ইসকন নিষিদ্ধের দাবিতে চট্টগ্রামে হেফাজতের বিক্ষোভ। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ২৫ অক্টোবর- বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ (ইসকন) নিষিদ্ধের দাবিতে রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলায় বিক্ষোভ ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। গুমের অভিযোগ এবং দেশবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ তুলে ইসলামী বিভিন্ন সংগঠন এই বিক্ষোভ আয়োজন করে। তবে, এধরণের অভিযোগের প্রমাণ দিতে পারেনি অভিযোগকারী সংগঠনগুলো। বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, ইসলামপন্থী রাজনীতির একছত্র আধিপত্য বিরাজ করতে এসব ঘটনা সাজিয়ে ইসকনকে বাংলাদেশে কোণঠাসা করে রাখা হচ্ছে।
তবে, প্রকৃত দোষীদের খুঁজে বের করার দাবি না তুলে প্রমাণ ছাড়া ইসকনের উপর দায় চাপানোয় ঘটনাটি ইসলামপন্থি সংগঠনগুলোর পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা।
শুক্রবার(২৪ অক্টোবর) জুমার নামাজের পর ঢাকার বিভিন্ন মসজিদ থেকে খণ্ড খণ্ড মিছিল বের হয়। বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের উত্তর গেটে ‘ইন্তিফাদা বাংলাদেশ’ নামে একটি সংগঠন বড় সমাবেশ আয়োজন করে।
কামরাঙ্গীরচরে বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, খেলাফত যুব মজলিস ঢাকা মহানগর দক্ষিণ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ, তিতুমীর কলেজ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা একই দাবিতে বিক্ষোভ করে। উত্তরা, মোহাম্মদপুর, মিরপুর, আসাদগেট ও জিগাতলায়ও বিক্ষোভ মিছিল হয়।
চট্টগ্রামের হাটহাজারী ডাকবাংলো চত্বরে হেফাজতে ইসলাম বিক্ষোভ সমাবেশ করে। গাজীপুরের কাপাসিয়া, পঞ্চগড়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, কুমিল্লা, রংপুর, কিশোরগঞ্জ, ফরিদপুর, সৈয়দপুর, সিলেট, ভোলার চরফ্যাসন, মানিকছড়িসহ দেশজুড়ে একযোগে বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়।
পঞ্চগড়ে নিখোঁজ খতিব উদ্ধার
গাজীপুরের টঙ্গী বিটিসিএল কলোনি জামে মসজিদের খতিব ও ইমাম মুহিবুল্লাহ মিয়াজী (৬৫) নিখোঁজ হওয়ার একদিন পর বৃহস্পতিবার সকালে পঞ্চগড়ে উদ্ধার হন। তাঁকে দুই পা শিকল দিয়ে বেঁধে একটি কলাগাছের সঙ্গে ফেলে রাখা হয়েছিল। স্থানীয় লোকজন তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেন।

গাজীপুরের টঙ্গী বিটিসিএল কলোনি জামে মসজিদের খতিব ও ইমাম মুহিবুল্লাহ মিয়াজী (৬৫) নিখোঁজ হওয়ার একদিন পর বৃহস্পতিবার সকালে পঞ্চগড়ে উদ্ধার হন। ছবিঃ সংগৃহীত
তিনি জানান, বাসা থেকে হাঁটতে বের হলে একটি অ্যাম্বুলেন্স থেকে চার-পাঁচজন তাকে জোরপূর্বক তুলে নেয়। তাদের মধ্যে কেউ বাংলাদেশি বলে মনে হয়নি, তাঁরা শুদ্ধ বাংলায় কথা বলছিলেন। চোখ বেঁধে তাকে মারধর করা হয়, পুরোনো অস্ত্রোপচারের জায়গাগুলোয় আঘাত করা হয় এবং মাকে নিয়ে অশালীন ভাষায় গালাগাল করা হয়। মোবাইলও ছিনিয়ে নেয়া হয়।
মুহিবুল্লাহ দাবি করেন, গত ১১ মাস ধরে তাকে বেনামি চিঠি পাঠিয়ে হুমকি দেওয়া হচ্ছিল। এসব চিঠিতে ইসকনের পক্ষ নেওয়া, অখণ্ড ভারত সমর্থন এবং ইসলাম ও কোরআন নিয়ে কথা না বলার মতো নির্দেশ দেওয়া হয়।
ঘটনার পর পঞ্চগড়ে ‘ঈমান আকিদা রক্ষা কমিটি’ নামে একটি সংগঠন বিক্ষোভ ও সমাবেশ করে ইসকন নিষিদ্ধের দাবি তোলে। কিন্তু তারা এখনও ইসকনের সাথে এই অপহরণের কোন সম্পৃক্ততার প্রমাণ দেখাতে পারে নি।
অপরদিকে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দাবি উঠেছে যে অ্যাম্বুলেন্সে খতিবকে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল সেই অ্যাম্বুলেন্স উদ্ধার করে আসল ঘটনা বের করা হোক।
ইসকন কী এবং তারা কি কাজ করে
ইসকনের পূর্ণরূপ International Society for Krishna Consciousness। ১৯৬৬ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এসি ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত। সংগঠনটি গৌড়ীয় বৈষ্ণব মতবাদ প্রচার করে এবং ভগবৎ গীতা ও ভাগবত পুরাণকে তাদের আধ্যাত্মিক মূল ভিত্তি হিসেবে মানে। বর্তমানে তাদের ৫০০-র বেশি কেন্দ্র, অসংখ্য মন্দির, স্কুল ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। প্রধান কেন্দ্র পশ্চিমবঙ্গের মায়াপুরে।

ইসকনের প্রতিষ্ঠাতা অভয়া চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী ‘প্রভুপাদ’- ফাইল ছবি
ধর্মীয় গবেষকদের মতে, ইসকন হিন্দুধর্মের বৈষ্ণব ধারার অংশ। তারা নিজেদেরকে শান্তিপূর্ণ ধর্মীয় সংগঠন হিসেবে দাবি করে এবং মানবসেবা, ত্রাণ কার্যক্রম ও নিরামিষ জীবনযাপনের প্রচার করে।
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে ইসকনের কার্যক্রম নিয়ে তর্ক-বিতর্ক বেড়েছে। কেউ একে ধর্মীয় মৌলবাদী সংগঠন বলছে, আবার সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে তারা শুধু সনাতনী মূল্যবোধ রক্ষা ও সংখ্যালঘুদের অধিকার নিয়ে কাজ করে।
ইসকন বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক চারু চন্দ্র দাস ব্রহ্মচারী বলেছেন, তারা শান্তিপূর্ণ ধর্মচর্চা ও মানবিক কাজে নিয়োজিত। সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষা, মানবকল্যাণমূলক কার্যক্রম এবং সম্প্রীতি বজায় রাখাই তাদের লক্ষ্য। সরকারের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো যদি মনে করে কোনো অভিযোগের সত্যতা আছে, তাহলে তা তদন্ত করবে।