মেলবোর্ন, ৫ এপ্রিল- শরীয়তপুরের ডামুড্যা উপজেলায় দুই কিশোরকে প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে দেখিয়ে কারাগারে পাঠানোর ঘটনায় আইন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় আদালত প্রাঙ্গণে উত্তেজনা ও আইনজীবীদের হেনস্তার অভিযোগও পাওয়া গেছে, যা বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
ভুক্তভোগী পরিবার সূত্রে জানা যায়, উপজেলা ছাত্রলীগ নেতা মো. শাওন হাওলাদারের ১৫ বছর বয়সী ছোট ভাই ওমর এবং ১৬ বছর বয়সী আত্মীয় নিরবকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আটক করা হয়। পরে তাদের বয়স গোপন রেখে প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে আদালতে উপস্থাপন করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে ।
ডামুড্যা উপজেলা ছাত্রলীগের সমাজকল্যাণ সম্পাদক মো. শাওন হাওলাদার ও তার পরিবারের ওপর বর্বরোচিত হামলা, বাড়িঘর ভাঙচুর এবং অগ্নিসংযোগের অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় বিএনপি সমর্থিত নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। গত ২৭ মার্চ পবিত্র ঈদুল ফিতরের ছুটিতে বাড়ি ফেরার পর এই নৃশংস হামলার ঘটনা ঘটে।
ওই হামলায় শাওন হাওলাদারের মা-সহ পরিবারের একাধিক সদস্য গুরুতর আহত হয়েছেন। বর্তমানে নিরাপত্তাহীনতায় সপরিবারে এলাকাছাড়া হয়ে ঢাকায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন এই ভুক্তভোগী পরিবারটি।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, দুই কিশোরকে প্রাপ্তবয়স্ক দেখিয়ে কারাগারে পাঠানোর বিষয়টি বাংলাদেশের শিশু আইন, ২০১৩ এবং জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদ (CRC)-এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। আইনে শিশুদের জন্য পৃথক বিচারব্যবস্থা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে, যা এখানে উপেক্ষিত হয়েছে।
এদিকে মামলাটি আদালতে ওঠার পর আসামিপক্ষের আইনজীবীদের কাজে বাধা, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং গত ৩১ মার্চ আদালত প্রাঙ্গণে হেনস্তার অভিযোগ উঠেছে। এতে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচার প্রাপ্তির পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ প্রসঙ্গে আইন বিশেষজ্ঞ মনজিল মোরশেদ বলেন, শিশুদের প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো শুধু আইনি ত্রুটি নয়, বরং এটি মৌলিক মানবাধিকারেরও গুরুতর লঙ্ঘন। দ্রুত তদন্ত করে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং আটক কিশোরদের মুক্তির দাবি জানিয়েছেন তিনি।
হামলার বিবরণ ও নৃশংসতাঃ
প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, গত ২৭ মার্চ ২০২৬ তারিখ সকাল আনুমানিক সাড়ে ১০টায় শাওন হাওলাদার নিজ গ্রাম ধানকাঠি ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডে পৌঁছালে ২০-২৫ জনের একটি সশস্ত্র দল তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।
অভিযোগ উঠেছে, স্থানীয় বিএনপি সমর্থিত মালেক খান, মহসিন সরদার, নজরুল ইসলাম, রমজান সরদার, আলমগীর সরদার ও সামসুর রহমান সরদারের নেতৃত্বে এই সুপরিকল্পিত হামলা চালানো হয়।
হামলাকারীরা ছেনদা, চাইনিজ কুড়াল, রামদা ও লাঠিসোঁটাসহ দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত ছিল। শাওনকে বাঁচাতে তার মা এগিয়ে এলে হামলাকারীরা তাকেও রেহাই দেয়নি। ধারালো অস্ত্রের আঘাতে তার মায়ের হাত ও পা ভেঙে দেওয়া হয় এবং মাথায় মারাত্মক জখম করা হয়। শাওন হাওলাদারের মাথায় ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে গভীর ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমানে তারা চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

শাওনের মা ,ছবি : সংগৃহীত
এক্স-রে রিপোর্টে শাওনের মায়ের হাত ও পায়ে একাধিক ফ্র্যাকচার ধরা পড়েছে।
বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটঃ
শারীরিক নির্যাতনের পর ক্ষান্ত হয়নি হামলাকারীরা। শাওন ও তার পরিবার এলাকা ছেড়ে যাওয়ার পর প্রভাবশালী ওই মহলটি তাদের বসতবাড়িতে হামলা চালায়। পেট্রোল ঢেলে পুরো বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এতে বাড়িটি সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয়ে গেছে। বর্তমানে ওই ভিটায় মাথা গোঁজার মতো কোনো কাঠামো অবশিষ্ট নেই।

ছবি : সংগৃহীত
ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকে তাদের ভিটেমাটি ছাড়া করতেই এই অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটানো হয়েছে।
আইনি হয়রানি ও বিচারহীনতার অভিযোগঃ
হামলার শিকার হয়েও বিচার পাচ্ছেন না শাওন হাওলাদার। উল্টো তার পরিবারের বিরুদ্ধে সাজানো মামলা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ডামুড্যা থানা পুলিশ ভুক্তভোগীদের অভিযোগ গ্রহণ না করে প্রভাবশালীদের ইশারায় শাওনের পরিবারের ১২ সদস্যের বিরুদ্ধে একটি মিথ্যা মামলা (জিআর নং ৪৬/২০২৬) দায়ের করেছে।
এমনকি আদালতের নির্দেশে জামিন পাওয়ার পর এমদাদ নামে এক ব্যক্তিকে জেল গেট থেকে পুনরায় অন্য একটি অজ্ঞাত মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, শরীয়তপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের হুইপ মিয়া নুরুদ্দিন আহমেদ অপুর প্রভাবে স্থানীয় প্রশাসন একপাক্ষিক ভূমিকা পালন করছে।
ভুক্তভোগী শাওন হাওলাদার ঢাকা থেকে মুঠোফোনে জানান, “আমরা নিজ বাড়িতে ফিরতে পারছি না। আমাদের বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, মাকে কুপিয়ে পঙ্গু করে দেওয়া হয়েছে। এখন মিথ্যে মামলায় আমার ছোট ভাইদের জেলে রাখা হয়েছে। আমরা শুধু বাঁচতে চাই এবং এই অন্যায়ের বিচার চাই।”
এই বিষয়ে স্থানীয় থানা প্রশাসনের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও কোনো দায়িত্বশীল মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
এলাকায় বর্তমানে থমথমে অবস্থায় রয়েছে এবং ভুক্তভোগী পরিবারটি প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছে।