টানা ভুমিকম্পের কারণে স্থানীয় প্রশাসন কিছু বাসিন্দাকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়। ছবিঃ এপি
মেলবোর্ন, ১২ জুলাই-
জাপানের তোকারা দ্বীপপুঞ্জ এলাকায় সম্প্রতি টানা ভূমিকম্পের ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়েছে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে, সেই সঙ্গে দেশজুড়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
জুনের শেষ সপ্তাহ থেকে জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই এখানে ১,২০০–এর বেশি ভূমিকম্প রেকর্ড হয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটির তীব্রতা জাপানের সাত স্তরবিশিষ্ট স্কেলের ‘লোয়ার ৬’ এ পৌঁছায়, যা এতটাই শক্তিশালী যে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষকেও সহজে ফেলে দিতে পারে। এই টানা কম্পনের কারণে স্থানীয় প্রশাসন কিছু বাসিন্দাকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়েছে।
এরই মধ্যে গুজব ছড়ায় “দ্য ফিউচার আই স’” নামে একটি কমিকের কথিত ভবিষ্যদ্বাণীকে কেন্দ্র করে, যেখানে বলা হয়েছিল ৫ জুলাই ২০২৫-এ বড় ধরনের এক ভূমিকম্প হতে পারে। বিষয়টি সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে আতঙ্ক আরও বাড়িয়ে দেয়, যার কারণে অনেক মানুষ ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়েন, এমনকি পূর্ব এশিয়ার কিছু ফ্লাইটও বাতিল হয়। তবে জাপানের আবহাওয়া সংস্থা (জেএমএ) স্পষ্ট জানায়, এমনভাবে নির্দিষ্ট দিনে ভূমিকম্পের ভবিষ্যদ্বাণী করা সম্ভব নয়। সংস্থার পরিচালক রিওইচি নোমুরা একে ‘প্রতারণা’ আখ্যা দিয়ে জনগণকে গুজবে কান না দিয়ে সতর্ক ও প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানান।
এ ধরনের প্রাকৃতিক ঝুঁকি মোকাবিলায় জাপান সরকারের প্রস্তুতি নতুন কিছু নয়। বরং জুলাই মাসের শুরুতেই সরকার একটি পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে, যার লক্ষ্য ভবিষ্যতের সম্ভাব্য ‘মেগাকোয়েক’-এ প্রাণহানি ৮০ শতাংশ এবং অবকাঠামোর ক্ষতি ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে আনা। এই পরিকল্পনায় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে— নতুন ও পুরনো ভবনগুলোর কাঠামো আরও মজবুত ও সুনামি-সহনশীল করা, নিয়মিত মহড়া ও জরুরি পরিকল্পনা পরীক্ষা করা, এবং দেশের জাতীয় সতর্কতা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা। বিশেষজ্ঞদের মতে, নানকাই ট্রাফ এলাকায় আগামী ৩০ বছরের মধ্যে বড় ধরনের এক ভূমিকম্পের আশঙ্কা প্রায় ৮০ শতাংশ, যা ভয়াবহ ক্ষতির কারণ হতে পারে।
জাপান দীর্ঘদিন ধরেই পৃথিবীর অন্যতম সেরা প্রযুক্তিভিত্তিক জরুরি সতর্কবার্তা ব্যবস্থা চালু রেখেছে। ২০০৭ সাল থেকে চালু হওয়া ন্যাশনাল আর্থকোয়েক ইয়ারলি ওয়ার্নিং (EEW) সিস্টেম ভূমিকম্পের কম্পন শুরু হওয়ার কয়েক সেকেন্ড আগেই মোবাইল, টেলিভিশন ও রেডিওতে সতর্কবার্তা পাঠিয়ে দেয়। একই সময়ে চালু হওয়া জে-অ্যালার্ট সিস্টেম সরাসরি সাইরেন, সম্প্রচার ও মোবাইল বার্তার মাধ্যমে জনগণকে সতর্ক করে তোলে। এ ছাড়া প্রতিবছর ১ সেপ্টেম্বর সারা দেশে ‘দুর্যোগ প্রস্তুতি দিবস’ পালন করা হয়, যেখানে স্কুল, অফিস ও বিভিন্ন কমিউনিটি পর্যায়ে মহড়া হয়— যেন বিপদের সময় সবাই দ্রুত ও সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
টোকিওসহ জাপানের বিভিন্ন বড় শহরে আন্তর্জাতিক মানের কঠোর ভবন নির্মাণ নীতিমালা রয়েছে, যাতে শক্তিশালী ভূমিকম্প হলেও প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনা যায়। এদিকে তোকারা দ্বীপপুঞ্জের চলমান কম্পন এবং সামাজিক মাধ্যমে গুজবের মধ্যেও জাপান সরকার বারবার মনে করিয়ে দিয়েছে— আতঙ্ক নয়, বরং সচেতনতা ও প্রস্তুতিই এই ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
সুত্রঃ ডিডব্লিউ