বিদেশি কর্মীদের জন্য সুইডেনে স্থায়ী বসবাসের পথে নতুন অবরোধ । ছবি: সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ৮ সেপ্টেম্বর- ইউরোপে স্থায়ীভাবে বসবাসের স্বপ্ন অনেকেরই। উন্নত জীবনযাত্রা, উদ্ভাবনী অর্থনীতি এবং নিরাপদ সামাজিক পরিবেশের জন্য স্ক্যান্ডিনেভিয়ার দেশ সুইডেন এখন বিদেশি কর্মীদের কাছে বিশেষভাবে আকর্ষণীয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সুইডিশ সরকার স্থায়ী বসবাসের (পারমানেন্ট রেসিডেন্সি বা পিআর) শর্ত আরও কঠোর করেছে।
২০২৫ সালের ১৭ জুন থেকে কার্যকর নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, বিদেশি কর্মীদের সুইডেনে স্থায়ী বসবাসের জন্য আবেদন করতে হলে প্রতি মাসে কর দেওয়ার আগে ন্যূনতম ২৯ হাজার ৬৮০ সুইডিশ ক্রোন (বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৪ লাখ) আয় করতে হবে। এটি সুইডেনের গড় বেতনের ৮০ শতাংশ।
কেন গুরুত্বপূর্ণ সুইডেনে স্থায়ী বসবাস?
সুইডেনে স্থায়ী বসবাসের অনুমতি পাওয়া মানে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা। এটি শুধু কর্মীর জন্য নয়, বরং তাঁর পরিবারের জন্যও স্থিতিশীল অভিবাসন মর্যাদা নিশ্চিত করে।
স্থায়ী বসবাসের কিছু সুবিধা হলো—
- ভিসা নবায়নের ঝামেলা থেকে মুক্তি।
- শেনজেন অঞ্চলের দেশগুলোতে সহজ ভ্রমণ ও কাজের সুযোগ।
- পরিবারের সদস্যদের জন্য স্থিতিশীল অভিবাসন সুবিধা।
- নিয়োগকর্তা বদলানোর স্বাধীনতা।
- ভবিষ্যতে নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করার সুযোগ।
যোগ্যতার শর্ত
সুইডেনে পিআর-এর জন্য আবেদন করতে হলে আবেদনকারীর—
১. বৈধ কাজের অনুমতি থাকতে হবে।
২. সাত বছরের মধ্যে কমপক্ষে ৪৪ মাস কাজ করার অভিজ্ঞতা থাকতে হবে।
৩. ৪৮ মাসের জন্য কাজের অনুমতি (দুটি দুই বছরের মেয়াদে) পূর্ণ করতে হবে।
৪. চাকরি ও বেতনের সব শর্ত পূরণ করতে হবে।
৫. নিয়মিত আয়, আবাসন এবং সুশৃঙ্খল জীবনযাপনের প্রমাণ থাকতে হবে।
৬. কোনো অপরাধমূলক রেকর্ড থাকা চলবে না।
প্রয়োজনীয় নথিপত্র
আবেদন প্রক্রিয়ায় যেসব কাগজপত্র প্রয়োজন—
- বৈধ পাসপোর্ট ও ভিসার স্ট্যাম্প।
- চাকরির চুক্তিপত্র ও বেতনের স্লিপ।
- আবাসনের প্রমাণপত্র (ভাড়া বা মালিকানার কাগজ)।
- ব্যাংক বিবরণী ও কর-সংক্রান্ত কাগজপত্র।
- স্বাস্থ্যবিমার তথ্য।
- পরিবারের সদস্যদের ক্ষেত্রে সম্পর্ক প্রমাণের নথি।
আবেদনের ধাপ
১. অনলাইনে মাইগ্রেশন এজেন্সির ওয়েবসাইটে আবেদন জমা দিন।
২. প্রয়োজনীয় নথি আপলোড করুন।
৩. আবেদন ফি পরিশোধ করুন (প্রায় ১৯ হাজার টাকা সমপরিমাণ)।
৪. কেস অফিসারের অপেক্ষা করুন।
৫. প্রয়োজনে বায়োমেট্রিক জমা দিন।
৬. অনুমোদন পেলে পিআর কার্ড সংগ্রহ করুন।
কারা অব্যাহতি পাবেন?
সবাইকে এই নতুন নিয়ম মানতে হবে না। ইইউ বা ইইএ নাগরিক, ব্লু কার্ডধারী, মৌসুমি কর্মী, গবেষক, ক্রীড়াবিদ, ইন্টার্ন ও আউ পেয়াররা ন্যূনতম আয়ের নিয়ম থেকে অব্যাহতি পাবেন।
স্থায়ী বসবাসের খরচ
- আবেদনের ফি: প্রায় ১৯ হাজার টাকা।
- সময় ও নথি প্রস্তুতির বাড়তি খরচ থাকতে পারে।
- অনেক ক্ষেত্রে নিয়োগকর্তা কর্মীর ফি পরিশোধ করে থাকে।
চ্যালেঞ্জ
- দীর্ঘ প্রক্রিয়াকরণের সময় (কখনো কয়েক বছরও লাগতে পারে)।
- আবেদন চলাকালে ভ্রমণের ওপর নিষেধাজ্ঞা।
- নিয়ম পরিবর্তনের কারণে পূর্ববর্তী আবেদনকারীরাও প্রভাবিত হতে পারেন।
- ছোটখাটো আইনি সমস্যা অনুমোদন জটিল করতে পারে।
স্থায়ী বসবাস বনাম নাগরিকত্ব
স্থায়ী বসবাস (পিআর): অনির্দিষ্টকালের জন্য সুইডেনে বসবাস ও কাজের অধিকার দেয়, তবে আপনি নিজ দেশের নাগরিকই থাকেন।
নাগরিকত্ব: রাজনৈতিক ও আইনি পূর্ণ অধিকার দেয়, ভোটাধিকার ও সুইডিশ পাসপোর্টের সুযোগ থাকে। সাধারণত পিআর পাওয়ার পর ৫ বছর বসবাস করলে নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করা যায়।
আবেদন গ্রহণের সম্ভাবনা বাড়াতে কিছু টিপস
- নিয়মিত চাকরি বজায় রাখা এবং বেতনের শর্ত পূরণ।
- আর্থিক ও আবাসনের সঠিক প্রমাণ রাখা।
- অপরাধ এড়িয়ে চলা।
- সামান্য হলেও সুইডিশ ভাষা শেখা।
- নিয়ম পরিবর্তনের আপডেট নিয়মিত অনুসরণ করা।
সুইডেনে স্থায়ী বসবাসের আবেদন এখন আরও কঠিন হলেও সঠিক প্রস্তুতি, প্রয়োজনীয় আয়ের শর্ত পূরণ এবং সঠিক নথি জমা দিলে এটি পাওয়া সম্ভব। দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা, শেনজেন অঞ্চলে ভ্রমণের স্বাধীনতা, পরিবারের স্থিতিশীলতা এবং নাগরিকত্বের পথে অগ্রসর হওয়ার সুযোগ—সবকিছু মিলিয়ে সুইডেনের পিআর বিদেশিদের কাছে এখনও একটি বড় স্বপ্ন।