সামরিক চেকপোস্টে ইসরায়েলি হামলায় লেবাননের সেনা নিহত। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ৩০ মার্চ- মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের মধ্যে ইসরায়েলের হামলায় লেবাননের এক সেনা সদস্য নিহত হয়েছেন এবং আরও কয়েকজন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে লেবাননের সেনাবাহিনী। দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে একটি সামরিক চেকপোস্টে এই হামলার ঘটনা ঘটে। লেবাননের সেনাবাহিনীর এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, আল-আমিরিয়া এলাকায় কালিলা-সুর সড়কে অবস্থিত ওই চেকপোস্ট লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়।
একই সময়ে ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলীয় শহর হাইফায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর একটি তেল শোধনাগারে আগুন লাগার খবর পাওয়া গেছে। হামলার সরাসরি আঘাতে নাকি ধ্বংসাবশেষ থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে, তা এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এই ঘটনার প্রেক্ষাপটে আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও বাড়তে শুরু করেছে। লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলের টাইর শহরের দক্ষিণে উপকূলীয় মহাসড়কের কাছে সেনাবাহিনীর অবস্থানে সরাসরি হামলা চালানো হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, লেবাননের সেনাবাহিনী হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে সরাসরি পদক্ষেপ না নেওয়ায় ইসরায়েলের পক্ষ থেকে এটি একটি বার্তা হতে পারে। বিশেষ করে হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অগ্রগতি না হওয়ায় ইসরায়েল অসন্তুষ্ট বলেও ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে, লেবাননের বেইত লিফ এলাকায় ইসরায়েলি বাহিনীর ওপর হামলার দাবি করেছে হিজবুল্লাহ। সংগঠনটি জানিয়েছে, একটি বাড়ির ভেতরে অবস্থান নেওয়া ইসরায়েলি বাহিনীকে লক্ষ্য করে নির্দেশিত ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়, যাতে হতাহত হয়েছে।
অন্যদিকে, ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা আইএইএ’র বিরুদ্ধে কঠোর সমালোচনা করেছে। সংস্থাটির মুখপাত্র বাঘাই অভিযোগ করেন, ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার বিষয়ে আইএইএ উদাসীন ভূমিকা পালন করছে। তিনি বলেন, এই হামলাগুলো স্পষ্টতই অপরাধ এবং আইএইএ প্রধান রাফায়েল গ্রোসি আক্রমণকারীদের নিন্দা না করে এমন মন্তব্য করেছেন, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। তার ভাষায়, আইএইএ নেতৃত্বের মধ্যে নিরপেক্ষতা ও দৃঢ়তার অভাব রয়েছে।
এছাড়া ইরানের সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, কুয়েতের একটি লবণাক্ত পানি শোধনাগারে ইসরায়েল হামলা চালিয়েছে। তারা এটিকে ‘জায়নবাদী আগ্রাসনের জঘন্য উদাহরণ’ হিসেবে উল্লেখ করে হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি, সেনা সদস্য এবং অঞ্চলে তাদের স্বার্থসহ ইসরায়েলের সামরিক, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক অবকাঠামো লক্ষ্যবস্তু হিসেবে থাকবে।
ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যেও এ সংঘাতের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। স্পেন ঘোষণা দিয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে হামলায় অংশ নেওয়া মার্কিন সামরিক বিমানগুলো তাদের আকাশসীমা ব্যবহার করতে পারবে না। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী মার্গারিটা রোবলেস বলেন, ইরান যুদ্ধসংক্রান্ত কোনো কর্মকাণ্ডে সামরিক ঘাঁটি বা আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হবে না। ফলে মার্কিন বিমানগুলোকে বিকল্প পথ ব্যবহার করতে হচ্ছে, যদিও জরুরি ফ্লাইটের ক্ষেত্রে এই নিষেধাজ্ঞা প্রযোজ্য নয়।
স্পেনের অর্থমন্ত্রী কার্লোস কুয়ের্পো জানান, আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে একতরফাভাবে শুরু হওয়া এই যুদ্ধে সমর্থন না দেওয়ার অবস্থান থেকেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এদিকে দেশটির প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজও বারবার যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের এই যুদ্ধের সমালোচনা করেছেন।
অন্যদিকে মিশরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে আহ্বান জানিয়েছেন, যেন তিনি দ্রুত এই যুদ্ধ বন্ধে উদ্যোগ নেন। তিনি বলেন, উপসাগরীয় অঞ্চলে চলমান যুদ্ধ থামানোর ক্ষমতা কেবল যুক্তরাষ্ট্রেরই রয়েছে।
ইরান-লেবানন ইস্যুতেও নতুন উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। লেবানন সরকার ইরানের রাষ্ট্রদূত মনোনীত মোহাম্মদ রেজা শিবানিকে দেশ ছাড়ার নির্দেশ দিলেও ইরান জানিয়েছে, তাদের প্রতিনিধি বৈরুতে দায়িত্ব পালন চালিয়ে যাবেন।
এদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের জ্বালানি মন্ত্রীরা আগামীকাল বৈঠকে বসছেন, যেখানে যুদ্ধের কারণে তেল ও গ্যাসের বাজারে সৃষ্ট অস্থিরতা মোকাবিলার উপায় নিয়ে আলোচনা হবে। হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যে জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলার কারণে ইউরোপীয় বাজারে তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরান সংঘাতের পর ইউরোপে গ্যাসের দাম ৭০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। বৈঠকে মন্ত্রীদের সমন্বিতভাবে বাজার স্থিতিশীল রাখা, গ্যাস মজুত বৃদ্ধি এবং তেলের সরবরাহ নিশ্চিত করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত ধীরে ধীরে একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক সংকটে রূপ নিচ্ছে, যার প্রভাব শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকছে না, বরং বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারেও গভীর প্রভাব ফেলছে।
সূত্রঃ আল-জাজিরা