ইরানে হামলা চালিয়ে যেতে ট্রাম্পকে চাপ দিচ্ছেন সৌদি যুবরাজ
মেলবোর্ন, ২৫ মার্চ- ইরানে চলমান সামরিক অভিযান অব্যাহত রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর ওপর চাপ সৃষ্টি করছেন সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। সাম্প্রতিক সময়ে…
মেলবোর্ন, ২৪ মার্চ- মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম শক্তিশালী সামরিক সম্পদ হিসেবে পরিচিত বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড হঠাৎ করেই যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সরে গিয়ে গ্রিসের ক্রিট দ্বীপে অবস্থিত সৌদা বে নৌঘাঁটিতে ফিরে আসায় নতুন করে নানা প্রশ্ন ও বিশ্লেষণের জন্ম দিয়েছে। বিশ্বের বৃহত্তম ও প্রযুক্তিগতভাবে সবচেয়ে উন্নত এই রণতরির হঠাৎ প্রত্যাহার শুধু সামরিক কৌশলগত দিক থেকেই নয়, বরং পুরো অঞ্চলে শক্তির ভারসাম্য নিয়েও নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে।
গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানকে লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যে যৌথ সামরিক অভিযান শুরু করে, সেখানে ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড ছিল অন্যতম প্রধান আক্রমণাত্মক প্ল্যাটফর্ম। এই রণতরির সঙ্গে যুক্ত ছিল অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান সমৃদ্ধ একটি পূর্ণাঙ্গ এয়ার উইং, যা থেকে টানা বিমান হামলা পরিচালনা করা হচ্ছিল। একই সময়ে ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন নামের আরেকটি মার্কিন বিমানবাহী রণতরিও অভিযানে যুক্ত ছিল। এই দুই রণতরির উপস্থিতি ইরানের ওপর সামরিক চাপ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল এবং মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে যুক্তরাষ্ট্রের প্রাধান্য নিশ্চিত করেছিল।
কিন্তু এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ডের যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ অনেক পর্যবেক্ষকের কাছেই অপ্রত্যাশিত বলে মনে হয়েছে। মার্কিন নৌবাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, গত ১২ মার্চ রণতরিটির ভেতরে একটি লন্ড্রি রুমে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এতে দুইজন নাবিক আহত হন এবং জাহাজের অন্তত ১০০টি শয্যা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যদিও ঘটনাটি প্রথমে সীমিত ক্ষতির বলে মনে করা হয়েছিল, পরবর্তী সময়ে এর প্রভাব আরও বিস্তৃত হয়ে ওঠে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অগ্নিকাণ্ডের পাশাপাশি জাহাজটির অভ্যন্তরীণ অবকাঠামোতেও নানা ধরনের সমস্যার কথা সামনে এসেছে। বিশেষ করে টয়লেট ব্যবস্থায় জটিলতা দেখা দেওয়ায় দীর্ঘ সময় ধরে নাবিকদের দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। মাঝসমুদ্রে অবস্থানরত একটি যুদ্ধজাহাজে এমন সমস্যা শুধু দৈনন্দিন কার্যক্রমই ব্যাহত করে না, বরং ক্রুদের মানসিক অবস্থার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব সমস্যার কারণে রণতরিতে থাকা নৌসেনাদের মনোবলে বড় ধরনের ধস নেমেছে।
এ অবস্থায় জেরাল্ড ফোর্ডকে মেরামত ও পুনর্গঠনের জন্য পেছনে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে সামরিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি কেবল প্রযুক্তিগত বা লজিস্টিক কারণেই হয়নি, এর পেছনে কৌশলগত হিসাবও থাকতে পারে। কারণ একটি পূর্ণাঙ্গ বিমানবাহী রণতরি যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সরিয়ে নেওয়া মানে সেখানে সামরিক সক্ষমতায় তাৎক্ষণিক একটি শূন্যতা তৈরি হওয়া।
এই শূন্যতা কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা বোঝা যায় মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি থেকে। ইরান ইতোমধ্যে একাধিকবার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ নিয়েও উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। বিশ্বে তেল পরিবহনের একটি বড় অংশ এই প্রণালি দিয়ে হওয়ায়, এর ওপর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যে কোনো পদক্ষেপ বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে জেরাল্ড ফোর্ডের অনুপস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি কৌশলগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। যদিও ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন এখনও অঞ্চলে সক্রিয় রয়েছে, তবে একাধিক রণতরির যৌথ উপস্থিতি যে ধরনের চাপ সৃষ্টি করত, তা এখন আর নেই। ফলে ইরানের জন্য কিছুটা হলেও কৌশলগত সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কৌশল নিয়েও সমালোচনা শুরু হয়েছে। দেশটির সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টন সাম্প্রতিক অভিযানের সমালোচনা করে বলেছেন, ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপ ‘পরিকল্পনাহীন’ এবং ‘এলোমেলো’। তিনি মনে করেন, এত বড় একটি সামরিক অভিযান শুরু করার আগে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি, কংগ্রেসের সমর্থন এবং আন্তর্জাতিক মিত্রদের সঙ্গে সমন্বয় যথেষ্ট ছিল না।
বিবিসির এক সাক্ষাৎকারে বোল্টন বলেন, ট্রাম্প প্রশাসন যেভাবে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে এগিয়েছে, তা একটি সুপরিকল্পিত কৌশলের অংশ বলে মনে হয় না। তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ কিংবা মিত্র দেশগুলো কেউই এই ধরনের একটি যুদ্ধ পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত ছিল না। তার এই মন্তব্য নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান সামরিক পদক্ষেপগুলো কতটা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে।
বোল্টন আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেন, সেটি হলো হরমুজ প্রণালির কৌশলগত গুরুত্ব। তিনি বলেন, ইরান এখন খুব ভালোভাবেই বুঝে গেছে যে এই প্রণালি অবরোধ করার মাধ্যমে তারা কত বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করতে পারে। এটি সরাসরি পারমাণবিক অস্ত্রের মতো না হলেও, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ইরান একটি শক্তিশালী কৌশলগত অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে।
বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়। ফলে এখানে কোনো ধরনের অস্থিরতা তৈরি হলে তার প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং ইউরোপ, এশিয়া এবং আমেরিকার বাজারেও তা সরাসরি প্রভাব ফেলে।
ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ডের প্রত্যাহার সেই অস্থিরতার মধ্যেই ঘটেছে, যা ঘটনাটিকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক উপস্থিতি ধরে রাখতে চাইছে, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ সমস্যা ও কৌশলগত পুনর্বিন্যাসের কারণে তাদের অবস্থানে পরিবর্তন আনতে হচ্ছে।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি সাময়িক পদক্ষেপ হলেও এর প্রতীকী গুরুত্ব অনেক বেশি। কারণ যুদ্ধক্ষেত্রে শক্তির প্রদর্শন শুধু অস্ত্র বা সেনার সংখ্যার ওপর নির্ভর করে না, বরং উপস্থিতি ও ধারাবাহিকতার ওপরও নির্ভর করে। সেখানে একটি প্রধান রণতরির সরে যাওয়া প্রতিপক্ষের কাছে একটি বার্তা হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।
সব মিলিয়ে, জেরাল্ড ফোর্ডের যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সরে যাওয়া কেবল একটি প্রযুক্তিগত বা রুটিন সামরিক ঘটনা নয়। এটি মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কৌশল, এবং বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন, যার প্রভাব আগামী দিনগুলোতে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে।
সূত্র: এএফপি
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au