বিশ্ব

জাতিসংঘ বিলুপ্ত হলে বিশ্বব্যবস্থা কীভাবে বদলে যাবে?

  • 1:44 pm - November 12, 2025
  • পঠিত হয়েছে:৬৯ বার
জাতিসংঘের পতাকা। ছবি: রয়টার্স

মেলবোর্ন, ১২ নভেম্বর- ৮০ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত জাতিসংঘ বিগত দশকগুলোতে বৈশ্বিক শান্তি, স্বাস্থ্য, আইন, ও মানবিক সহায়তার প্রতীক হিসেবে কাজ করেছে। বিশ্বব্যাপী সংঘাত মোকাবিলা, শরণার্থী সুরক্ষা, ও মানবাধিকার রক্ষায় সংস্থাটির ভূমিকা ঐতিহাসিক।
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এর কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। বিশেষ করে-

গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসন রোধে ব্যর্থতা,রয়ান্ডা, বসনিয়া ও দারফুরে গণহত্যা ঠেকাতে অক্ষমতা,নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের ওপর কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নিতে না পারা-
এসব কারণে জাতিসংঘ এখন সমালোচনার কেন্দ্রে।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের রিফিউজি স্টাডিজ সেন্টারের গবেষক জেফ ক্রিসপ বলেন, “যদি শুক্রবার জাতিসংঘ বিলুপ্ত হয়, তবে সোমবারের মধ্যেই বিশ্ব এটিকে পুনর্গঠনের চেষ্টা শুরু করবে।”

তিনি মনে করেন, শরণার্থী সংকট এমন একটি সমস্যা যা কোনো রাষ্ট্র একা মোকাবিলা করতে পারে না। বর্তমানে বিশ্বে প্রায় ১০ কোটি শরণার্থী ও বাস্তুচ্যুত মানুষ রয়েছে। জাতিসংঘের অনুপস্থিতিতে এই মানুষগুলো অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে, খাদ্য ও চিকিৎসা সহায়তা বন্ধ হয়ে যাবে, শহরাঞ্চলে নতুন সামাজিক চাপ সৃষ্টি হবে, আর অনেকে অনিরাপদ পথে ইউরোপে পাড়ি দিতে বাধ্য হবে।

তিনি আরও সতর্ক করেন, জাতিসংঘ না থাকলে রাষ্ট্রগুলোর শরণার্থী নীতির ওপর কোনো আন্তর্জাতিক জবাবদিহি থাকবে না। ফলে মানবিক সংকট আরও গভীর হবে।

সাবেক আন্তর্জাতিক প্রসিকিউটর জিওফ্রে নাইস বলেন, “জাতিসংঘ বিলুপ্ত হলেও আন্তর্জাতিক আইন টিকে থাকবে, কিন্তু তার প্রয়োগ হবে অনিয়মিত ও রাজনৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রিত।”

তিনি জানান, জাতিসংঘ দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক প্রভাব হারাচ্ছে। এর তহবিলের বড় অংশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসে, যা বন্ধ হলে আন্তর্জাতিক আদালত ও মানবাধিকার কাঠামো ভেঙে পড়তে পারে।
নাইস মনে করেন, এক্ষেত্রে আমরা “সিল করা সীমানা” ও “ওয়েস্টফালিয়ান সার্বভৌমত্বে” ফিরে যাব-যেখানে প্রতিটি রাষ্ট্র নিজের আইন ও ক্ষমতাকেই প্রাধান্য দেবে, ফলে বৈশ্বিক ন্যায়বিচার হবে অকার্যকর।

জাতিসংঘের সাবেক সহকারী মহাসচিব রমেশ ঠাকুর মনে করেন, “জাতিসংঘ ছাড়া শান্তিরক্ষা মানেই দখলদারিত্ব।”
তিনি বলেন, দেশগুলো শান্তি মিশনে অংশ নিলেও তা বৈধতা পায় জাতিসংঘের অনুমোদনের মাধ্যমে। এ সংস্থা না থাকলে সেই বৈধতা হারিয়ে যাবে, ফলে শক্তিশালী দেশগুলো নিজেদের স্বার্থে একতরফা হস্তক্ষেপ করবে।
তিনি যোগ করেন, “আজ আমরা দেখছি, পুতিন ও নেতানিয়াহু বিনা ভয়ে সারা বিশ্বে ঘুরছেন। আইন প্রয়োগ না হলে আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার হাস্যকর হয়ে দাঁড়ায়।”

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সাবেক প্রধান বিজ্ঞানী সৌম্য স্বামীনাথন বলেন, “ডব্লিউএইচও বিলুপ্ত হলে বিশ্ব সঙ্গে সঙ্গে নতুন করে এমন একটি সংস্থা গড়ার চেষ্টা করবে।”

তিনি বলেন, নিম্ন আয়ের দেশগুলো ডব্লিউএইচওর ওপর নির্ভর করে ওষুধ, টিকা ও চিকিৎসা অনুমোদনের জন্য। এই সংস্থা না থাকলে কোটি মানুষ অনিরাপদ চিকিৎসা ও টিকার অভাবে মৃত্যুর মুখে পড়বে।
তাঁর মতে, ডব্লিউএইচও মহামারির প্রাথমিক সতর্কতা ব্যবস্থার মূল ভিত্তি। কোভিড–১৯ মহামারির সময় টিকা বণ্টনে এর হস্তক্ষেপ না থাকলে দরিদ্র দেশগুলো হয়তো কোনো টিকাই পেত না।

লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ইউএনআইএফআইএলের শান্তিরক্ষী বাহিনীর সদস্যদের টহল। ইসরায়েল সীমান্তবর্তী রামায়াহ গ্রামে। ছবি: এএফপি

নর্থ ক্যারোলাইনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক জেমস টমাস বলেন, “জাতিসংঘ, ডব্লিউএইচও ও ইউএসএআইডির মতো সংস্থাগুলো বিশ্ব কল্যাণের মেরুদণ্ড। এগুলো বিলুপ্ত হলে ছোট ছোট এনজিও হয়তো শূন্যতা পূরণের চেষ্টা করবে, কিন্তু তাদের পক্ষে সেই পরিসর ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা অসম্ভব।”
তিনি আরও বলেন, “জাতিসংঘের সহায়তা কাঠামোতে উপনিবেশিক মানসিকতা এখনো রয়ে গেছে, তবে এটিকে একেবারে বাদ দিলে আমরা আরও বিশৃঙ্খল ও খণ্ডিত এক বিশ্বে পড়ব।”

জাতিসংঘ নিখুঁত নয়, কিন্তু এর বিকল্পও বাস্তবে নেই। এই সংস্থার অনুপস্থিতিতে মানবিক সহায়তা, স্বাস্থ্যব্যবস্থা, শরণার্থী সুরক্ষা, আন্তর্জাতিক আইন ও শান্তি রক্ষা সবই এক অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যাবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জাতিসংঘ বিলুপ্ত হলে পৃথিবী দ্রুতই নতুন করে এমন একটি কাঠামো গঠনের চেষ্টা করবে, কারণ বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একক রাষ্ট্র নয়, সমন্বিত আন্তর্জাতিক সহযোগিতাই মানবজাতির একমাত্র ভরসা।

সুত্রঃ আল–জাজিরা

এই শাখার আরও খবর

আগ্নেয়গিরির ছাইয়ে ঢেকে গেছে আকাশ, জাকার্তায় স্থগিত ৩০১ ফ্লাইট

ইন্দোনেশিয়ার আনাক ক্রাকাতাও আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতে আকাশে ছড়িয়ে পড়েছে বিপুল পরিমাণ ছাই। এর প্রভাবে রাজধানী জাকার্তার সুকর্ণো-হাত্তা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিমান চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। আগ্নেয় ছাইয়ের…

মণিপুরে যৌথ অভিযানে দুই সশস্ত্র সদস্য নিহত, আহত দুই

মণিপুরের চূড়াচাঁদপুর জেলায় ভারতীয় সেনাবাহিনী ও আসাম রাইফেলসের যৌথ অভিযানে ইউনাইটেড কুকি ন্যাশনাল আর্মির (ইউকেএনএ) দুই সদস্য নিহত হয়েছেন। এ সময় আরও দুজন আহত হয়েছেন…

নড়াইলে ৬ শিশুছাত্রকে ধর্ষণের অভিযোগ, মাদরাসাশিক্ষক গ্রেপ্তার

নড়াইল সদর উপজেলায় ছয় শিশুছাত্রকে ধর্ষণের অভিযোগে এক মাদরাসাশিক্ষককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এক ভুক্তভোগী শিশুর মায়ের করা মামলার পর গাজীপুর মেট্রোপলিটন এলাকার গাছা থানা থেকে…

দিল্লিতে পাঁচতলা ভবন ধস, পেইং গেস্ট পড়ুয়াদের আটকে পড়ার আশঙ্কা

দিল্লির দক্ষিণ-পশ্চিম এলাকায় হঠাৎ ধসে পড়েছে পাঁচতলা একটি আবাসিক ভবন। ধ্বংসস্তূপের নিচে বেশ কয়েকজন আটকে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছে…

তিন দশক পরও সালমান শাহকে ঘিরে আগ্রহের রহস্য কী?

“আমার জীবনের একটা বড় আফসোসের জায়গা হলো সালমান শাহকে নিজের চোখে দেখতে না পারা। উনি বেঁচে থাকলে অবশ্যই গিয়ে দেখা করতাম। এতটা ভালো লাগে সালমান…

অর্থনৈতিক যুদ্ধ মোকাবিলায় টাস্কফোর্স গঠন করল ইরান

চলমান সংঘাতের কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধ’ টাস্কফোর্স গঠন করেছে ইরান। অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে যুদ্ধের প্রভাব দ্রুত শনাক্ত করে তা মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au