বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় জিএসটি হার বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় নিচু। ছবিঃ নাইন নিউজ
মেলবোর্ন, ১৩ জুলাই-
অস্ট্রেলিয়ায় দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে অপরিবর্তিত থাকা ১০ শতাংশ জিএসটি বা গুডস অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্যাক্স (GST) নিয়ে নতুন করে বিতর্ক ও আলোচনার ঢেউ উঠেছে। বিশেষজ্ঞ, অর্থনীতিবিদ এবং হিসাবরক্ষক সংগঠনগুলো বলছে, দেশটির রাজস্ব ঘাটতি পূরণ, সামাজিক সুরক্ষা ও অবকাঠামোতে বাড়তি ব্যয় সামাল দিতে শুধু আয়ের ওপর নির্ভর না করে বিকল্প উৎস থেকে রাজস্ব আনা দরকার। আর এই বিকল্প উৎস হতে পারে জিএসটি বাড়ানো।
বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় জিএসটি হার বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় নিচু। যেমন, প্রতিবেশী নিউজিল্যান্ডে এই হার ১৫ শতাংশ, আর অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা (OECD)-এর দেশগুলোর গড় জিএসটি হার প্রায় ১৯ শতাংশের কাছাকাছি। ফলে অনেকে মনে করছেন, অস্ট্রেলিয়া পিছিয়ে পড়ছে এবং এতে রাজস্বের বড় একটা সম্ভাবনা হারাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অস্ট্রেলিয়ার কর ব্যবস্থায় খুব বেশি অংশই ব্যক্তির আয়ের ওপর নির্ভরশীল, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে চাপ তৈরি করছে। এর পরিবর্তে জিএসটি বাড়ালে সরকারের হাতে বাড়তি অর্থ আসবে, যা স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পরিকাঠামোর মতো খাতে খরচ করা যাবে। তাছাড়া, জিএসটি তুলনামূলকভাবে ‘স্থিতিশীল’ রাজস্ব উৎস হিসেবে কাজ করে। অর্থাৎ, অর্থনৈতিক মন্দার সময়ও কিছুটা টেকসইভাবে অর্থ যোগায়।
তবে বিষয়টি এতটা সহজ নয়। অনেকেই মনে করছেন, হঠাৎ জিএসটি বাড়ালে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের ওপর সরাসরি চাপ পড়বে। কারণ জিএসটি হলো ‘রিগ্রেসিভ ট্যাক্স’, যা ধনীদের তুলনায় দরিদ্র মানুষের আয়ে তুলনামূলক বেশি প্রভাব ফেলে। তাই এই প্রস্তাবের সঙ্গে সঙ্গেই শর্ত এসেছে—যদি জিএসটি বাড়ানো হয়, তবে অবশ্যই নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সহায়তা দিতে হবে। উদাহরণ হিসেবে বলা হচ্ছে, আয়কর কিছুটা কমিয়ে দেওয়া, নির্দিষ্ট পরিমাণ আয় পর্যন্ত জিএসটি ছাড় দেওয়া বা আর্থিক সহায়তা বাড়ানোর মতো ব্যবস্থা।

উৎসের ভিত্তিতে অস্ট্রেলিয়ান কর রাজস্ব; ছবিঃ নাইন নিউজ
অন্যদিকে, রাজনীতিবিদরা এ নিয়ে স্পষ্ট মত দেননি। প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ জানিয়েছেন, জিএসটি বাড়ানো এখন সরকারের এজেন্ডায় নেই। তিনি বলেন, এই কর সরাসরি দরিদ্র মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ে প্রভাব ফেলে, যা লেবার পার্টির নীতির সঙ্গে যায় না। তবে এ নিয়ে আলোচনা থেমে নেই। চলতি বছর সরকারের উদ্যোগে একটি ট্যাক্স রিফর্ম রাউন্ডটেবিল বৈঠক বসবে, যেখানে জিএসটিসহ পুরো কর কাঠামো নিয়ে আলোচনা হবে। অর্থমন্ত্রী জিম চ্যালমার্সও জানিয়েছেন, দেশের ভবিষ্যৎ কর ব্যবস্থাকে আরও টেকসই ও ভারসাম্যপূর্ণ করতে এ আলোচনা হবে, যদিও এখনই কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
জিএসটির আরেকটি জটিল দিক হলো, রাজ্যগুলোর মধ্যে এ করের রাজস্ব বণ্টন। পশ্চিম অস্ট্রেলিয়া চায় তারা আরও বেশি অংশ পাক, কারণ তাদের মতে, রাজ্যটি বেশি অবদান রাখছে। অন্যদিকে নিউ সাউথ ওয়েলস, ভিক্টোরিয়ার মতো পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলো বলছে, এটি তাদের জন্য বৈষম্য তৈরি করছে। এই বিতর্ক বহুদিন ধরে চলছে, এবং জিএসটি হার বাড়ালে এই টানাপোড়েন আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা আছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, অস্ট্রেলিয়ার অর্থনীতি, জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার এবং সামাজিক চাহিদা বিবেচনা করলে জিএসটির মতো একটি স্থিতিশীল কর উৎসকে আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করা প্রয়োজন। তবে সেটি করতে গেলে সরকারকে রাজনৈতিক ঝুঁকি নিতে হবে, আর দরিদ্র মানুষদের জন্য স্পষ্ট সহায়তা পরিকল্পনাও তৈরি করতে হবে।
সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক হিসাবরক্ষক সংস্থা ও অর্থনীতিবিদ গণমাধ্যমে বলছেন, এখন সময় এসেছে পরিপক্কভাবে এই আলোচনা করার, কারণ শুধু আয়ের ওপর কর বসিয়ে রাজস্ব বৃদ্ধির চেষ্টা বেশি দিন টিকবে না। সেই সঙ্গে দরকার কর কাঠামোকে আরও সহজ ও আধুনিক করা, যাতে ব্যবসা ও বিনিয়োগও বাড়ে।
সব মিলিয়ে, অস্ট্রেলিয়ার জিএসটি বাড়ানোর আলোচনা এখনো কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ। সরকার এখনও বলছে তারা সরাসরি এ সিদ্ধান্ত নিচ্ছে না। তবে বাজেট ঘাটতি, অর্থনৈতিক চাপে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় এবং রাজস্ব বৃদ্ধির প্রয়োজন—সব কিছু মিলে এ বিতর্ক আরও গভীর হতে পারে, এবং আগামী মাসগুলিতে নতুন কোনো প্রস্তাব বা সমঝোতার আকারও নিতে পারে।
সুত্রঃ নাইন নিউজ