বাংলাদেশের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের হবিগঞ্জের নেতা মাহদী হাসানকে ঘিরে গত কয়েক দিন ধরে সামাজিক মাধ্যমে তীব্র আলোচনা চলছে।
মেলবোর্ন, ২২ ফেব্রুয়ারি: বাংলাদেশের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের হবিগঞ্জ জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মাহদী হাসানকে ঘিরে গত কয়েক দিন ধরে সামাজিক মাধ্যমে তীব্র আলোচনা চলছে। প্রশ্ন একটাই—নিউ দিল্লিতে ঠিক কী ঘটেছিল তার সঙ্গে?
গতকাল বিবিসি বাংলা এ নিয়ে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করেছে। বিবিসি প্রতিবেদনে উঠে এসেছে নিউ দিল্লিতে কীভাবে ধরা খেলেন মাহদী হাসান?
বুধবার বিকেলে তিনি বাংলাদেশে ফিরে এসেছেন। তবে তার দিল্লি সফরের ঘটনাপ্রবাহ এখনো নানা প্রশ্ন আর বিতর্কের জন্ম দিচ্ছে।
মাসখানেক আগে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে শায়েস্তাগঞ্জ থানায় বসে প্রকাশ্যেই ওসি আবুল কালামকে হুমকি দিতে দেখা যায় মাহদী হাসানকে। ওই ভিডিওতে তিনি বানিয়াচং থানা পুড়িয়ে দেওয়া ও এসআই সন্তোষ চৌধুরীকে জ্বালিয়ে দেওয়ার দাবি করেন। এই বক্তব্য ঘিরে দেশজুড়ে তীব্র সমালোচনা শুরু হলে জানুয়ারিতে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। পরে তার সমর্থকদের বিক্ষোভের মুখে মুক্তি পেলেও সেই সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
এরই মধ্যে মাহদী হাসান পর্তুগালের ভিসা নিতে ভারতের রাজধানী দিল্লিতে যান। ভিসা প্রসেসিং সেন্টারে অপেক্ষার সময় কেউ তাকে চিনে ফেলে এবং ভিডিও ধারণ করে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়। এরপর থেকেই বিষয়টি ভারতের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর নজরে আসে।
বিবিসি বাংলার সঙ্গে কথা বলেছেন এমন দু’জন সূত্র, যারা পুরো ঘটনার সঙ্গে সরাসরি পরিচিত। তাদের শর্ত ছিল নাম প্রকাশ করা যাবে না। তারা জানিয়েছেন, মাহদী হাসানকে কোথাও শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়নি। তবে তাকে স্পষ্ট করে জানানো হয়েছে—ভারতবিরোধী বক্তব্য দেওয়া এবং একজন হিন্দু পুলিশ কর্মকর্তাকে হত্যার দাবি করা ব্যক্তিকে ভারতে অবস্থান করতে দেওয়া হবে না। তাকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়, নিজের দেশে ফিরে যাওয়াই তার জন্য একমাত্র পথ।
ঘটনাপ্রবাহ শুরু হয় মঙ্গলবার সকালে দিল্লির কনট প্লেসে একটি বেসরকারি ভিসা প্রসেসিং সেন্টারে। মাহদী হাসান সেখানে পর্তুগালের ভিসার জন্য আবেদন করতে গিয়েছিলেন। তার সঙ্গে ছিলেন এক নারী আত্মীয়। তারা উঠেছিলেন পাহাড়গঞ্জ এলাকার একটি হোটেলে। সেখানেই ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই বিভিন্ন অজানা নম্বর থেকে ফোন আসতে শুরু করে। এতে তিনি বুঝতে পারেন, কোথাও একটা গোলমাল হয়েছে।
সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ওই দিন দুপুরের পর তিনি পুরনো দিল্লির জামা মসজিদ এলাকায় যান। পরে কয়েকটি জায়গায় আশ্রয় খুঁজলেও কেউ তাকে থাকতে রাজি হয়নি। তাকে পরামর্শ দেওয়া হয় পাহাড়গঞ্জের হোটেল ছেড়ে বিমানবন্দরের কাছাকাছি এলাকায় উঠতে। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় তিনি হোটেল বদলান এবং রাতেই দিল্লি-ঢাকা ইন্ডিগোর টিকিট তার হাতে পৌঁছে দেওয়া হয়।
একই সময় ভারতের কর্মকর্তারা খোঁজ নিতে থাকেন—যিনি প্রকাশ্যে ভারতবিরোধী বক্তব্য দিয়েছেন, তিনি কীভাবে ভারতীয় ভিসা পেলেন। সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, তার ভিসা পরে বাতিল করা হয়, যদিও সে খবর তিনি তাৎক্ষণিকভাবে জানতে পারেননি।
বুধবার সকালে বিমানবন্দরে গিয়ে চেক-ইন সম্পন্ন করার পর নিরাপত্তা চেকিংয়ের সময় তাকে আলাদা করে ডেকে নেওয়া হয়। সেখানে বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তারা শান্তভাবে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। প্রায় আধঘণ্টা ধরে চলা এই জেরায় কোনো ধরনের শারীরিক নির্যাতন হয়নি বলে সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে।
সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, ভারতের কর্মকর্তাদের তিনটি বিষয় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়—ভারতবিরোধী বক্তব্য, প্রকাশ্যে একজন পুলিশ কর্মকর্তাকে হত্যার দাবি, এবং বিশেষ করে ওই কর্মকর্তা হিন্দু হওয়ায় বিষয়টি আরও স্পর্শকাতর হয়ে ওঠে। তাদের মতে, এসব অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তাকে ভারত হয়ে অন্য দেশে যেতে দেওয়া যায় না।
শেষ পর্যন্ত দিল্লি থেকেই তাকে দেশে ফিরে যেতে বলা হয়। বুধবার দুপুরের ফ্লাইটে তিনি ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন।
বাংলাদেশে ফেরার পর বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের প্রশ্নে মাহদী হাসান বলেন, তাকে “বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নেতা হিসেবে আটক করা হয়েছে” এবং তিনি হয়রানির শিকার হয়েছেন। তার দাবি, তিনি জীবনের ঝুঁকিতে ছিলেন। তবে ভারতে তার কাছে ক্রিপ্টোকারেন্সি পাওয়া গেছে—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি একে “গুজব” বলে উড়িয়ে দেন।
বাংলাদেশে পৌঁছেও তাকে এক দফা জিজ্ঞাসাবাদের মুখে পড়তে হয় বলে জানান মাহদী হাসান। পরে অবশ্য তাকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়।
বিবিসি বাংলার পক্ষ থেকে দু’দিন ধরে তার বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সরাসরি তার সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।
– বিবিসি বাংলা