থেকে বাংলাদেশের সংখ্যালঘু পরিস্থিতি এবং ভারতের পরিস্থিতিকে এক পাল্লায় না মাপার দাবি করা হচ্ছে।
ফলে চিন্ময়কৃষ্ণ দাসকে ঘিরে বিষয়টি শুধু একটি বিচারাধীন মামলার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক, সংখ্যালঘু অধিকার এবং মানবাধিকার নিয়ে দুই দেশের রাজনৈতিক বিতর্কেরও অংশ হয়ে উঠেছে।
সূত্রঃ এই সময়