মেলবোর্ন, ৫ জানুয়ারি: মাসের পর মাস ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার পর যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলায় এক নাটকীয় ও বৃহৎ সামরিক অভিযান চালিয়ে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে গভীর রাতে আটক করে দেশটির বাইরে নিয়ে যায়। এই অভিযানে দক্ষিণ আমেরিকার দেশটি চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। নিউইয়র্কে সন্ত্রাসবাদ ও মাদক পাচারের মামলায় এখন মাদুরোর বিচার হওয়ার কথা।
এই অভিযানের বৈধতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রকৃত উদ্দেশ্য, বিশেষ করে ভেনেজুয়েলার বিপুল তেলসম্পদ নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগ্রহ, নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র প্রশ্ন উঠেছে।
কীভাবে অভিযানটি পরিচালিত হয়?
যুক্তরাষ্ট্র এই অভিযানের নাম দেয় ‘অপারেশন অ্যাবসোলিউট রিজলভ’। এটি ছিল মাসব্যাপী পরিকল্পনার ফল। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ ও সেনাবাহিনী দীর্ঘদিন ধরে মাদুরোর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছিল। ডেল্টা ফোর্সসহ বিশেষ বাহিনী মাদুরোর নিরাপদ বাসভবনের হুবহু একটি প্রতিরূপ তৈরি করে সেখানে অনুশীলন চালায়।

ডোনাল্ড ট্রাম্প সিআইএ পরিচালক জন র্যাটক্লিফ এবং মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর পাশে বসে ভেনেজুয়েলায় শনিবারের সামরিক অভিযান সরাসরি পর্যবেক্ষণ করছেন।
(@realDonaldTrump/Truth Social)
শুক্রবার রাত প্রায় ১১টায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অভিযান শুরুর নির্দেশ দেন। জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন জানান, এই অভিযানে ২০টি ঘাঁটি থেকে ১৫০টির বেশি বিমান উড্ডয়ন করে, যার মধ্যে ছিল এফ-৩৫ ও এফ-২২ যুদ্ধবিমান এবং বি-১ বোমারু বিমান।
কারাকাসসহ বিভিন্ন এলাকায় সামরিক স্থাপনায় হামলা চালানো হয়। মূল লক্ষ্য ছিল ফুয়ের্তে তিউনা, যা ভেনেজুয়েলার সামরিক কৌশলগত কেন্দ্র এবং যেখানে মাদুরোর নিরাপদ ঘাঁটি ছিল।
শনিবার ভোর ২টার দিকে মার্কিন সেনারা সেখানে পৌঁছায় এবং মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী আত্মসমর্পণ করেন। ভোর ৩টা ২০ মিনিটে হেলিকপ্টারে করে তাঁদের দেশ ছাড়ানো হয়।
ভেনেজুয়েলা সরকার জানিয়েছে, কারাকাস, লা গুয়াইরা, মিরান্ডা ও আরাগুয়া প্রদেশে হামলায় সেনা সদস্য, বেসামরিক মানুষ এবং মাদুরোর নিরাপত্তা বাহিনীর বহু সদস্য নিহত হয়েছেন। কিউবা দাবি করেছে, তাদের অন্তত ৩২ জন কর্মকর্তা এই অভিযানে নিহত হয়েছেন।
কেন মাদুরোকে আটক করল যুক্তরাষ্ট্র?
ডোনাল্ড ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতা থেকে সরাতে চাইছিলেন এবং দেশটির বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগের পরিকল্পনার কথা প্রকাশ্যে বলে আসছিলেন। এই চাপ প্রয়োগের কৌশল শুরু হয় গত আগস্টে, যখন মাদুরোর মাথার দাম হিসেবে ৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার পুরস্কার ঘোষণা করা হয়।
এরপর যুক্তরাষ্ট্র পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগর ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে মাদক পাচারের অভিযোগে জড়িত নৌযানগুলোর বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী হামলা চালাতে শুরু করে। একই সঙ্গে দক্ষিণ আমেরিকার উপকূলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি ক্রমেই বাড়তে থাকে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ডও সেখানে মোতায়েন করা হয়।

মার্কিন নৌবাহিনীর বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস ফোর্ড ক্যারিবীয় সাগরে মোতায়েন রয়েছে, যেখানে রয়েছে অসংখ্য উন্নত যুদ্ধবিমান।
(US Navy: Seaman Abigail Reyes via Reuters)
পেন্টাগনের ভাষায়, এসব ছিল “সংগঠিত অপরাধী নার্কো-সন্ত্রাসীদের” বিরুদ্ধে অভিযান। যুক্তরাষ্ট্র অভিযোগ করেছে, ভেনেজুয়েলা রাষ্ট্রীয়ভাবে মাদক পাচারে জড়িত এবং “কার্টেল অব দ্য সানস”সহ কুখ্যাত অপরাধী গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন দিচ্ছে, যাকে তারা গত বছর একটি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করে।
তবে মাদুরো সব সময়ই দাবি করে আসছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের আসল লক্ষ্য তাকে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করা এবং দেশের বিপুল তেলসম্পদ দখল করা। ওয়াশিংটনও বলে এসেছে, তারা ২০১৩ সাল থেকে ক্ষমতায় থাকা মাদুরোকে ভেনেজুয়েলার বৈধ প্রেসিডেন্ট হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না।
হুগো চাভেজের উত্তরসূরি হিসেবে ক্ষমতায় আসার পর থেকে মাদুরো কঠোর হাতে দেশ শাসন করেছেন। ২০২৪ সালের নির্বাচন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ও বিরোধীদের কাছে ব্যাপকভাবে ভুয়া বলে বিবেচিত হলেও ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে তিনি তৃতীয় মেয়াদে শপথ নেন।
৬৩ বছর বয়সী এই সমাজতান্ত্রিক নেতা দেশি-বিদেশি সমালোচকদের কাছে দীর্ঘদিন ধরেই একজন স্বৈরশাসক হিসেবে পরিচিত। তাঁর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক বিরোধীদের কারাবন্দি করা, নির্যাতন চালানো এবং সাজানো নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা আঁকড়ে রাখার অভিযোগ রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অভিযান কি আইনসম্মত ছিল?
ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের এই সামরিক অভিযানের বৈধতা নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি ঘনিষ্ঠ মিত্র দেশও ইঙ্গিত দিয়েছে যে এটি আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র সম্ভবত দাবি করবে যে তারা আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগ করেছে। জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ বলেছেন, ভেনেজুয়েলা চীন, রাশিয়া, ইরান এবং হিজবুল্লাহর মতো সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছিল।
ফক্স নিউজকে তিনি বলেন, “তারা যুক্তরাষ্ট্রে মাদক, অপরাধী ও অস্ত্র পাঠাচ্ছিল এবং প্রতিবেশী দেশগুলোতে আগ্রাসনের হুমকি দিচ্ছিল।”
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওও এই হামলাকে একটি আইন প্রয়োগকারী অভিযান হিসেবে বর্ণনা করেছেন, কোনো দীর্ঘমেয়াদি বিদেশি আগ্রাসন নয়। তিনি এই যুক্তি দেখিয়েই আগামভাবে মার্কিন কংগ্রেসকে অবহিত না করার সিদ্ধান্তের পক্ষে সাফাই দেন।
তবে জাতিসংঘের মানবাধিকার ও সন্ত্রাসবাদ বিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদক বেন সল এই ব্যাখ্যাকে “পুরোপুরি অর্থহীন” বলে মন্তব্য করেছেন।
এবিসি রেডিও ন্যাশনাল ব্রেকফাস্টকে তিনি বলেন, “এটি ছিল একটি উচ্চমাত্রার সামরিক অভিযান, যেখানে ভেনেজুয়েলার একাধিক সামরিক ঘাঁটি ও অন্যান্য লক্ষ্যবস্তুতে বোমাবর্ষণ করা হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, এই অভিযান জাতিসংঘ সনদের অধীনে শক্তি প্রয়োগের ওপর যে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, তা সরাসরি লঙ্ঘন করেছে। তার মতে, এটি একটি “সশস্ত্র হামলা”, যা ভেনেজুয়েলাকে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষার অধিকার দেয়। জাতিসংঘ সনদে বলা আছে, কোনো রাষ্ট্রই অন্য রাষ্ট্রের ভৌগোলিক অখণ্ডতা বা রাজনৈতিক স্বাধীনতার বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগ বা হুমকি দিতে পারে না।
ড. বেন সল আরও বলেন, এখানে “আন্তর্জাতিক আগ্রাসনের অপরাধও” সংঘটিত হয়েছে, কারণ কোনো দেশের নেতা যদি অন্য একটি দেশে আগ্রাসনের নির্দেশ দেন ও তা বাস্তবায়ন করেন, তা আন্তর্জাতিক অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়।
“এটি আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে একটি অপরাধ,” তিনি বলেন।
এই পরিস্থিতিতে ভেনেজুয়েলা ইস্যুতে জরুরি বৈঠকে বসতে যাচ্ছে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, মাদুরোকে মার্কিন বাহিনীর হাতে আটক করা একটি “বিপজ্জনক নজির” তৈরি করেছে।
তেলের ভূমিকা কতটা?
তেল নিয়ে কতটা বড় এই সংকট?
ভেনেজুয়েলার রয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রমাণিত তেল মজুত, প্রায় ৩০৩.২ বিলিয়ন ব্যারেল। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (IEA) হিসাবে, গত নভেম্বর দেশটি প্রতিদিন প্রায় ৮ লাখ ৬০ হাজার ব্যারেল তেল উৎপাদন করছিল। তবে এটি এক দশক আগের উৎপাদনের এক-তৃতীয়াংশেরও কম, কারণ অবকাঠামো ভেঙে পড়েছে এবং বিনিয়োগ বন্ধ ছিল।

ভেনেজুয়েলার রয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল মজুত, যা সৌদি আরব, ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের চেয়েও বেশি।
মাদুরো আটক হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার মাটির নিচ থেকে “বিপুল সম্পদ” তুলে নেবে।
সাংবাদিকদের তিনি বলেন,
“আমাদের সবচেয়ে বড় মার্কিন তেল কোম্পানিগুলো সেখানে যাবে, বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে, ভেঙে পড়া তেল অবকাঠামো ঠিক করবে এবং দেশটির জন্য অর্থ উপার্জন শুরু করবে।”
ডিফেন্স প্রায়োরিটিজের সাবেক সিনিয়র ফেলো রাজন মেনন এবিসি নিউজকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপের পেছনে মূল চালিকাশক্তি হলো ভেনেজুয়েলার তেল।
তার ভাষায়,
“ভেনেজুয়েলা এখন বিশ্ব উৎপাদনের মাত্র প্রায় ১ শতাংশ তেল উৎপাদন করে, কিন্তু পুরোনো অবকাঠামো আধুনিক করা গেলে সেটি অনেক বাড়ানো সম্ভব।”
তিনি আরও বলেন,
“ট্রাম্প বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র কিছু সময় ভেনেজুয়েলা চালাবে। এর মানে ঠিক কী, আমি জানি না। কিন্তু বাস্তবে বহুজাতিক করপোরেশনগুলো সেখানে ফিরবে, তেল উত্তোলন হবে, ভেনেজুয়েলানরাও আয় করবে, আর আমরাও করব। পরিকল্পনাটা যত অদ্ভুতই শোনাক, সেটাই মূলত।”
এই পদক্ষেপ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও তীব্র সমালোচনা হয়েছে। রিপাবলিকান কংগ্রেসওম্যান মার্জোরি টেইলর গ্রিন বলেন, এটি “আমেরিকা ফার্স্ট” নীতির সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
তিনি বলেন,
“যদি এটা সত্যিই মাদক-সন্ত্রাসী দমন ও আমেরিকানদের রক্ষার জন্য হতো, তাহলে ট্রাম্প প্রশাসন মেক্সিকান কার্টেলগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান চালাত।”
তার মতে,
“এটা সেই পুরোনো ওয়াশিংটন প্লেবুক, যা আমেরিকান জনগণের নয়, বরং বড় করপোরেশন, ব্যাংক ও তেল নির্বাহীদের স্বার্থ রক্ষা করে।”
ডেমোক্র্যাট সিনেটর ক্রিস মারফি বলেন, ভেনেজুয়েলা থেকে যে মাদক উৎপন্ন হয় তার বড় অংশ ইউরোপে যায়, যুক্তরাষ্ট্রে নয়।
“ফেন্টানিলই আমেরিকানদের হত্যা করছে, আর সেটা ভেনেজুয়েলা থেকে আসে না। ভেনেজুয়েলা কোকেন উৎপাদন করে, যার ৯০ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্রে আসে না,” তিনি বলেন।
তিনি আরও বলেন,
“আক্রমণের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আমরা দেখেছি ওয়াল স্ট্রিট ও জ্বালানি খাতের বিনিয়োগকারীরা ভেনেজুয়েলায় যাওয়ার পরিকল্পনা করছে, এই অভিযানের মাধ্যমে অর্থ উপার্জনের জন্য।”
ভেনেজুয়েলানদের প্রতিক্রিয়া
প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো আটক হওয়ার পর ভেনেজুয়েলার ভেতরে ও প্রবাসে থাকা ভেনেজুয়েলানদের মধ্যে মতামত স্পষ্টভাবে বিভক্ত হয়ে পড়েছে।

চিলির সান্তিয়াগোতে এক ব্যক্তি ভেনেজুয়েলার বিরোধী নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদোর ছবি তুলে ধরছেন।
(Reuters: Pablo Sanhueza)
গত মাসে জাতিসংঘের একটি অনুসন্ধানী মিশন জানায়, ভেনেজুয়েলার বলিভারিয়ান ন্যাশনাল গার্ড (জিএনবি) গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে রাজনৈতিক বিরোধীদের দমনে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ করেছে। এর মধ্যে ছিল নির্বিচার গ্রেপ্তার, যৌন সহিংসতা, নির্যাতন এবং বিক্ষোভ দমনের সময় পরিকল্পিত নিপীড়ন, যা ২০১৪ সাল থেকে মাদুরোর শাসনামলে ঘটেছে।
জাতিসংঘের হিসাবে, এসব অভিযোগের কারণে প্রায় ৮০ লাখ ভেনেজুয়েলান দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। তবে রাজধানী কারাকাসে অনেক মানুষ রাস্তায় নেমে মার্কিন হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেছে এবং আটক হওয়া নেতা মাদুরোর মুক্তি দাবি জানিয়েছে।
অন্যদিকে ৬৬ বছর বয়সী নির্মাণশ্রমিক ড্যানিয়েল মেডাল্লার মতো কেউ কেউ খুশি হলেও ভয় প্রকাশ করেছেন।
“আমরা এটা অনেক দিন ধরে চাইছিলাম,” তিনি বলেন, “কিন্তু এখনো ভয় আছে।”
অস্ট্রেলিয়ায়ও ভেনেজুয়েলান প্রবাসীরা রোববার বিক্ষোভে জড়ো হন। অনেকেই দূর থেকে এসব ঘটনা দেখতে গিয়ে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ও দ্বিধান্বিত অনুভূতির কথা বলেন।

রোববার কারাকাসে যুক্তরাষ্ট্রের হেফাজত থেকে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর মুক্তির দাবিতে আয়োজিত বিক্ষোভে এক সরকারপন্থী সমর্থক মাদুরোকে অবলম্বনে তৈরি ‘সুপার বিগোটে’ নামের একটি খেলনা মূর্তি ধরে রেখেছেন।
(AP Photo: Ariana Cubillos)
ভেনেজুয়েলান অ্যাসোসিয়েশন অব অস্ট্রেলিয়ার সভাপতি জেনেসিস লিন্ডস্ট্রম বলেন, খবর ছড়িয়ে পড়ার সময় তিনি পরিবারের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগে ছিলেন।
“সামরিক হস্তক্ষেপের গুজব আমরা অনেক দিন ধরেই শুনছিলাম,” তিনি বলেন, “কিন্তু হঠাৎ হোয়াটসঅ্যাপ ও সামাজিক মাধ্যমে হেলিকপ্টার উড়ার ভিডিও আর পরিবারের পাঠানো বার্তা দেখতে পাওয়া সত্যিই ভয়াবহ ছিল।”
অন্যদিকে মেক্সিকো সিটিতে বসবাসরত গ্লোরিয়া সোসা মাদুরো বিরোধী সমাবেশে আনন্দ প্রকাশ করেন।
“নার্কো-সরকার শেষ হয়ে গেছে। ভেনেজুয়েলার নার্কো-সরকারের পতন হয়েছে,” তিনি বলেন।
“আমরা আনন্দ ও স্বস্তি অনুভব করছি।”
তবে মাদুরোর কিছু সমর্থক যুক্তরাষ্ট্রের “হস্তক্ষেপবাদ” প্রত্যাখ্যান করে স্লোগান দিয়েছে এবং এই অভিযানের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
অন্য দেশগুলো কী বলছে?
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুক্তরাষ্ট্রের এই অভিযানে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। চ্যাথাম হাউসের পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী ব্রনওয়েন ম্যাডক্স বলেন, ট্রাম্প প্রশাসনের পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের সামনে একটি “নৈতিক ও কৌশলগত সংকট” তৈরি করেছে।
তার মতে,
“এর ফলাফল প্রকাশ পেতে সময় লাগবে। আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে স্পষ্ট বৈধতা না থাকার বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিপক্ষরা জোরালোভাবে তুলে ধরবে। রাশিয়া ইউক্রেনে আগ্রাসনের পক্ষে যুক্তি দাঁড় করাতে এই ঘটনাকে ব্যবহার করবে, আর চীন তাইওয়ান প্রসঙ্গে ভেনেজুয়েলার উদাহরণ টানতে পারে।”
স্পেন, ব্রাজিল, চিলি, কলম্বিয়া, মেক্সিকো ও উরুগুয়ে যৌথ বিবৃতিতে ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের “একতরফা সামরিক অভিযান” প্রত্যাখ্যান করেছে। রাশিয়ার নিরাপত্তা পরিষদের উপপ্রধান দিমিত্রি মেদভেদেভ এবং দেশটির এক জ্যেষ্ঠ আইনপ্রণেতা এই পদক্ষেপকে অবৈধ ও অস্থিতিশীলতাসৃষ্টিকারী বলে অভিহিত করেছেন।
অস্ট্রেলিয়ার প্রতিবেশী দেশ ইন্দোনেশিয়া, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়া যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ নিয়ে “গভীর উদ্বেগ” প্রকাশ করেছে। অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজও সতর্ক প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, সরকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।
তিনি এক্সে লিখেছেন,
“আমরা সব পক্ষকে সংলাপ ও কূটনীতির মাধ্যমে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার আহ্বান জানাই। ভেনেজুয়েলায় গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও মৌলিক স্বাধীনতা রক্ষার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে অস্ট্রেলিয়া দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বিগ্ন। আমরা আন্তর্জাতিক আইন এবং ভেনেজুয়েলার জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটায় এমন একটি শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক রূপান্তরের পক্ষে।”
তবে কিছু দেশ এই অভিযানে উল্লাসও প্রকাশ করেছে। আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলে এক্সে পোস্ট করে লিখেছেন, “দীর্ঘজীবী হোক স্বাধীনতা!” ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে “স্বাধীনতা ও ন্যায়ের পক্ষে সাহসী ও ঐতিহাসিক নেতৃত্বের” জন্য অভিনন্দন জানান।
ইউরোপের অনেক দেশ সরাসরি ওয়াশিংটনের সমালোচনা না করে শুধু আন্তর্জাতিক আইন মানার আহ্বান জানিয়েছে। কেউ কেউ আবার মাদুরোর পতনে স্বস্তি প্রকাশ করেছে।

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার (ডানে) বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপ নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তিনি সরাসরি ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলতে চান।
(Reuters: Leon Neal/Pool)
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার বলেন, মাদুরো আর প্রেসিডেন্ট না থাকায় তিনি দুঃখিত নন।
“যুক্তরাজ্য দীর্ঘদিন ধরেই ভেনেজুয়েলায় ক্ষমতার রূপান্তরের পক্ষে,” তিনি বলেন। “আমরা মাদুরোকে বৈধ প্রেসিডেন্ট মনে করতাম না, তার শাসনের অবসানে আমরা কোনো অশ্রু ঝরাচ্ছি না।”
গ্রিসের প্রধানমন্ত্রী কিরিয়াকোস মিৎসোতাকিস বলেন, এই শাসনের পতন ভেনেজুয়েলার জন্য “নতুন আশা” নিয়ে এসেছে। ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি যুক্তরাষ্ট্রের অভিযানকে বৈধ বলে উল্লেখ করে একে “প্রতিরক্ষামূলক হস্তক্ষেপ” হিসেবে বর্ণনা করেন।
তবে ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যঁ-নোয়েল বারো স্পষ্টভাবে মাদুরোকে আটক করাকে আন্তর্জাতিক আইনের “বলপ্রয়োগ না করার নীতি” লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করেন।
তিনি এক্সে লিখেছেন,
“ফ্রান্স আবারও স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে, কোনো দেশের ভবিষ্যৎ বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া যায় না। কেবল সেই দেশের সার্বভৌম জনগণই তাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে পারে।”
সামনে কী ঘটতে পারে?
যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ বলেছে, নিকোলাস মাদুরোর সরকার একটি বিশাল মাদক পাচার নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পরিচালিত হতো, যা হাজার হাজার টন কোকেন যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে পাচার করেছে। বর্তমানে মাদুরো নিউইয়র্কের ব্রুকলিনের একটি কড়া নিরাপত্তার কারাগারে আটক রয়েছেন এবং মাদক ও অস্ত্র পাচারের অভিযোগে বিচারের অপেক্ষায় আছেন।
তার আইনজীবীরা তার গ্রেপ্তারের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাদের যুক্তি হবে, একজন সার্বভৌম রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে মাদুরো আইনি দায়মুক্তি পান, যা আন্তর্জাতিক ও মার্কিন আইনের একটি মৌলিক নীতি। ডোনাল্ড ট্রাম্প আগেই বলেছিলেন, একটি “সঠিক ও ন্যায়সঙ্গত ক্ষমতা হস্তান্তর” না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র সাময়িকভাবে ভেনেজুয়েলা পরিচালনা করবে।
তবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও পরে স্পষ্ট করেন যে যুক্তরাষ্ট্র দেশটির দৈনন্দিন শাসনভার নেওয়ার কোনো পরিকল্পনা রাখছে না। এদিকে ভেনেজুয়েলার প্রতিরক্ষামন্ত্রী মাদুরোর মুক্তি দাবি করে বলেছেন, তিনিই এখনো দেশটির বৈধ প্রেসিডেন্ট। অপরদিকে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক সংকটে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করা ভেনেজুয়েলার সেনাবাহিনী মাদুরোর সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজের প্রতি সমর্থন ঘোষণা করেছে।
আটলান্টিক কাউন্সিলের কাউন্টার-টেররিজম প্রকল্পের প্রধান অ্যালেক্স প্লিটসাস বলেছেন, সবচেয়ে ভালো পরিস্থিতিতে এই সংকট শাসকগোষ্ঠীর ভেতরে “এলিটদের ভাঙন” ঘটাতে পারে।
তার ভাষায়, “আইনি ঝুঁকি, নিষেধাজ্ঞা এবং রাজনৈতিক আশ্রয় হারানোর ভয়ে সরকারের ভেতরের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা নিরাপদে দেশ ছাড়ার সুযোগ, সীমিত ক্ষমা বা তৃতীয় কোনো দেশে আশ্রয়ের বিনিময়ে বৈধভাবে নির্বাচিত বিরোধীদের হাতে ক্ষমতা তুলে দিতে পারে।”
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, এর বিপরীত চিত্র আরও ভয়াবহ হতে পারে।
“যদি শাসকগোষ্ঠীর অবশিষ্ট অংশ আলোচনায় না আসে এবং ভেঙে পড়ে, তাহলে ভেনেজুয়েলা দীর্ঘস্থায়ী গেরিলা সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে,” তিনি বলেন।
এই অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে অস্ট্রেলিয়া তাদের নাগরিকদের ভেনেজুয়েলা ভ্রমণ না করার পরামর্শ দিয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার স্মার্টট্রাভেলার ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, “গুরুতর নিরাপত্তা ঝুঁকি, সহিংস অপরাধ, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা এবং ইচ্ছামতো আটকের আশঙ্কার কারণে ভেনেজুয়েলায় ভ্রমণ করবেন না।”

ভেনেজুয়েলার কারাকাসসহ মিরান্ডা, আরাগুয়া ও লা গুয়াইরা প্রদেশের সামরিক স্থাপনায় একাধিক হামলার পর দেশে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে। নিরাপত্তা পরিস্থিতি অনিশ্চিত এবং আরও খারাপ হতে পারে। আশঙ্কার কারণে ভেনেজুয়েলায় ভ্রমণ না করার পরামর্শ অস্ট্রেলিয়ার সরকারের. (Smartraveller.gov.au/Venezuela)
লেখক: আনিকা বার্গেস, আহমেদ ইউসুফ (ABC News)
অনুবাদ ও রূপান্তর: OTN Bangla