বাংলাদেশ

দেউলিয়া পরিস্থিতি

বিদ্যুৎ খাতে ৪৫ হাজার কোটি টাকার বকেয়া, গরমে বাড়তে পারে সংকট

  • 11:17 pm - February 23, 2026
  • পঠিত হয়েছে:১১৬ বার
বিদ্যুৎ খাতে ৪৫ হাজার কোটি টাকার বকেয়া, গরমে বাড়তে পারে সংকট। ছবিঃ সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ২৩ ফেব্রুয়ারি- বিদ্যুৎ খাতে দেশি-বিদেশি কোম্পানির কাছে প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা বকেয়া নিয়ে নতুন সরকার বড় ধরনের আর্থিক ও জ্বালানি সংকটের মুখে পড়েছে। রমজানের পরপরই সেচ মৌসুম ও গ্রীষ্মকালে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়বে। সেই বাড়তি চাহিদা অনুযায়ী নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা এখন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বর্তমানে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১৩ হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি। বিদ্যুৎ বিভাগের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছরে সর্বোচ্চ চাহিদা ১৮ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছাতে পারে। কিন্তু উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও জ্বালানি আমদানি ও অর্থসংস্থানের সীমাবদ্ধতা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, বিদ্যুৎ পরিস্থিতি সামাল দিতে গ্যাস, কয়লা ও তেলভিত্তিক কেন্দ্র চালু রাখতে হবে। তবে বড় সমস্যা হচ্ছে আর্থিক সংকট। তাঁর ভাষায়, বিদ্যুৎ খাত প্রায় দেউলিয়া অবস্থায় রয়েছে। বিপুল পরিমাণ বকেয়া ও দেনা পরিশোধ করতে না পারায় জটিলতা তৈরি হয়েছে। তিনি জানান, পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে অর্থসংস্থান করে এক ধরনের সংকট ব্যবস্থাপনার পথে হাঁটতে হবে।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিদ্যুৎ খাতে মোট বকেয়া দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনাকারী বেসরকারি কোম্পানিগুলোর কাছে বকেয়া প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা। উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, গত সাত-আট মাস ধরে তারা নিয়মিত বিল পাচ্ছেন না।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ রেজাউল করীম বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ভর্তুকি ও রাজস্ব ঘাটতির কারণে বকেয়া বেড়েছে। সরকার থেকে যে ভর্তুকি পাওয়া যায় তা চাহিদার তুলনায় কম। ফলে ধীরে ধীরে দেনা জমে বর্তমান অবস্থায় এসেছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সরকার থেকে অতিরিক্ত ভর্তুকি পেলে কিছুটা চাপ কমবে।

বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদকদের সংগঠন বিপপা জানিয়েছে, দ্রুত বকেয়া পরিশোধ না করলে গরমকালে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন কঠিন হবে। তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো নিজেরাই অধিকাংশ জ্বালানি আমদানি করে। এলসি খোলার পর তেল দেশে পৌঁছাতে ৪০ থেকে ৪৫ দিন সময় লাগে। এলসি খোলায় জটিলতার কারণে তেলের নিট মজুদও কমে এসেছে। জানুয়ারিতে যেখানে মজুদ ছিল এক লাখ মেট্রিক টনের বেশি, ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি তা নেমে আসে প্রায় ৮০ হাজার টনে।

এদিকে চুক্তি অনুযায়ী সময়মতো বিদ্যুৎ সরবরাহ না করতে পারায় বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর ওপর লিকুইডিটি ড্যামেজ ধার্য করেছে। তবে এ নিয়ে আপত্তি তুলেছেন বেসরকারি উদ্যোক্তারা। চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, বিষয়টি আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা চলছে।

বাংলাদেশে বর্তমানে ১৩৬টি সরকারি-বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র ও আমদানি সক্ষমতা মিলিয়ে মোট স্থাপিত উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ২৮ হাজার ৯১৯ মেগাওয়াট। দেশে গ্রাহক সংখ্যা প্রায় ৪ কোটি ৯৪ লাখ। সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছিল ২০২৫ সালের ২৩ জুলাই, সেদিন উৎপাদন হয় ১৬ হাজার ৭৯৪ মেগাওয়াট।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, সংকটের মূল কারণ প্রাথমিক জ্বালানির ঘাটতি ও ডলার সংকট। মোট উৎপাদনের প্রায় ৮৮ শতাংশ বিদ্যুৎ গ্যাস, কয়লা ও তেলের ওপর নির্ভরশীল। এসব জ্বালানির বড় অংশ আমদানি করতে হয়। দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ায় এলএনজি আমদানি বাড়াতে হচ্ছে। তেল ও কয়লাও প্রায় পুরোপুরি আমদানিনির্ভর।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন বলেন, গরম শুরু হলে লোডশেডিং বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তিনি হিসাব তুলে ধরে বলেন, বছরে সব জ্বালানি আমদানি করতে ১৩ থেকে ১৫ বিলিয়ন ডলার লাগে। ক্যাপাসিটি পেমেন্টসহ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে মোট ব্যয় প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এত বড় অঙ্কের ডলার জোগান দেওয়া কঠিন।

তিনি আরও বলেন, কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা পুরোপুরি ব্যবহার করা যাচ্ছে না। অনেক কেন্দ্র ৫৫ শতাংশ লোড ফ্যাক্টরে চলছে, যেখানে ৮৫ শতাংশ পর্যন্ত চালানো সম্ভব। তবে এর জন্যও বাড়তি কয়লা আমদানি প্রয়োজন। অর্থ মন্ত্রণালয় তেলভিত্তিক উৎপাদনে ভর্তুকির সীমা বেঁধে দিতে পারে বলেও তিনি ধারণা দেন।

ভোক্তা অধিকার সংস্থা ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা ড. এম শামসুল আলম মনে করেন, বিদ্যুৎ খাতে অনিয়ম ও দুর্নীতিই বর্তমান সংকটের মূল কারণ। তাঁর মতে, তেলভিত্তিক কেন্দ্র কমিয়ে কয়লাভিত্তিক উৎপাদন বাড়ালে বড় অঙ্কের সাশ্রয় সম্ভব। তবে ড. ইজাজ হোসেন বলেন, পিক আওয়ারে চাহিদা মেটাতে কিছু তেলভিত্তিক কেন্দ্র চালু রাখা জরুরি।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা ইকবাল হাসান মাহমুদ জানান, আপাতত রমজান ও সেচ মৌসুমে বিদ্যুৎ সরবরাহ সচল রাখাই সরকারের অগ্রাধিকার। বকেয়া কোম্পানিগুলোকে আংশিক পরিশোধ করে কেন্দ্রগুলো চালু রাখা হবে। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পরিকল্পনাও নেওয়া হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বিদ্যুৎ খাতকে টেকসই করতে হলে ভর্তুকি কাঠামো পুনর্বিবেচনা, জ্বালানি উৎসের বৈচিত্র্য, ব্যয় কমানো এবং আর্থিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার মতো বহুমাত্রিক পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায় গ্রীষ্মকালে লোডশেডিং ও শিল্প উৎপাদনে ব্যাঘাতের ঝুঁকি থেকে যাবে।

 

এই শাখার আরও খবর

ঠাকুরগাঁও থেকে একসঙ্গে নিখোঁজ চার ছাত্রী সিলেটে উদ্ধার, যাচ্ছিল কোথায়

মেলবোর্ন,২ জুলাই- ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গী উপজেলা থেকে একসঙ্গে নিখোঁজ হওয়া চার স্কুলছাত্রীকে সিলেট থেকে উদ্ধার করেছে পুলিশ। প্রাইভেট পড়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হওয়ার একদিন পর…

কাগজের বদলে ডিজিটাল ট্রেড ডকুমেন্ট, শুরু হলো নতুন যুগ

মেলবোর্ন,২ জুলাই- দেশের বৈদেশিক বাণিজ্য ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক, দ্রুত ও দক্ষ করতে এলসি (লেটার অব ক্রেডিট) এবং আমদানি-রপ্তানি সংক্রান্ত কাগজপত্র ডিজিটালভাবে পরিচালনার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।…

মেক্সিকোয় বিশ্বকাপ খেলার জয় উদযাপনের সময় তিনজনের মৃত্যু

মেলবোর্ন,২ জুলাই-  বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে ইকুয়েডরের বিপক্ষে মেক্সিকোর জয় উদযাপন করতে গিয়ে রাজধানী মেক্সিকো সিটিতে শ্বাসরোধে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। বিপুলসংখ্যক সমর্থকের ভিড়ে দম বন্ধ হয়ে…

ইউক্রেন যুদ্ধের গোপন নথি ফাঁস, মিলল চাঞ্চল্যকর তথ্য

মেলবোর্ন,২ জুলাই- ইউক্রেন যুদ্ধকে ঘিরে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে ফাঁস হওয়া একাধিক গোপন সামরিক নথি। বার্তাসংস্থার হাতে আসা নথি এবং দুই ইউরোপীয় কর্মকর্তার তথ্য…

এইচএসসি পরীক্ষা শুরু বৃহস্পতিবার, সব শিক্ষা বোর্ডে একই প্রশ্নপত্র

মেলবোর্ন,১ জুলাই- আগামীকাল বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) সারা দেশে একযোগে শুরু হচ্ছে ২০২৬ সালের উচ্চ মাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমানের পরীক্ষা। এবার দেশের সব সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে…

এনসিপির কয়েক নেতার বিরুদ্ধে ৮ মাসের হোটেল ভাড়া বকেয়ার অভিযোগ

মেলবোর্ন,১ জুলাই- রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ এলাকার আবাসিক ইয়ামেনী ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড হোটেলে প্রায় আট মাস অবস্থান করে ভাড়া পরিশোধ না করার অভিযোগ উঠেছে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি)…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au