চলমান সংঘাতের মধ্যে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলা। (সূত্র: রয়টার্স)
মেলবোর্ন ২২ জুন- যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় বিমান হামলার পর বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। তবে হামলার প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি এখনো পরিষ্কার নয়। কোনও হতাহত বা মারাত্মক ক্ষতির নিশ্চয়তা এখনও দেওয়া যায়নি।
ইরানের পারমাণবিক শক্তি সংস্থা এই হামলাকে আন্তর্জাতিক আইনের “বর্বর লঙ্ঘন” বলে আখ্যা দিয়েছে।
এদিকে সৌদি আরব এবং জাতিসংঘের পারমাণবিক পর্যবেক্ষক সংস্থা IAEA (International Atomic Energy Agency) জানিয়েছে, হামলার পর পারমাণবিক বিকিরণের মাত্রা বৃদ্ধি পায়নি। IAEA প্রধান রাফায়েল গ্রোসি সোমবার জরুরি বোর্ড সভার ডাক দিয়েছেন।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার সংস্থার উপ-রাজনৈতিক পরিচালক হাসান আবেদিনি জানান, ওই তিনটি পারমাণবিক কেন্দ্র আগেই খালি করে ফেলা হয়েছিল। তিনি বলেন, “ইরান বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েনি, কারণ উপকরণগুলো আগেই সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।”
তবে এক টেলিভিশন ভাষণে ট্রাম্প দাবি করেন, “পারমাণবিক সমৃদ্ধিকরণ কেন্দ্রগুলো সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে।”
এই বক্তব্যের বিপরীতে সাবেক মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্ক কিমিট বলেন, “এমন দাবি করা ঠিক হবে না যে এগুলো চিরতরে ধ্বংস হয়ে গেছে।”
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ফোর্ডো, নাতাঞ্জ এবং ইসফাহানে যুক্তরাষ্ট্রের এই হামলার “স্থায়ী পরিণতি” হবে। তিনি জানান, ইরান তার সার্বভৌমত্ব রক্ষায় “সব ধরনের বিকল্প উন্মুক্ত রেখেছে।”
ইরান কীভাবে পাল্টা জবাব দিতে পারে?
BBC নিরাপত্তা বিশ্লেষক ফ্র্যাঙ্ক গার্ডনার বলছেন, ইরান এই হামলার পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় তিনটি কৌশলগত পথ বেছে নিতে পারে:
-
কিছুই না করা – এতে যুক্তরাষ্ট্রের আরও হামলা এড়ানো যেতে পারে, এমনকি আবারও কূটনৈতিক আলোচনায় ফিরে আসা সম্ভব। তবে প্রতিশোধ না নেওয়া ইরান সরকারকে দুর্বল হিসেবে চিহ্নিত করতে পারে।
-
তাৎক্ষণিক শক্ত প্রতিশোধ – ইরানের কাছে এখনও বিশাল সংখ্যক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় ২০টি মার্কিন ঘাঁটিকে লক্ষ্যবস্তু বানানো যেতে পারে। এছাড়া, ড্রোন ও দ্রুতগামী টর্পেডো নৌকা দিয়ে মার্কিন যুদ্ধজাহাজে “ঝাঁকবদ্ধ হামলা” চালানো সম্ভব।
-
পরবর্তী সময়ে চমকে দেওয়া হামলা – এখন উত্তেজনা কমে গেলে পরে যখন মার্কিন ঘাঁটিগুলো সর্বোচ্চ সতর্কতায় থাকবে না, তখন হঠাৎ করে হামলা চালানো। ইরান প্রতিবেশী মিত্র দেশগুলোকেও লক্ষ্যবস্তু বানাতে পারে, যা পুরো অঞ্চলে যুদ্ধ ছড়িয়ে দেওয়ার আশঙ্কা বাড়ায়।
যুক্তরাষ্ট্রের হামলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইরান ইসরায়েলের দিকে একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুঁড়েছে। তেল আবিব এবং হাইফা শহরে হামলার ঘটনা ঘটেছে। ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কমপক্ষে ১৬ জন আহত হয়েছে।
ট্রাম্প কী বললেন, যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিক্রিয়া কেমন?
সহ-রাষ্ট্রপতি জেডি ভ্যান্স, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে পাশে নিয়ে ট্রাম্প বলেন, যদি ইরান কূটনৈতিক সমাধানে না আসে, তাহলে পরবর্তী হামলা হবে “আরও ভয়ঙ্কর”। তিনি বলেন, “স্মরণ রাখুন, এখনও অনেক টার্গেট বাকি আছে।”
রিপাবলিকান সিনেটর টেড ক্রুজ এই হামলার প্রশংসা করেছেন। কিন্তু সবাই একমত নন। মার্জরি টেলর গ্রিন বলেন, “এটা আমাদের যুদ্ধ না।”
ডেমোক্র্যাট নেতা হাকিম জেফরিস বলেন, ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে “মধ্যপ্রাচ্যে এক সম্ভাব্য ধ্বংসাত্মক যুদ্ধে জড়ানোর ঝুঁকিতে ফেলেছেন।”
স্বতন্ত্র সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স বলেন, এই হামলা “সংবিধান পরিপন্থী”। কারণ প্রেসিডেন্টের একার পক্ষে যুদ্ধ ঘোষণা করা আইনগতভাবে বৈধ নয়। তবে প্রেসিডেন্ট যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সর্বোচ্চ প্রধান হওয়ায় তিনি সেনাবাহিনী মোতায়েন এবং সামরিক অভিযান চালাতে পারেন।
বিশ্ব নেতাদের প্রতিক্রিয়া কী?
-
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী স্যার কেয়ার স্টারমার বলেছেন, ইরানের পারমাণবিক হুমকি প্রশমনে যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছে। তিনি তেহরানকে আলোচনায় ফেরার আহ্বান জানিয়েছেন।
-
জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এই হামলাকে “বিপজ্জনক উত্তেজনার বৃদ্ধি” বলে উল্লেখ করেছেন।
-
ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্র নীতিবিষয়ক প্রধান কাইজা কাল্লাস সব পক্ষকে শান্ত হয়ে আলোচনায় ফিরতে বলেছেন।
-
সৌদি আরব “গভীর উদ্বেগ” প্রকাশ করেছে এবং ওমান, যেখানেই সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছিল, এই হামলার নিন্দা জানিয়ে পরিস্থিতি নিরসনের আহ্বান জানিয়েছে।
এই সংঘাতের সূচনা কিভাবে?
১৩ জুন, ইসরায়েল ইরানের কয়েক ডজন পারমাণবিক ও সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে চমকপ্রদ হামলা চালায়। প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু বলেন, ইরান খুব দ্রুত পারমাণবিক বোমা বানাতে সক্ষম হবে, তাই এ কর্মসূচি বন্ধ করা জরুরি।
ইরান দাবি করে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায়, ইরান শত শত রকেট ও ড্রোন ইসরায়েলের দিকে ছোঁড়ে। তারপর থেকে চলছে একটানা বিমান যুদ্ধ।
ট্রাম্প বরাবরই ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের বিরুদ্ধে। আর ইসরায়েল গোপনে পারমাণবিক অস্ত্র রাখে বলে ধারণা করা হয়, যদিও তারা কখনো স্বীকার বা অস্বীকার করেনি।
মাত্র কয়েক দিন আগেও ট্রাম্প বলেছিলেন, ইরানকে দুই সপ্তাহের সময় দেওয়া হবে আলোচনায় বসার জন্য। কিন্তু সেই সময়সীমা মাত্র দুই দিনেই শেষ হয়ে গেল। যুদ্ধ বাস্তবে রূপ নিল। এখন বিশ্ব অপেক্ষা করছে, শেষপর্যন্ত এই সংঘাত কোথায় গিয়ে থামে।