ইউনূস সরকারের নীতি নিয়ে প্রশ্ন তুলছে আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, বিচারব্যবস্থা, ব্যবসা-বাণিজ্য, ব্যাংকিং খাত ও বিদেশি বিনিয়োগ নিয়ে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে বলে দাবি করেছে সংবাদমাধ্যম ইউরিপোর্টার। ১৪ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত লুই অগের লেখা এক মতামতধর্মী প্রতিবেদনে ড. ইউনূসের দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা ‘সংস্কারক’ ভাবমূর্তি নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা আন্দোলনের পর রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে ড. মুহাম্মদ ইউনূস জবাবদিহি, ন্যায়বিচার ও সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তবে লেখকের দাবি, দায়িত্ব নেওয়ার পর তাঁর সরকারের কর্মকাণ্ডে রাজনৈতিক বিরোধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং বিচারপ্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক বিরোধ মেটানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ সামনে আসে।
লেখক উল্লেখ করেন, ক্ষমতায় থাকাকালে শেখ হাসিনা সরকারের সঙ্গে ড. ইউনূসের দীর্ঘদিনের বিরোধ ছিল। তাঁর মতে, এই অভিজ্ঞতা থেকে ইউনূস চাইলে বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থাকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকে দূরে রাখার একটি নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি করতে পারতেন। কিন্তু প্রতিবেদনের ভাষ্য অনুযায়ী, এর পরিবর্তে সাবেক সরকারের বিরুদ্ধে জনমনে থাকা ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবেশ তৈরি করা হয়।
মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়েও প্রতিবেদনে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। লেখকের দাবি, ড. ইউনূসের সরকারের সময়ে রাজনৈতিক বিরোধীদের দীর্ঘ সময় আটক রাখার ঘটনা নিয়ে বিভিন্ন মহল প্রশ্ন তুলেছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ রাজনৈতিক বিরোধীদের অনির্দিষ্টকাল ধরে বিচারপূর্ব আটক রাখার বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সাবেক সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মামলার বিষয়টিও প্রতিবেদনে গুরুত্ব পেয়েছে। লেখকের দাবি, তাদের বিরুদ্ধে ব্যাপক আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং কিছু ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ডের মতো কঠোর শাস্তির বিষয়ও সামনে এসেছে। এসব ঘটনায় যথাযথ বিচারপ্রক্রিয়া ও আইনের শাসন নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে বলে মত দিয়েছেন তিনি।
সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও স্বাধীনতার বিষয়টিও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। লেখকের দাবি, রাজনৈতিক বিরোধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও সরকার যথেষ্ট কার্যকর ভূমিকা পালন করেনি।
বাংলাদেশের ব্যবসা ও অর্থনীতি নিয়েও প্রতিবেদনে সমালোচনা করা হয়েছে। লেখকের দাবি, ড. ইউনূসের সরকার দেশের বেশ কয়েকটি বড় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে আইনি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেয়। প্রায় ১১টি বড় ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে শত শত ফৌজদারি ও বাণিজ্যিক মামলা করা হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
লেখকের মতে, এসব পদক্ষেপের কারণে ব্যবসায়ীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয় এবং সম্ভাব্য বিদেশি বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ বাংলাদেশে বিনিয়োগের বিষয়ে সতর্ক হয়ে পড়ে। এর ফলে দেশের অর্থনীতিতে বিনিয়োগ সংকট আরও গভীর হয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
আদালতকেন্দ্রিক আইনি প্রক্রিয়ার বিষয়টিও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। লেখকের দাবি, আদালতে ব্যক্তিগতভাবে উপস্থিত হওয়ার বাধ্যবাধকতা এবং অনুপস্থিতিতে কঠোর রায়ের আশঙ্কার কারণে অভিযুক্ত ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে নিজেদের অবস্থান কার্যকরভাবে তুলে ধরা কঠিন হয়ে পড়ে। বিপুলসংখ্যক মামলা একসঙ্গে পরিচালনার কারণে এসব প্রতিষ্ঠান আরও চাপে পড়ে বলে প্রতিবেদনে মত দেওয়া হয়েছে।
ড. ইউনূসের সরকারের সঙ্গে আন্দোলনে যুক্ত কয়েকজন শিক্ষার্থী নেতার সম্পৃক্ততার বিষয়টিও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। লেখকের দাবি, আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া ব্যক্তিদের সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে যুক্ত করার ফলে সরকারের রাজনৈতিক অবস্থান আরও শক্তিশালী হয় এবং সাবেক সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে তারা ভূমিকা রাখে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও লেখক সমালোচনা করেছেন। তাঁর দাবি, আন্দোলনের সময় শেখ হাসিনার বাসভবন ও সরকারি বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনায় যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এর ফলে এক ধরনের দায়মুক্তির পরিবেশ তৈরি হয়েছিল বলে তিনি মনে করেন।
পরবর্তী সময়ে সাবেক মন্ত্রী ও সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আদালতে হাজির হলে তাদের ঘিরে উত্তেজনা ও হামলার ঘটনাও ঘটেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সাবেক মন্ত্রী দীপু মনি ও আরিফ খান জয়কে রিমান্ড শুনানির সময় হামলা এবং সাবেক বিচারপতি মানিকের ওপর হামলার পর অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হওয়ার ঘটনাও এতে তুলে ধরা হয়েছে।
এ ছাড়া সাবেক সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পক্ষে আইনজীবীরা মামলা পরিচালনা করতে গিয়ে বাধার মুখে পড়েছেন বলেও লেখক দাবি করেছেন। তাঁর মতে, জনতার হাতে বিচার বা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক আইনি পদক্ষেপ ন্যায়বিচার ও আইনের শাসনের পরিবেশকে দুর্বল করেছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, এসব পরিস্থিতির প্রভাব দেশের ব্যবসা ও বিনিয়োগ পরিবেশের ওপরও পড়েছে। রাজনৈতিক ও আইনি অনিশ্চয়তার কারণে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বাংলাদেশে বিনিয়োগের বিষয়ে সতর্কতা তৈরি হয়েছে বলে লেখক দাবি করেছেন।
লেখকের মতে, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সরকারের অন্যতম বড় প্রতিশ্রুতি ছিল জবাবদিহি ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা। কিন্তু সরকারের কর্মকাণ্ড সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য প্রতিশোধমূলক রাজনীতির পরিবর্তে রাজনৈতিক সমঝোতা ও পুনর্মিলনের পথে এগোনো প্রয়োজন বলে প্রতিবেদনে মত দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনের শেষাংশে বলা হয়েছে, বাংলাদেশকে অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে নিতে হলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, আইনের শাসন, বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা জরুরি। নতুন সরকারকে অতীতের বিরোধ ও সংঘাতের বাইরে গিয়ে দেশের জন্য একটি অধিক স্থিতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ তৈরির দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন বলে মত দিয়েছেন লেখক।
তবে ইউরিপোর্টারে প্রকাশিত লেখাটি একটি মতামতধর্মী প্রতিবেদন। এতে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সরকার ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ ও মূল্যায়ন করা হয়েছে, সেগুলো লেখকের বক্তব্য হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে। অভিযোগগুলোর সবগুলোর স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা হয়নি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যও প্রতিবেদনে বিস্তারিতভাবে পাওয়া যায়নি।