নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতার প্রতিবাদে সংখ্যালঘু নেতাদের মানববন্ধন। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ১৩ মার্চ- জাতীয় সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে দেশজুড়ে ঘটে যাওয়া সাম্প্রদায়িক সহিংসতার প্রতিবাদে রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাব চত্বরে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ করেছেন বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ। শুক্রবার সকালে আয়োজিত এই কর্মসূচিতে তারা অভিযোগ করেন, অসাম্প্রদায়িক ও মানবিক সমাজ গঠনের যে অঙ্গীকার সরকার করেছিল, তা নস্যাৎ করতে একটি মহল সক্রিয় হয়ে উঠেছে। এ ধরনের অশুভ তৎপরতা প্রতিহত করতে সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তারা।
বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ সমন্বিত সংখ্যালঘু ঐক্যমোর্চার উদ্যোগে আয়োজিত মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেষ হওয়ার পর গত এক মাসে দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রায় অর্ধশতাধিক সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনার মধ্যে হত্যা, ধর্ষণ, মন্দিরে হামলা ও লুটপাট, বাড়িঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা এবং আদিবাসীদের বসতভিটা দখলের মতো ঘটনা রয়েছে। তারা বলেন, নির্বাচনের আগে ভোটারদের নির্ভয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগের জন্য যে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করা হয়েছিল, সেই ধারা অব্যাহত রেখে একটি গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ে তোলার উদ্যোগ অব্যাহত রাখতে হবে।
নেতারা বিভিন্ন ঘটনার উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, ভোলার তজুমুদ্দীনে ধর্মীয় উৎসবে অংশ নেওয়া এক নারীকে অপহরণ করে গণধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে। চট্টগ্রামে আকাশ দাস, বগুড়ায় সুনীল বাঁশফোড়, কক্সবাজারে ব্যবসায়ী গণেশ পাল, বগুড়ায় শিক্ষক চয়ন রাজভর, যশোরে অরুণ অধিকারী, ময়মনসিংহে চাল ব্যবসায়ী সুশেন চন্দ্র সরকার এবং গাইবান্ধার সদর উপজেলার অমিতাভ চন্দ্র সুজনকে হত্যার ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করা হয়। এছাড়া কুমিল্লা নগরীর দক্ষিণপাড়ার কালী গাছতলা শিব মন্দিরে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় পুরোহিতসহ চারজন আহত হয়েছেন। বগুড়ার ধুনটে লক্ষ্মী মন্দিরে অগ্নিসংযোগ, সাতক্ষীরার আশাশুনির হামকোড়া কালী মন্দিরে ভাঙচুর এবং ফেনীতে পারিবারিক মন্দিরে হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও উল্লেখ করেন বক্তারা।
সমাবেশ থেকে বক্তারা এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানান। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ এবং আহতদের যথাযথ চিকিৎসা দেওয়ার আহ্বান জানান তারা। বক্তারা আরও বলেন, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন প্রণয়ন, সংখ্যালঘু কমিশন এবং সংখ্যালঘু মন্ত্রণালয় গঠনের দাবিসহ আট দফা দাবি দ্রুত বাস্তবায়নে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
মানববন্ধন শেষে কয়েক শতাধিক মানুষের অংশগ্রহণে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। মিছিলটি প্রেস ক্লাব চত্বর থেকে শুরু হয়ে পল্টন মোড় ঘুরে আবার একই স্থানে এসে শেষ হয়।
সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি বাসুদেব ধর। এতে বক্তব্য দেন গণফোরামের সভাপতি সুব্রত চৌধুরী, সংখ্যালঘু ঐক্যমোর্চার যুগ্ম সমন্বয়ক মনীন্দ্র কুমার নাথ, বাংলাদেশ খ্রিস্টান অ্যাসোসিয়েশনের সুব্রত হাজরা, বাংলাদেশ সনাতন পার্টির সাধারণ সম্পাদক সুমন কুমার রায়, ওয়ার্ল্ড হিন্দু ফেডারেশনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সন্তোষ দাস, বাংলাদেশ হিন্দু মহাজোটের সাধারণ সম্পাদক এম কে রায়, অনুভব বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক অতুল চন্দ্র মণ্ডল, ঐক্য পরিষদের মহানগর দক্ষিণের সদস্যসচিব কৃষ্ণ দাস, মতুয়া মহাসংঘের নিউটন অধিকারী, বাংলাদেশ মহিলা ঐক্য পরিষদের সভাপতি সুপ্রিয়া ভট্টাচার্য, যুব ঐক্য পরিষদের সভাপতি শিমুল সাহা, ছাত্র ঐক্য পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সজীব সরকার এবং সনাতন মহাসংঘের পিযূস দাসসহ অনেকে। সমাবেশ পরিচালনা করেন বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোটের মুখপাত্র ও নির্বাহী মহাসচিব পলাশ কান্তি দে।
কর্মসূচিতে আরও উপস্থিত ছিলেন ওয়ার্ল্ড হিন্দু ফেডারেশনের সভাপতি বরুণ চন্দ্র সরকার, ঐক্য পরিষদের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মিলন কান্তি দত্ত, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রবীন্দ্রনাথ বসু, রমেন মণ্ডল, সাংগঠনিক সম্পাদক দিপংকর ঘোষ, মহিলা ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক দিপালী চক্রবর্তী, গীতা বিশ্বাসসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা।
রাজধানী ঢাকার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জেলা ও মহানগরেও একই দাবিতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালিত হয়েছে।