লন্ডনের দক্ষিণে হর্লিতে ২৩ আগস্ট অভিবাসনবিরোধী বিক্ষোভের সময় একজন বিক্ষোভকারী পতাকা ধরে আছেন, যেখানে লেখা ছিল 'নৌকা বন্ধ করুন'। ছবি : এএফপি
মেলবোর্ন, ২৪ অক্টোবর- সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ক্ষুদ্র নৌকায় ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে যুক্তরাজ্যে অবৈধভাবে প্রবেশকারী অভিবাসীদের সংখ্যার ধারাবাহিক বৃদ্ধি দেশটির সরকারকে তীব্র রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক চাপের মুখে ফেলেছে। এই বৃদ্ধি গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে সীমান্ত নিরাপত্তা, হোস্টিংয়ের ব্যয়, আদালত ও আশ্রয়প্রার্থীর মামলা-প্রক্রিয়ার উপর চাপ এবং রাজনৈতিক আচার-ব্যবহারে প্রতিফলিত হচ্ছে।
সরকারি ও সংবাদসংস্থার পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০২৫ সালে ছোট নৌকায় চ্যানেল পাড়ি দেয়া অভিবাসীর সংখ্যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে; বছরের প্রথম দিকে রেকর্ড পরিমাণে আগমন লক্ষণীয় ছিল। সরকারি ডেটা ও মিডিয়া প্রতিবেদনে দেখা গেছে একাধিক দিনে শত বা কয়েক শতজন একসঙ্গে পৌঁছেছে, যার ফলে প্রথম ছয় মাসেই হাজারখানেক রেকর্ড হয়েছে এবং সারাবছরে সংখ্যাটি আরও বাড়ার পথে। এই ধারাবাহিকতা সরকারের সীমান্তনীতি ও রিফ্যাজি ব্যবস্থা উভয়ের ওপর স্থায়ী চাপ প্রয়োগ করেছে।
কেবিনেট এবং হোম অফিস ইতোমধ্যেই কয়েকটি কঠোর পদক্ষেপ ঘোষণা করেছে ফ্রান্সসহ অন্যান্য ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে সমঝোতা, ‘ওয়ান-ইন ওয়ান-আউট’ (একজন পাঠানো গেলে এক জন ফেরত) ধাঁচের রিটার্ন চুক্তি, আতিথেয়তার জন্য হোটেল ব্যাবহার কমিয়ে সাময়িক ক্যাম্প নির্মাণের প্রস্তুতি এবং মানবপাচারকারী গ্যাংগুলোর বিরুদ্ধে জোরালো অভিযান। সরকার বলছে, এগুলো অপরাধী চক্রগুলোকে ভাঙতে এবং অনিয়মিত কুটনীতির ধারা বন্ধ করতে নেয়া হয়েছে।
কিছু পদক্ষেপ কার্যকর হলেও বাস্তবে পর্যবেক্ষকরা ফাঁকখুঁজে পেয়েছেন উদাহরণস্বরূপ, যে একজনকে ফ্রান্সে ফেরত পাঠানো হয়েছিল, তিনি আবারও ছোট নৌকায় ফিরে এসে যুক্তরাজ্যে পৌঁছেছেন এই ঘটনাটি সরকারের ‘ওয়ান-ইন ওয়ান-আউট’ নীতির দুর্বলতা তুলে ধরে দিয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, সীমান্ত রোধে আন্তর্জাতিক সমন্বয়, দ্রুত প্রশাসনিক নিষ্কাশন ও অপরাধীর বিরুদ্ধে ধারাবাহিক আইনগত অভিযান একসঙ্গে না হলে সমস্যা সাময়িকভাবে নিয়ন্ত্রিত হলেও পুনরায় দেখা দেবে।
উচ্চ সংখ্যক আগমনে আশ্রয়প্রার্থীদের হোটেল ও জরুরি বাসস্থানের ভাড়া, আইনগত সহযোগিতা খরচ, মেডিক্যাল ও সমাজসেবা যে পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে তা কেন্দ্রীয় রাজস্ব ও স্থানীয় কাউন্সিল উভয়ের ওপর আর্থিক বোঝা বাড়িয়েছে। সরকারের পরিকল্পনায় সাময়িকভাবে মিলিটারি সংস্থার সাহায্যে দ্রুত ক্যাম্প নির্মাণের কথাও এসেছে যাতে হোটেল-খরচ কমানো যায় তবে মানবাধিকার নেতারা সতর্ক করেছেন যে সাময়িক ও জনসভার বাইরে থাকা বন্দোবস্তগুলো মানবিক ও আইনি ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
এই সঙ্কটের রাজনৈতিক ফলাফলের দিকে নজর রাখতে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার প্রতি জনমতের চাপ বাড়ছে এবং বিরোধী দল ও ডানপন্থী রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলো সীমান্ত-নিরাপত্তাকে বড় রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে তুলে ধরছে। এছাড়া, মানবাধিকার সংগঠন ও আইনজীবী গোষ্ঠী অঞ্চলভিত্তিক সমাধান, নিরাপদ/আইনি পথে উদ্বাস্তুদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা আনার দাবি জানাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে সমস্যার টেকসই সমাধানের জন্য দরকার:ফ্রান্স ও অন্য ইউরোপীয় অংশীদারদের সঙ্গে কার্যকর সমঝোতা ও সমন্বিত নির্মূল অভিযান;মানুষের পাচারকারীদের অর্থ ও লজিস্টিক নেটওয়ার্ক ধ্বংস করা;বাধ্যতামূলক দ্রুত বিচারের সুবিধা এবং সঠিক রিটার্ন/রিফ্যাজি প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা;দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ ও বৈধ পথ বাড়ানো যাতে বিপদে পড়ে মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ নৌকায় না বসে।
ছোট নৌকায় অভিবাসী আগমনের ধারাবাহিক বৃদ্ধির ফলে যুক্তরাজ্য সরকার সীমান্তনীতিতে দ্রুত ও তীব্র পদক্ষেপ নিচ্ছে; তবু বাস্তবে নীতির কার্যকারিতা ও আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের ঘাটতি সমস্যার স্থায়ী সমাধানকে জটিল করে তুলেছে। সরকারের বেশ কয়েকটি পদক্ষেপই এখন পরীক্ষা-পর্যায়ে রয়েছে এবং পরবর্তী কয়েক সপ্তাহে ফ্রান্স-সহ অংশীদার রাজ্যগুলোর প্রতিক্রিয়া ও অভিযানের গতি এখানে নির্ণায়ক ভূমিকা রাখবে।
সুত্রঃ এএফপি