লালমনিরহাটে শতবর্ষী ধর্মীয় ও দাতব্য প্রতিষ্ঠান শ্রীশ্রী গৌরীশঙ্কর গোশালা সোসাইটি। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ৩০ মার্চ- লালমনিরহাটে শতবর্ষী ধর্মীয় ও দাতব্য প্রতিষ্ঠান শ্রীশ্রী গৌরীশঙ্কর গোশালা সোসাইটির সম্পত্তি ও আয়সংক্রান্ত বিরোধকে ঘিরে নতুন করে জটিলতা তৈরি হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, দীর্ঘদিনের আপোষ মীমাংসার পরও বিদায়ী জেলা প্রশাসকের পরস্পরবিরোধী আদেশে সোসাইটিটি আর্থিক ও প্রশাসনিক সংকটে পড়েছে।
১৯৩৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এই সোসাইটি লালমনিরহাট জেলার সনাতনী সম্প্রদায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও দাতব্য প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটিকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে জেলার ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছে। সোসাইটির প্রধান আয়ের উৎস ছিল গোশালা বাজার। তবে ১৯৫০ সালের প্রজাস্বত্ব আইনের প্রেক্ষাপটে তৎকালীন মহকুমা প্রশাসক শুধুমাত্র কাঁচাবাজার অধিগ্রহণের কথা থাকলেও অভিযোগ রয়েছে, বাজারসংলগ্ন বসতবাড়ি ও দোকানপাটসহ বিস্তীর্ণ এলাকা যথাযথ আইনগত প্রক্রিয়া ছাড়া অধিগ্রহণ করে পৌরসভার কাছে হস্তান্তর করা হয়।

লালমনিরহাটের সাবেক সাবেক জেলা প্রশাসক মো. আবু জাফর। ছবিঃ সংগৃহীত
এ ঘটনায় সোসাইটি কর্তৃপক্ষ ১৯৬৯ সালে সরকারের বিরুদ্ধে দেওয়ানি মামলা করে। দীর্ঘ ৫৫ বছরের বেশি সময়েও মামলাটি নিষ্পত্তি না হওয়ায় এবং অর্থাভাবে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার উপক্রম হলে সোসাইটির কার্যনির্বাহী পরিষদ আপোষ মীমাংসার উদ্যোগ নেয়। এ লক্ষ্যে তারা স্থানীয় পৌরসভার চেয়ারম্যানের মাধ্যমে জেলা প্রশাসনের কাছে বিষয়টি উপস্থাপন করে।
সাবেক জেলা প্রশাসক মো. আবু জাফর উদ্যোগ নিলেও ব্যস্ততার কারণে বিষয়টি চূড়ান্ত করতে পারেননি। পরে দায়িত্বপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ উল্লাহর কাছেও বিষয়টি উত্থাপন করা হয়। তবুও অগ্রগতি না হওয়ায় এক পর্যায়ে জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির বৈঠকে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ লালমনিরহাট জেলা শাখার সভাপতি ও সোসাইটির সভাপতি হীরালাল রায় বিষয়টি দ্রুত সমাধান না হলে জেলায় দুর্গাপূজা বন্ধের ঘোষণা দেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন।
এরপর দ্রুত কয়েক দফা বৈঠকের মাধ্যমে আপোষ মীমাংসার উদ্যোগ নেওয়া হয় এবং বিষয়টি নিষ্পত্তির দায়িত্ব লালমনিরহাট পৌরসভার চেয়ারম্যানকে দেওয়া হয়। পৌরসভার মাসিক সভার কার্যবিবরণীতে উল্লেখ করা হয়, দীর্ঘদিন ধরে মধ্যস্বত্বভোগীরা বসতবাড়ি ও দোকানপাট বিনাভাড়া বা নামমাত্র ভাড়ায় ব্যবহার করায় সরকার যেমন আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনি সোসাইটিও বঞ্চিত হচ্ছে।
পরবর্তীতে জেলা প্রশাসনের পরামর্শে সোসাইটি আপোষের আবেদন করে। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মিস কেস নম্বর ৫/২৪-এ শুনানি শেষে কাঁচাবাজার অংশ সরকারিভাবে খাস খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত এবং বসতবাড়িসহ ১৭টি বাড়ি ও প্রায় ২৭৫টি দোকান সোসাইটির অনুকূলে ফেরত দিয়ে খারিজ ও খাজনা প্রদানের নির্দেশ দেন। সোসাইটি কর্তৃপক্ষ নির্দেশনা অনুযায়ী নামজারি ও বকেয়া খাজনা পরিশোধ করে এবং পৌরসভা সীমানা নির্ধারণ করে সম্পত্তি হস্তান্তর করে।

প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। ছবিঃ সংগৃহীত
তবে দোকান ভাড়ার বিষয়ে সোসাইটি ও ভাড়াটিয়াদের মধ্যে সমঝোতা হয়নি। ভাড়াটিয়ারা পূর্বের মতো কম ভাড়া দিতে আগ্রহ দেখালে বৈঠক ব্যর্থ হয়। এরই মধ্যে ভাড়াটিয়াদের আবেদনের প্রেক্ষিতে বিদায়ী জেলা প্রশাসক অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের দেওয়া আদেশ বাতিল ঘোষণা করেন।
এতে সোসাইটি কর্তৃপক্ষ হতবিহ্বল হয়ে পড়ে এবং তারা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রী অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলুর শরণাপন্ন হয়। তিনি বিষয়টি সমাধানে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন বলে জানানো হয়েছে।
শ্রীশ্রী গৌরীশঙ্কর গোশালা সোসাইটির ট্রাস্টি ও সাধারণ সম্পাদক সুবল চন্দ্র বর্মন বলেন, দীর্ঘদিনের আপোষ মীমাংসার পর এ ধরনের সিদ্ধান্ত প্রতিষ্ঠানের জন্য বড় ক্ষতির কারণ হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবে এবং প্রতিষ্ঠানটি রক্ষায় উদ্যোগী হবে।
সোসাইটির পক্ষ থেকে আরও বলা হয়েছে, দেশের সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী অধিগ্রহণ ছাড়া কোনো সম্পত্তি সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া যায় না এবং দেবোত্তর সম্পত্তি অধিগ্রহণের আওতার বাইরে। এই বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়েই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত ছিল বলে তাদের দাবি।
বর্তমানে গোশালা বাজার কমিটির পক্ষ থেকে দোকান ভাড়ার অর্থ আদায়ে বাধা সৃষ্টি করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। ফলে প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে বলে জানিয়েছে সোসাইটি।