বিশ্ব

যুদ্ধের মাঝেও ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্র দিবস, ‘বিজয়ের অপেক্ষায়’ ইরান

  • 3:24 pm - April 02, 2026
  • পঠিত হয়েছে:২০৯ বার
যুদ্ধের মাঝেও ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্র দিবস। ছবিঃ সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ২ এপ্রিল- ইরানে ১৯৭৯ সালের ইসলামী প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার গণভোটের বার্ষিকী ঘিরে দেশজুড়ে সরকারি সমর্থকদের ব্যাপক সমাবেশ ও কর্মসূচি পালিত হয়েছে। তবে এ বছরের উদযাপন এসেছে এক ভিন্ন বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান হামলার মধ্যেই সরকারপন্থীরা রাস্তায় নেমে ‘বিজয়ের প্রত্যাশা’ ব্যক্ত করেছে, আর রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ যুদ্ধের শেষ পর্যন্ত প্রতিরোধ চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

মঙ্গলবার (১ এপ্রিল) রাত থেকে রাজধানী তেহরানসহ বিভিন্ন শহরে ইসলামিক রিপাবলিক ডে উপলক্ষে শুরু হয় সমাবেশ, মিছিল ও নানা কর্মসূচি। ১৯৭৯ সালের গণভোটে ৯৮ দশমিক ২ শতাংশ ভোটে ইসলামী প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল, যা দেশটির রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত। প্রায় অর্ধশতাব্দী পর সেই দিনটি এবার পালিত হচ্ছে যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে।

তেহরানে আয়োজিত সমাবেশে অংশ নেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। তারা সাধারণ মানুষের সঙ্গে রাস্তায় নেমে কর্মসূচিতে যোগ দেন। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রচারিত দৃশ্যে দেখা যায়, প্রেসিডেন্টকে ঘিরে নিরাপত্তাকর্মীরা থাকলেও তিনি মানুষের সঙ্গে কথা বলছেন, ছবি তুলছেন এবং তাদের উৎসাহ দিচ্ছেন।

এই উদযাপনের মধ্যেই বুধবার ভোররাতে যুক্তরাষ্ট্র তেহরানে সাবেক মার্কিন দূতাবাসের স্থানে বিমান হামলা চালায় বলে জানা গেছে। ঘটনাস্থলটি বর্তমানে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত ফুটেজে সেখানে ধ্বংসস্তূপ, ধোঁয়া ও আগুনের চিত্র দেখা যায়। ইসলামিক রিপাবলিক ডে’র প্রতীকী তাৎপর্যের সঙ্গে মিল রেখে এই হামলা চালানো হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বুধবার বিকেলে তেহরানের কেন্দ্রস্থলে ১৫০ মিটার উচ্চতা ও প্রায় ৩০০ কেজি ওজনের একটি বিশাল জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়, যা দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় পতাকা হিসেবে দাবি করা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে বলা হয়, এটি জাতীয় ঐক্য ও প্রতিরোধের প্রতীক।

সরকারি নেতারা জানিয়েছেন, এই সংকটময় সময়ে জনগণকে রাস্তায় উপস্থিত থেকে রাষ্ট্রকে সমর্থন জানাতে হবে এবং যেকোনো ধরনের ভেতরের অস্থিরতা বা সরকারবিরোধী তৎপরতা মোকাবিলায় সতর্ক থাকতে হবে। সামরিক বাহিনী ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলোকে সর্বোচ্চ প্রস্তুতিতে রাখা হয়েছে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এক সাক্ষাৎকারে বলেন, তিনি ওয়াশিংটনের সঙ্গে বার্তা আদানপ্রদান করলেও কোনো ধরনের আলোচনায় সম্মতি দেননি। তিনি জানান, জনগণের সঙ্গে রাস্তায় উপস্থিত হয়ে তিনি ‘মানসিক শক্তি ও প্রেরণা’ অর্জন করতে চান।

১৯৭৯ সালের বিপ্লবের নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির নাতি হাসান খোমেনি বলেন, যুদ্ধ যতদিনই চলুক না কেন, জনগণকে প্রতিদিন রাস্তায় থাকতে হবে। তার ভাষায়, “শত্রু আমাদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার জন্য নানা ষড়যন্ত্র করতে পারে, কিন্তু আমাদের প্রতিরোধের ঘাঁটি হলো মসজিদ, গলি, চত্বর ও রাস্তাঘাট।”

রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রচারিত বিভিন্ন শহরের সমাবেশে অংশ নেওয়া মানুষকে ‘আমেরিকা ধ্বংস হোক’ ও ‘ইসরায়েল ধ্বংস হোক’সহ বিভিন্ন স্লোগান দিতে দেখা গেছে। ধর্মীয় সংগীত ও শিয়া ঐতিহ্যভিত্তিক সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মধ্য দিয়ে সমাবেশগুলো আরও উজ্জীবিত করা হয়।

তেহরানসহ বিভিন্ন শহরে ইসলামিক রিপাবলিক ডে উপলক্ষে শুরু হয় সমাবেশ, মিছিল ও নানা কর্মসূচি। ছবিঃ সংগৃহীত

এদিকে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর অধীনস্থ বেসিজ সদস্যসহ অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনী শহরের বিভিন্ন স্থানে টহল জোরদার করেছে। গুরুত্বপূর্ণ সড়কে চেকপোস্ট ও ব্যারিকেড স্থাপন করা হয়েছে। একই সঙ্গে ইরাকভিত্তিক ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যদেরও তেহরানে দেখা গেছে বলে নিশ্চিত করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

এক জ্যেষ্ঠ ধর্মীয় ও আধাসামরিক নেতা হামিদ আল-হোসেইনি জানান, ইরাকি স্বেচ্ছাসেবীরা তেহরানের বিভিন্ন স্থানে ‘মোকেব’ বা খাদ্য ও সহায়তা কেন্দ্র স্থাপন করেছে, যাতে তারা ইরানি জনগণকে সহযোগিতা করতে পারে এবং তাদের কাছ থেকে প্রতিরোধের শিক্ষা নিতে পারে।

এর আগে ইরানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় খুজেস্তানে ইরাকের জনপ্রিয় মোবিলাইজেশন ফোর্সের সদস্যদের সামরিক পোশাকে গাড়িবহর নিয়ে মিছিল করতে দেখা যায়, যারা মানবিক সহায়তা দেওয়ার দাবি করেছে। প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান তাদের এই উদ্যোগের প্রশংসা করেছেন।

তবে বিরোধী গোষ্ঠী ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে, ইরান সরকার অভ্যন্তরীণ বিরোধ দমন করতে বিদেশি মিত্র বাহিনী ব্যবহার করে থাকে। যদিও সরকার এ অভিযোগ অস্বীকার করে।

যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ইরানের সামরিক বাহিনীও কঠোর অবস্থান নিয়েছে। দেশটির সেনাবাহিনীর গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান আহমদ রেজা পুরদাস্তান বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি স্থল অভিযান চালায়, তবে তাদের বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়তে হবে। তিনি জানান, ২০০১ সাল থেকেই এমন পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

ইরানের সামরিক বাহিনীর যৌথ কমান্ড এক বিবৃতিতে বলেছে, ইসলামী প্রজাতন্ত্র দিবস স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ধর্মীয় গণতন্ত্রের লক্ষ্যে সংগ্রামের প্রতীক। তারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, দেশের শত্রুদের তাদের কর্মকাণ্ডের জন্য অনুতপ্ত হতে হবে।

পুলিশ বিভাগ আলাদা এক বিবৃতিতে দাবি করেছে, ইরান ‘চূড়ান্ত বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে’ রয়েছে। রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত ভিডিওতে বিভিন্ন ভাষায় বার্তা দেওয়া হয়েছে—‘আরও কাছে আসো’ এবং ‘আমরা অপেক্ষা করছি’, যা প্রতিপক্ষের প্রতি এক ধরনের চ্যালেঞ্জ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আবারও ইরানের গুরুত্বপূর্ণ ইস্পাত কারখানাগুলোতে হামলা চালিয়েছে, যার ফলে হাজারো শ্রমিক চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে পারে। পাশাপাশি বেসামরিক পারমাণবিক স্থাপনা, একটি বিশ্ববিদ্যালয় এবং আবাসিক এলাকাও হামলার শিকার হয়েছে বলে জানা গেছে।

অন্যদিকে যুদ্ধের পাশাপাশি ইরানের সাধারণ মানুষ আরেকটি বড় সংকটের মুখে পড়েছে—প্রায় সম্পূর্ণ ইন্টারনেট বন্ধ। এক মাসেরও বেশি সময় ধরে কার্যত অচল ইন্টারনেট ব্যবস্থার কারণে মানুষ বাইরের বিশ্বের খবর জানতে পারছে না, কেবল রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

তেহরানের এক বাসিন্দা জানান, তিনি ইন্টারনেট ব্যবহারের জন্য ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক কিনতে গিয়ে ইতোমধ্যে প্রায় ৩০০ ডলার খরচ করেছেন, যা দেশটির ন্যূনতম মজুরির দুই মাসের আয়েরও বেশি। তিনি বলেন, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে বহুবার বিকল্প সংযোগ কিনলেও সেগুলো অল্প সময়ের মধ্যেই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

তিনি আরও জানান, অনেক অনলাইন বিক্রেতা প্রতারণা করছে এবং এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে একটি কালোবাজার তৈরি হয়েছে। সরকার ইতোমধ্যে কিছু বিক্রেতাকে গ্রেপ্তার করেছে এবং অবৈধ স্যাটেলাইট ইন্টারনেট ব্যবহারের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।

রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে কঠোর নজরদারি চালানো হচ্ছে। কেউ যদি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ভিডিও ধারণ করে বা সরকারবিরোধী কার্যক্রমে যুক্ত থাকে, তাহলে তার বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ আনা হতে পারে, যার শাস্তি হতে পারে সম্পদ জব্দ কিংবা মৃত্যুদণ্ড।

এমন পরিস্থিতিতে অনেক সাধারণ মানুষ নিজেদের উদ্যোগে সতর্কতা ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ফোন বা বার্তার মাধ্যমে আগাম সতর্কতা দেওয়া হচ্ছে, যাতে হামলার আগে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেওয়া যায়।

যুদ্ধ, দমননীতি ও তথ্যবিচ্ছিন্নতার এই ত্রিমুখী সংকটের মধ্যেই ইরান সরকার ‘চূড়ান্ত বিজয়’ প্রত্যাশা করছে এবং জনগণকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানাচ্ছে। তবে সাধারণ মানুষের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

সূত্রঃ আল জাজিরা

এই শাখার আরও খবর

নিখোঁজের ৮ ঘণ্টা পর গর্ত থেকে শিশু বিথি রায়ের মরদেহ উদ্ধার

কুড়িগ্রাম সদর উপজেলায় নিখোঁজ হওয়ার প্রায় আট ঘণ্টা পর বিথি রায় নামে ছয় বছর বয়সী এক শিশুর মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। সোমবার রাত ৮টার দিকে…

যুক্তরাজ্যে ফিরলেও রাজপরিবারের দায়িত্বে ফিরছেন না হ্যারি-মেগান

যুক্তরাজ্যে প্রিন্স হ্যারি ও তাঁর স্ত্রী মেগান মার্কেলের ফেরার খবরে রাজপরিবারের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। এর মধ্যেই হ্যারি ও মেগানের…

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর স্বাধীন নজরদারি প্রতিষ্ঠান গঠনের আহ্বান ফলকার টুর্কের

বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকাণ্ডের ওপর নজরদারি এবং তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন জাতীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার…

গণপতি পরিবারের ছয়-সাত ভরি স্বর্ণ গেল কোথায়? উদ্ধার সম্ভব নয় কেন বলছে পুলিশ?

রংপুর নগরের মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় একাধিক প্রশ্নের উত্তর এখনও মেলেনি। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি হলো, হত্যার…

ডেঙ্গুতে ৪২ হাজারের বেশি আক্রান্ত, মৃত্যু ১১৭

বাংলাদেশে চলতি বছর ডেঙ্গু পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হচ্ছে। বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ৪২ হাজার ৫৯০ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ সময়ে…

সুন্দরবন ও বাঘ সংরক্ষণে বাংলাদেশ-ভারতের পরবর্তী বৈঠক বাংলাদেশে

সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং রয়েল বেঙ্গল টাইগার রক্ষায় বাংলাদেশ ও ভারত বিদ্যমান সহযোগিতা কাঠামোর আওতায় পরবর্তী বৈঠকগুলো বাংলাদেশে আয়োজনের বিষয়ে সম্মত হয়েছে। একই সঙ্গে আন্তসীমান্ত…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au