হরমুজ প্রণালি খুলতে আন্তর্জাতিক জোটে যোগের পথে অস্ট্রেলিয়া
মেলবোর্ন, ১৭ এপ্রিল- মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি পুনরায় সচল করতে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের নেতৃত্বে গঠিত আন্তর্জাতিক জোটে যোগ দেওয়ার পথে এগিয়েছে অস্ট্রেলিয়া। এ লক্ষ্যে…
মেলবোর্ন, ১৭ এপ্রিল- ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ “শিগগিরই শেষ হওয়া উচিত” বলে মন্তব্য করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য চুক্তির বিষয়ে আগামী সপ্তাহেই বৈঠক হতে পারে এবং প্রয়োজন হলে চলমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদও বাড়ানো হতে পারে।
হোয়াইট হাউসের বাইরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, ইরানের সঙ্গে একটি সমঝোতার খুব কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তিনি বলেন, “আমরা দেখব কী হয়, তবে আমার মনে হয় আমরা খুব দ্রুতই একটি চুক্তির কাছাকাছি পৌঁছে গেছি।”
তিনি আরও জানান, যদি চুক্তি চূড়ান্ত হয় এবং পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে তা স্বাক্ষরিত হয়, তবে তিনি নিজেও সেখানে উপস্থিত থাকতে পারেন।
পরবর্তীতে লাস ভেগাসে দেওয়া আরেক বক্তব্যে ট্রাম্প আরও দৃঢ়ভাবে বলেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ খুব দ্রুত শেষ হয়ে যেতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান মঙ্গলবার দুই সপ্তাহের জন্য যুদ্ধবিরতিতে সম্মতি দিয়েছে। ছবিঃ সংগৃহীত
এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও জনপ্রিয়তা পায়নি এবং গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচনের কয়েক মাস আগে এটি ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিক চাপ তৈরি করেছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার মধ্য দিয়ে ইরানের সঙ্গে সংঘাত শুরু হয়, যা বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের ধাক্কা দেয়। তেলের দামের অস্বাভাবিক ঊর্ধ্বগতি এবং দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়েছে এবং বিশ্ব অর্থনীতি মন্দার মুখে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করা পাকিস্তানের একটি সূত্র জানিয়েছে, পর্দার আড়ালে কূটনৈতিক তৎপরতায় অগ্রগতি হয়েছে এবং আসন্ন বৈঠকেই একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হতে পারে। পরে ৬০ দিনের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। সূত্রটি জানায়, দুই পক্ষ মূল নীতিগত বিষয়ে একমত হচ্ছে এবং কারিগরি বিষয়গুলো পরে নির্ধারিত হবে।
কূটনৈতিক সূত্রে আরও জানা গেছে, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির তেহরানে অবস্থান করে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন এবং জটিল কিছু বিষয়ে অগ্রগতি হয়েছে।
সম্ভাব্য চুক্তির আশায় আন্তর্জাতিক বাজারেও ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। শুক্রবার তেলের দাম কমেছে এবং এশিয়ার শেয়ারবাজারে টানা দ্বিতীয় সপ্তাহে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। যদিও বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস সরবরাহের একটি বড় অংশ বহনকারী হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ রয়েছে, তবুও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আশাবাদ তৈরি হয়েছে যে সংঘাতের অবসান হতে পারে।
ব্রেন্ট ক্রুডের দাম নেমে আসে প্রতি ব্যারেল ৯৮ ডলার ১৭ সেন্টে এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের দাম দাঁড়ায় ৯৩ ডলার ৪৭ সেন্টে। অধিকাংশ শেয়ারবাজার যুদ্ধ-পূর্ব অবস্থার কাছাকাছি ফিরে এসেছে।
এদিকে লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে ১০ দিনের যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে। ট্রাম্প জানিয়েছেন, তিনি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এবং লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউনের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং শিগগিরই তাদের হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রণ জানিয়ে অর্থবহ আলোচনা করার পরিকল্পনা রয়েছে।
ইরান জানিয়েছে, যেকোনো শান্তি চুক্তিতে লেবাননের সংঘাতও অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে। ইরানি গণমাধ্যমের বরাতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় এই যুদ্ধবিরতির একটি সমঝোতা হয়েছে।
যুদ্ধবিরতি শুরুর আগে ট্রাম্প হিজবুল্লাহকে সংযত থাকার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, এই সময়টিতে হিজবুল্লাহ শান্ত থাকলে তা তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি সুযোগ হবে এবং এখন সময় স্থায়ী শান্তির দিকে এগোনোর।
তবে লেবাননে এই যুদ্ধবিরতি এখনো ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে। যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর বৈরুতের বিভিন্ন এলাকায় উল্লাসধ্বনি শোনা গেলেও নিরাপত্তা বাহিনী সতর্কতা জারি করেছে। লেবাননের সেনাবাহিনী অভিযোগ করেছে, ইসরায়েল ইতোমধ্যে দক্ষিণ লেবাননের কয়েকটি গ্রামে গোলাবর্ষণ করে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে।
অন্যদিকে ইসরায়েলি বাহিনী জানিয়েছে, তারা এখনো ওই এলাকায় মোতায়েন রয়েছে এবং হিজবুল্লাহর কার্যক্রমের প্রতিক্রিয়ায় তাদের অবস্থান বজায় রেখেছে।
এই প্রেক্ষাপটে হিজবুল্লাহর এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বিলাল লাক্কিস বলেন, যুদ্ধবিরতি অত্যন্ত জরুরি হলেও তারা অস্ত্র সমর্পণ করবে না, যদি না তা বৃহত্তর জাতীয় নিরাপত্তা কাঠামোর অংশ হয়।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়েও আলোচনায় জটিলতা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সব ধরনের পারমাণবিক কার্যক্রম ২০ বছরের জন্য বন্ধ রাখার প্রস্তাব দিয়েছে, অন্যদিকে ইরান তিন থেকে পাঁচ বছরের সীমিত স্থগিতের প্রস্তাব দিয়েছে। ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরান ২০ বছরের বেশি সময় পারমাণবিক অস্ত্র না রাখার প্রস্তাব দিয়েছে।
ইরান আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে, আর যুক্তরাষ্ট্র চায় উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দেশটির বাইরে সরিয়ে নেওয়া হোক। এ বিষয়ে আপসের সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে বলে জানা গেছে।
সব মিলিয়ে, মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যেই কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার হয়েছে এবং যুদ্ধের অবসান নিয়ে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। তবে বাস্তব পরিস্থিতি এখনো অনিশ্চিত এবং সামনে কী ঘটে তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে গভীর নজর রাখা হচ্ছে।
সূত্রঃ রয়টার্স
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au