যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার। ছবিঃ বিবিসি
মেলবোর্ন, ২৩ এপ্রিল- যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার পার্লামেন্টে কঠোর প্রশ্নবাণের মুখে পড়তে যাচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রী প্রশ্নোত্তর পর্বে তাকে পদত্যাগের আহ্বান জানিয়ে বিরোধী এমপিদের চাপের মুখে পড়তে হয়, কারণ যুক্তরাষ্ট্রে রাষ্ট্রদূত হিসেবে পিটার ম্যান্ডেলসনকে নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রে নিরাপত্তা যাচাইয়ে গুরুতর ঘাটতির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, নিরাপত্তা যাচাইয়ে স্পষ্ট সতর্ক সংকেত থাকা সত্ত্বেও ম্যান্ডেলসনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল এবং পরে তার প্রয়াত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টাইনের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে আসায় তাকে পদ থেকে বরখাস্ত করা হয়। কনজারভেটিভ পার্টির নেতা কেমি ব্যাডেনক প্রধানমন্ত্রীকে সংসদকে বিভ্রান্ত করার অভিযোগ এনে পদত্যাগের আহ্বান জানিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার সম্প্রতি বারবার দাবি করেছেন, পিটার ম্যান্ডেলসনকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগের সময় সম্পূর্ণ নিয়ম অনুযায়ী যাচাই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছিল। তবে তিনি গত সপ্তাহে বিস্ময় প্রকাশ করে জানান, পররাষ্ট্র দপ্তরের কিছু কর্মকর্তারা প্রাথমিক নিরাপত্তা যাচাইয়ের সময় পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ সতর্ক সংকেত তার কাছে গোপন করেছিলেন। তিনি বলেন, এই তথ্য তিনি হঠাৎ করেই জানতে পারেন এবং এটি তাকে হতবাক করেছে।
এদিকে বিরোধী সব দলের পক্ষ থেকে পদত্যাগের দাবি ওঠার পর প্রধানমন্ত্রী স্বচ্ছতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এবং পুরো ঘটনা পরিষ্কার করার চেষ্টা করছেন। মূল প্রশ্নগুলোর মধ্যে একটি হলো, প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার ঠিক কখন কী তথ্য জানতেন। তিনি দাবি করেছেন, গত মঙ্গলবারের আগে তিনি নিরাপত্তা যাচাইয়ের সতর্ক সংকেত সম্পর্কে কিছুই জানতেন না। অথচ এই সতর্কতা প্রথমে গত বছরের জানুয়ারিতে যুক্তরাজ্যের নিরাপত্তা ও যাচাই সংস্থার পক্ষ থেকে পররাষ্ট্র দপ্তরে জানানো হয়েছিল। পরে এই তথ্য শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তাদের মাধ্যমে তার কাছে পৌঁছায় বলে তিনি জানান।
এ নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে, কারণ অভিযোগ উঠেছে যে প্রায় এক বছর ধরে প্রধানমন্ত্রী বা তার ঘনিষ্ঠ দপ্তর এই তথ্য অন্ধকারে ছিল, যা বিরোধী দলগুলো বিশ্বাসযোগ্য মনে করছে না। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে, কেন প্রধানমন্ত্রী এবং তার দল অতিরিক্ত তথ্য জানতে চায়নি বা যাচাই প্রক্রিয়া আরও গভীরভাবে অনুসরণ করেনি।
প্রসঙ্গত, যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত ক্যারেন পিয়ার্সের স্থলাভিষিক্ত হিসেবে পিটার ম্যান্ডেলসনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল, যিনি একজন রাজনৈতিক নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তি। সমালোচকদের মতে, রাজনৈতিক নিয়োগের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেশি থাকে, তাই এখানে আরও সতর্ক যাচাই করা উচিত ছিল। ম্যান্ডেলসনের অতীতেও অর্থনৈতিক ও প্রভাব সংক্রান্ত নানা বিতর্ক ছিল এবং দুইবার তাকে মন্ত্রিসভা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এছাড়া জেফরি এপস্টাইনের সঙ্গে তার বন্ধুত্বের বিষয়টি আগেই জনসমক্ষে ছিল।
আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো, প্রধানমন্ত্রী সংসদকে বিভ্রান্ত করেছেন কি না। বিরোধী দল কনজারভেটিভ পার্টির দাবি, তিনি সংসদে ভুল তথ্য দিয়েছেন এবং তা মন্ত্রীদের আচরণবিধি লঙ্ঘনের শামিল। প্রধানমন্ত্রী অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং বলেছেন, তিনি তখন পর্যন্ত কেবল আনুষ্ঠানিক সুপারিশ সম্পর্কে জানতেন।
নিয়ম অনুযায়ী, কোনো ভুল তথ্য সংসদে উপস্থাপন করা হলে তা দ্রুত সংশোধন করার বাধ্যবাধকতা থাকে। বিরোধীরা বলছে, তিনি গত সপ্তাহেই এই তথ্য জানার পরই তা সংশোধন করা উচিত ছিল। তবে প্রধানমন্ত্রী ব্যাখ্যা দিয়েছেন যে তিনি তথ্য পাওয়ার পর পূর্ণ বিবরণ সংগ্রহ করতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন এবং সোমবার সংসদে ফেরার আগে সবকিছু নিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন। এর মধ্যে তিনি পূর্বনির্ধারিত আন্তর্জাতিক বৈঠকে অংশ নিতে প্যারিসে ছিলেন।
এখন প্রশ্ন উঠেছে, আগামী দিনে প্রকাশিত হতে যাওয়া নথিগুলোতে আর কী তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে। কিছু নথি প্রকাশ করা হবে, তবে মেট্রোপলিটন পুলিশের চলমান তদন্তের কারণে কিছু তথ্য গোপন রাখা হবে। এসব গোপনীয়তার অনুমোদন দিতে হবে গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা কমিটির মাধ্যমে। বিরোধী নেত্রী কেমি ব্যাডেনক চলতি সপ্তাহের মধ্যেই সব নথি প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন।
নভেম্বরে শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তা জানান, পিটার ম্যান্ডেলসনকে রাষ্ট্রদূত নিয়োগের আগে সরাসরি সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়নি, বরং তাকে একটি ফরম পূরণ করতে হয়েছিল যা মূলত আর্থিক স্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। পরে এই প্রক্রিয়া পরিবর্তন করা হয়। এছাড়া নিয়োগের আগে করা অভ্যন্তরীণ যাচাই প্রতিবেদনে জেফরি এপস্টাইনের সঙ্গে সম্পর্কজনিত সম্ভাব্য সুনামহানির ঝুঁকির কথাও উল্লেখ ছিল।
এই ঘটনার তদন্ত এখন আরও গভীরে যাচ্ছে। এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রী তার যুক্তরাষ্ট্রে রাষ্ট্রদূত, প্রধান সচিব এবং পররাষ্ট্র দপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তাকে হারিয়েছেন। আগামী মঙ্গলবার সংসদীয় কমিটিতে এই বিষয়ে আরও জবাবদিহি হতে পারে। কমিটির প্রধান জানিয়েছেন, আগের বক্তব্যে তিনি বিভ্রান্ত হয়েছিলেন বলে মনে করছেন।
সূত্রঃ স্কাই নিউজ