হাতকড়াসহ পালালেন আওয়ামী লীগ নেতা, থানায় ধরে নেওয়া হলো ৭ স্বজনকে
কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরে গ্রেপ্তারের পর পুলিশের হাত থেকে হাতকড়াসহ পালিয়ে গেছেন আওয়ামী লীগের এক নেতা। পরে তাঁকে পালিয়ে যেতে সহায়তার অভিযোগে বা ঘটনার বিষয়ে তথ্য জানার…
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) সংগ্রহশালা সংস্কারের নামে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র, ঘটনা ও স্মারক সরিয়ে দিয়ে দলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে নতুন ইতিহাস তৈরির চেষ্টা করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক তানজীমউদ্দিন খান। তাঁর দাবি, এ ধরনের উদ্যোগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক চেতনা ও মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। একই সঙ্গে ডাকসু সংগ্রহশালায় কোন নীতিমালার ভিত্তিতে এসব পরিবর্তন আনা হয়েছে এবং সরিয়ে নেওয়া স্মারকগুলো কোথায় রাখা হয়েছে, তার ব্যাখ্যাও দাবি করেছেন তিনি।
সোমবার রাতে প্রথম আলোর নিয়মিত অনুষ্ঠান ‘বার্তাকক্ষ’-এ অংশ নিয়ে এসব কথা বলেন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্কের সক্রিয় সদস্য অধ্যাপক তানজীমউদ্দিন খান।
সম্প্রতি সংস্কারের পর রোববার ডাকসু সংগ্রহশালা নতুন করে চালু করা হয়। এরপর সেখানে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাস উপস্থাপনের ধরন নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। অভিযোগ উঠেছে, সংগ্রহশালায় স্বাধীনতাসংগ্রামে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভূমিকার কোনো ছবি রাখা হয়নি। এর পরিবর্তে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ এবং তৎকালীন ছাত্রসংঘের নেতা আবদুল মালেকের ছবি প্রদর্শন করা হয়েছে।
এ ছাড়া ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত বাঙালির রাজনৈতিক ও স্বাধিকার আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ স্মারক ও তথ্য, ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বরের বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড এবং রাজাকারদের তালিকার মতো বিষয়ও আগের সংগ্রহশালার তুলনায় বাদ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এ নিয়ে অধ্যাপক তানজীমউদ্দিন খান প্রশ্ন তোলেন, কোন নীতিমালার ভিত্তিতে স্বাধীনতা আন্দোলনের এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সংগ্রহশালা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাঁর মতে, ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র ও ঘটনাকে বাদ দিয়ে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে নতুন করে ইতিহাস উপস্থাপনের চেষ্টা করা হলে তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক।
তিনি বলেন, স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাস কোনো নির্দিষ্ট দল বা গোষ্ঠীর একক সম্পত্তি নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠানের সংগ্রহশালায় দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার আন্দোলন এবং মুক্তিযুদ্ধের ধারাবাহিক ইতিহাস যথাযথভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন।
ডাকসু সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবি প্রদর্শনের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর শিক্ষার্থীদের মধ্যেও প্রতিবাদ দেখা দেয়। সোমবার দুপুরে ডাকসু সংগ্রহশালায় গিয়ে জিন্নাহর তিনটি ছবি ছিঁড়ে প্রতিবাদ জানান আবু তৈয়ব হাবিলদার নামের এক শিক্ষার্থী। পরে বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের নেতা-কর্মীরা জিন্নাহর ছবির জায়গায় ১৯৮১ সালে বায়তুল মোকাররমে গোলাম আযমকে জুতাপেটা করার একটি ছবি লাগান।
সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবি রাখার প্রতিবাদ জানিয়েছে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নসহ বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন। এ ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ক্ষোভ প্রকাশ করেন অনেক শিক্ষার্থী।
পরিস্থিতির মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দেয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ডাকসু সংগ্রহশালায় পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ এবং তৎকালীন ছাত্রসংঘের নেতা আবদুল মালেকের ছবি প্রদর্শনের বিষয়টি ভাষা আন্দোলন ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগ্রহশালায় এ ধরনের ছবি প্রদর্শন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত বিধিবিধান অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানানো হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের এই বিজ্ঞপ্তির প্রসঙ্গ টেনে অধ্যাপক তানজীমউদ্দিন খান বলেন, বিজ্ঞপ্তি থেকে বোঝা যাচ্ছে, এসব কর্মকাণ্ডে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অনুমোদন ছিল না। তাঁর মতে, ডাকসু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরই একটি অংশ এবং শিক্ষার্থীদের পক্ষে প্রশাসনকে সহযোগিতা করাই এর অন্যতম দায়িত্ব। প্রশাসনকে চ্যালেঞ্জ করে বা প্রশাসনের বিকল্প হিসেবে কাজ করা ডাকসুর দায়িত্ব নয়।
তিনি বলেন, ডাকসু সংগ্রহশালা বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পদ। এর মালিকানা ডাকসুর নয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের। ফলে এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও সিন্ডিকেটের।
ডাকসু নেতৃত্ব দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই বিভিন্ন বিষয়ে বিতর্ক তৈরি হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন অধ্যাপক তানজীমউদ্দিন। তাঁর মতে, এরই ধারাবাহিকতায় সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবি প্রদর্শনের বিষয়টি নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
অনুষ্ঠানে শিক্ষক মূল্যায়ন নিয়েও ডাকসুর উদ্যোগের সমালোচনা করেন অধ্যাপক তানজীমউদ্দিন। তাঁর মতে, ডাকসুর উদ্যোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মূল্যায়ন ও রেটিং দেওয়ার ব্যবস্থা চালু করা এখতিয়ারবহির্ভূত এবং এটি একধরনের ‘প্যারালাল প্রশাসন’ তৈরির চেষ্টা।
তবে শিক্ষক মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করেননি তিনি। তাঁর মতে, শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে শিক্ষকদের মূল্যায়নের ব্যবস্থা বিশ্বের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়েই রয়েছে, যা সাধারণত ‘স্টুডেন্ট ফিডব্যাক’ হিসেবে পরিচিত। শিক্ষকদের পেশাগত উৎকর্ষ নিশ্চিত করতে এ ধরনের ব্যবস্থা প্রয়োজন। তবে সেটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ও একাডেমিক কাঠামোর মধ্যেই পরিচালিত হওয়া উচিত।
তানজীমউদ্দিন খান বলেন, একজন শিক্ষকের পেশাগত দক্ষতা শুধু চাকরির মেয়াদ, প্রকাশনার সংখ্যা, পিএইচডি বা অন্যান্য ডিগ্রির মাধ্যমে পুরোপুরি নির্ধারণ করা যায় না। কেউ ভালো গবেষক হলেও পাঠদানের ক্ষেত্রে যথেষ্ট মনোযোগী নাও হতে পারেন। আবার কেউ গবেষণা ও পাঠদান উভয় ক্ষেত্রেই ভালো করলেও তা মূল্যায়নের যথাযথ কাঠামো না থাকলে তাঁর কাজের সঠিক প্রতিফলন পাওয়া যায় না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০২২ সাল থেকে শিক্ষক মূল্যায়নের একটি ব্যবস্থা চালুর চেষ্টা চলছে বলেও জানান তিনি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু বিভাগে এরই মধ্যে এ ধরনের ব্যবস্থা চালু হয়েছে। ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (আইবিএ) এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগসহ কয়েকটি বিভাগে শিক্ষক মূল্যায়নের ব্যবস্থা রয়েছে। তাঁর নিজের বিভাগেও এ বিষয়ে সম্মিলিতভাবে কাজ করার চেষ্টা চলছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও বিষয়টি নিয়ে কাজ করেছে, যদিও তা এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।
ডাকসুর উদ্যোগ সম্পর্কে অধ্যাপক তানজীমউদ্দিন বলেন, ডাকসুর নির্দিষ্ট গঠনকাঠামো ও কর্মকাণ্ডের পরিধি রয়েছে। শিক্ষকদের মূল্যায়ন করা সেই পরিধির মধ্যে পড়ে কি না, সেটিই প্রথমে বিবেচনা করা প্রয়োজন। ডাকসু প্রশাসন নয়। ফলে প্রশাসনের কাজ ডাকসু নিজে করতে গেলে তা একধরনের ‘প্যারালাল প্রশাসন’ তৈরির দিকে যেতে পারে।
তিনি আরও বলেন, ডাকসু একটি নির্বাচিত প্রতিষ্ঠান হলেও রাজনৈতিকভাবে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ কোনো প্রতিষ্ঠান নয়। ডাকসুর সদস্যদের নিজস্ব রাজনৈতিক ও মতাদর্শগত অবস্থান রয়েছে, যা তাঁদের কর্মকাণ্ডে প্রতিফলিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। একইভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যেও মতাদর্শগত ভিন্নতা রয়েছে। ফলে ডাকসুর মাধ্যমে শিক্ষকদের মূল্যায়ন করা হলে সেখানে পক্ষপাতের আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
শিক্ষক মূল্যায়নের ফলাফল শিক্ষার্থীদের দেখার সুযোগ তৈরি করা এবং পরে সেগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টিকেও উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর মতে, এটি শিক্ষকদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার প্রশ্ন তৈরি করতে পারে এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীর স্বাভাবিক সম্পর্কেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, যেখানে একজন শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে গিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবেন না।
ডাকসু নির্বাচন নিয়মিত হওয়া উচিত কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে অধ্যাপক তানজীমউদ্দিন খান বলেন, ডাকসু নেতৃত্ব তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম। ভবিষ্যৎ জাতীয় নেতৃত্ব গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও এর ভূমিকা রয়েছে। তবে ডাকসু যদি রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে ব্যর্থ হয়, তাহলে সেটি জাতীয় রাজনীতির জন্যও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
সব মিলিয়ে ডাকসু সংগ্রহশালায় ইতিহাসের উপস্থাপন, প্রশাসনিক এখতিয়ার এবং শিক্ষক মূল্যায়নের মতো একাধিক বিষয়ে সাম্প্রতিক বিতর্ককে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও দায়িত্বের প্রশ্নের সঙ্গে দেখছেন অধ্যাপক তানজীমউদ্দিন খান। তাঁর বক্তব্য, ইতিহাস সংরক্ষণ ও উপস্থাপনার ক্ষেত্রে কোনো দলীয় বা মতাদর্শগত দৃষ্টিভঙ্গি প্রাধান্য না দিয়ে তথ্যনির্ভর ও ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন প্রশাসনিক ও একাডেমিক দায়িত্ব নির্ধারিত কাঠামোর মধ্যেই পরিচালিত হওয়া উচিত।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au