জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান (ছবি: সংগৃহীত)
মেলবোর্ন, ১০ মার্চ- জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির মো. শফিকুর রহমান তাঁর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক মোহাম্মদ মাহমুদুল হাসানকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পদায়নের প্রস্তাব দিয়েছেন। মন্ত্রীর পদমর্যাদায় তাঁকে মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব দেওয়ার জন্য পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ জানানো হয়েছে। বিরোধীদলীয় নেতার মতে, এ ধরনের পদায়নের মাধ্যমে জাতীয় সংসদের বিরোধী দলের পররাষ্ট্রনীতিসংক্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গি সরকারের কাছে তুলে ধরা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারসাম্য বজায় রাখা সম্ভব হবে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক কর্মকর্তা বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, গত ২২ ফেব্রুয়ারি বিরোধীদলীয় নেতার দপ্তর থেকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এ বিষয়ে একটি চিঠি পাঠানো হয়। ওই চিঠিতে অধ্যাপক মোহাম্মদ মাহমুদুল হাসানকে মন্ত্রীর পদমর্যাদায় মন্ত্রণালয়ে পদায়নের সুপারিশ করা হয়।
চিঠিতে বলা হয়, অধ্যাপক মাহমুদুল হাসান বিরোধীদলীয় নেতার পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। মূলধারার বিভিন্ন রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে তাঁর পেশাগত যোগাযোগ ও কূটনৈতিক দক্ষতার মাধ্যমে তিনি জাতিসংঘ, কমনওয়েলথ, আসিয়ান আঞ্চলিক ফোরাম, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ এশিয়া, আফ্রিকা, ওশেনিয়া, আমেরিকা এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারে কাজ করেছেন বলে উল্লেখ করা হয়। বিরোধীদলীয় নেতা তাঁর চিঠিতে বলেন, ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা এবং দেশের পররাষ্ট্রনীতি সমন্বয়ের স্বার্থে এই পদায়নের বিষয়টি সরকারের বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
প্রস্তাবটি ‘নতুন’ ও ‘অভিনব’ উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করে বিরোধীদলীয় নেতা মনে করেন, এতে জাতীয় সংসদের বিরোধী দল পররাষ্ট্রনীতি সংক্রান্ত নিজেদের মতামত সরকারকে উপস্থাপন ও পর্যালোচনার সুযোগ পাবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের সম্পর্ক ব্যবস্থাপনায় ভারসাম্য রক্ষায়ও এটি ভূমিকা রাখতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তবে এ ধরনের পদায়ন নিয়ে কূটনৈতিক মহলে ভিন্নমত রয়েছে। সাবেক একাধিক পররাষ্ট্রসচিবসহ পেশাদার কূটনীতিকেরা বলছেন, বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামোয় বিরোধী দলের কাউকে সরাসরি কোনো মন্ত্রণালয়ে পদায়নের নজির নেই। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশেও এমন উদাহরণ খুব একটা দেখা যায় না। অনেক দেশে বিরোধী দল ছায়া মন্ত্রিসভার মাধ্যমে নীতিগত সমালোচনা বা বিকল্প প্রস্তাব তুলে ধরে থাকে। আবার প্রতিবেশী ভারত বা পাকিস্তানের মতো দেশে বড় সংকটের সময় সব রাজনৈতিক দল একসঙ্গে কাজ করার নজির থাকলেও মন্ত্রণালয়ের কাঠামোর ভেতরে বিরোধী দলের কাউকে দায়িত্ব দেওয়ার ঘটনা খুবই বিরল।
সাবেক ও বর্তমান কূটনীতিকদের মতে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রাষ্ট্রের অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি প্রতিষ্ঠান। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ ও আলোচনার ক্ষেত্রে দেশের স্বার্থ, সরকারের অগ্রাধিকার এবং ক্ষমতাসীন দলের নীতিগত অবস্থান বিবেচনায় নিয়ে কাজ করতে হয়। এমন পরিস্থিতিতে বিরোধী দলের কাউকে মন্ত্রণালয়ের কাঠামোর ভেতরে যুক্ত করা হলে প্রশাসনিক সমন্বয় ও নীতিগত অবস্থান নিয়ে জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকতে পারে।
এদিকে চিঠি পাঠানোর বিষয়টি নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকেও ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। দলটির আমির শফিকুর রহমানের একান্ত সচিব মো. নজরুল ইসলাম জানান, অধ্যাপক মাহমুদুল হাসান চিঠির বিষয়টি আগে আমিরকে অবহিত করেছিলেন এবং তিনি মৌখিকভাবে সম্মতিও দিয়েছিলেন। তবে মন্ত্রীর পদমর্যাদা দেওয়ার বিষয়টিতে আমিরের সম্মতি ছিল না। বিষয়টি পরে জানতে পেরে শফিকুর রহমান মাহমুদুল হাসানের সঙ্গে কথা বলেন।
নজরুল ইসলাম আরও জানান, পরবর্তীতে অধ্যাপক মাহমুদুল হাসানকে ওই দায়িত্ব থেকে সরিয়ে ঢাকা-১৪ আসনের সংসদ সদস্য মীর আহমাদ বিন কাসেমকে বিরোধীদলীয় নেতার নতুন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে পররাষ্ট্র সচিবকেও অবহিত করা হয়েছে বলে তিনি জানান।
এ বিষয়ে সাবেক কূটনীতিক এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্ট এম হুমায়ূন কবীর বলেন, রাষ্ট্র পরিচালনা সরকারের দায়িত্ব এবং পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনাও সরকারের মাধ্যমেই হয়ে থাকে। বিরোধী দল পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে মতামত বা প্রস্তাব দিতে চাইলে সরকারের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে তা করতে পারে। তবে সরকারি কাঠামোর ভেতরে বিরোধী দলের কাউকে পদায়ন করা হলে প্রশাসনিক কাজের মধ্যে বাড়তি জটিলতা বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাঁর মতে, এ ধরনের পদায়নের কোনো সুস্পষ্ট নজির বাংলাদেশে আগে দেখা যায়নি।