বাংলাদেশে গোয়েন্দা তালিকায় থাকা ১,৬১১ জঙ্গি আবারও সক্রিয়। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ২৮ এপ্রিল- বাংলাদেশে গোয়েন্দা সংস্থার তালিকাভুক্ত ১ হাজার ৬১১ জন জঙ্গি আবারও সক্রিয় হয়ে মাঠে নেমেছে বলে একাধিক গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এই তথ্য ঘিরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের আটটি বিমানবন্দরসহ মোট ১২টি কেপিআইভুক্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় সম্ভাব্য জঙ্গি হামলার আশঙ্কায় বিশেষ নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করা হয়েছে এবং নজরদারি বহুগুণ বাড়ানো হয়েছে।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) সোমবার বিষয়টি নিশ্চিত করে জানায়, দেশের সব বিমানবন্দর, বিশেষ করে আন্তর্জাতিক রুটে পরিচালিত স্থাপনাগুলোতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে। বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক জানান, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ঝুঁকি বিবেচনায় অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রাষ্ট্রীয় একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার অভ্যন্তরীণ নথি অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত এই জঙ্গিদের বড় একটি অংশ বিভিন্ন সময়ে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে ছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে জামিনে মুক্তির পর তাদের একটি অংশ আবারও সংগঠিত হয়ে সক্রিয় তৎপরতা শুরু করেছে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, এই পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় পুরনো নেটওয়ার্কের পাশাপাশি নতুন সদস্য নিয়োগের প্রচেষ্টাও চলছে।
গোয়েন্দা তালিকায় থাকা তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০২১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে মোট ১ হাজার ২৩১ জন জঙ্গি জামিনে মুক্তি পেয়েছে। এরপর ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত আরও ৩৮০ জন বিভিন্ন মামলায় জামিন পায়। এই দুই ধাপে মোট ১ হাজার ৬১১ জন জামিনে মুক্ত জঙ্গির তথ্য পাওয়া যায়, যাদের বড় একটি অংশ এখন নজরদারির বাইরে রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এই ৩৮০ জনের মধ্যে বিভিন্ন নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনের সদস্য রয়েছে। এর মধ্যে আনসার আল ইসলাম, হিযবুত তাহরীর, নব্য জেএমবি, জেএমবি, এবিটি, হুজি এবং অন্যান্য গোপন বা নামবিহীন সংগঠনের সদস্যরা অন্তর্ভুক্ত। গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, এদের মধ্যে অন্তত ১১৪ জন জামিন পাওয়ার পর থেকে আদালতে আর হাজির হননি। আরও প্রায় ৯৬ জনের বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি।
জামিনের সময়কাল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২৪ সালের শেষার্ধ থেকে ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত প্রতি মাসেই উল্লেখযোগ্য সংখ্যক জঙ্গি জামিনে মুক্ত হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে ২০২৫ সালের মার্চ, মে, জুন ও জুলাই মাসে একাধিক ডজন করে জামিনের ঘটনা রয়েছে, যা গোয়েন্দা মহলে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
একই সঙ্গে আরও একটি বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, সন্ত্রাসবিরোধী আইনে করা মামলায় এখনো অন্তত ৩৭০ জন জঙ্গি পলাতক রয়েছে। এদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকলেও দীর্ঘ সময় ধরে তাদের অবস্থান শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। এই পলাতকদের মধ্যে জেএমবি, হিযবুত তাহরীর, এবিটি, নব্য জেএমবি, আনসার আল ইসলামসহ মোট ৯টি নিষিদ্ধ সংগঠনের সদস্যরা রয়েছে।

জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীতে সতর্কতা, নজরদারি জোরদার। ছবিঃ সংগৃহীত
গোয়েন্দা সূত্র বলছে, পলাতক ও জামিনে থাকা এই জঙ্গি সদস্যদের মধ্যে একটি অংশ বিভিন্ন এলাকায় ছদ্মবেশে অবস্থান করছে এবং স্থানীয় পর্যায়ে ছোট ছোট নেটওয়ার্ক পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে। কিছু ক্ষেত্রে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে আদর্শিক প্রচারণা ও সদস্য সংগ্রহের অভিযোগও পাওয়া গেছে।
পুলিশের অভ্যন্তরীণ তালিকায় দেখা যায়, পলাতক ৩৭০ জনের মধ্যে জেএমবির সদস্যই সবচেয়ে বেশি, এরপর রয়েছে হিযবুত তাহরীর, এবিটি, আনসার আল ইসলাম এবং অন্যান্য সংগঠনের সদস্যরা। এর মধ্যে একটি অংশ শুরু থেকেই গ্রেপ্তার হয়নি, আবার অনেকে বিচার চলাকালে বা তদন্ত পর্যায়ে জামিন নিয়ে পালিয়ে গেছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এই জঙ্গি নেটওয়ার্ক এখনো পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় হয়নি বরং ধাপে ধাপে পুনরায় সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় স্থাপনা, পরিবহন কেন্দ্র এবং জনসমাগমপূর্ণ এলাকায় হামলার ঝুঁকি রয়েছে বলে তারা সতর্ক করেছেন।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, কিছু নিষিদ্ধ সংগঠনের হাতে এখনো বিস্ফোরক, ধারালো অস্ত্র এবং অন্যান্য সহিংস উপকরণ থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। অতীতে এসব উপকরণ ব্যবহার করে বিভিন্ন নাশকতা চালানো হয়েছিল বলেও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী জানান, পলাতক ও জামিনে থাকা জঙ্গিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের জন্য নিয়মিত অভিযান চলছে এবং এই অভিযান আরও জোরদার করা হয়েছে। পাশাপাশি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে বিশেষ নজরদারি রাখা হচ্ছে।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে মামলায় ধীরগতি, জামিন প্রক্রিয়ায় শিথিলতা এবং নজরদারির ঘাটতির কারণে কিছু জঙ্গি সংগঠন আবারও পুনর্গঠনের সুযোগ পেয়েছে। তারা সতর্ক করে বলেন, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে তা বড় ধরনের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
গোয়েন্দা তালিকা অনুযায়ী, গত বছরের জুন পর্যন্ত দেশের ১৬টি কারাগারে ১৬২ জন জঙ্গি বন্দি রয়েছেন। এর মধ্যে বিচারাধীন আছেন ৩২ জন, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ৫৯ জন, যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত ৪৬ জন ও অন্যান্য ২৫ জন।
টাঙ্গাইলের মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. উমর ফারুক বলেন, ‘কারাগার থেকে ঢালাওভাবে জামিন দেওয়াসহ অন্তর্বর্তী সরকারে কিছু ঘাটতি ছিল। এর আগে জেল পলাতক ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করা গেল না। যেহেতু জঙ্গি সংগঠনের সদস্যরা চিহ্নিত ছিল, ফলে তাদের ঢালাওভাবে ছেড়ে দেওয়ায় নিজেদের মতাদর্শ নিয়ে আবারও সংগঠিত হচ্ছে তারা। এর মধ্যে সরকার পরিচালনায় যাঁরা ছিলেন তাঁরা এ বিষয়গুলোতে দৃষ্টিপাত করেননি। যার ফলে উগ্রবাদীরা সুসংগঠিত হয়ে বিভিন্ন জায়গায় হামলা চালানোর পরিকল্পনা করে সংগঠিত হচ্ছে। তারা বিভিন্ন পর্যায়ের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং জনগণের মাঝে আতঙ্ক ও উৎকণ্ঠা তৈরি করতে এরই মধ্যে নিজেদের সংগঠিত করতে শুরু করেছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘এরই মধ্যে সরকারের কাছে সংবাদ আছে, বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় স্থাপনার ব্যাপারে হুমকি রয়েছে। সরকার এ ব্যাপারে কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করছে। বিষয়টি হচ্ছে, যদি অঙ্কুরেই এসব নির্মূল করা না যায়, তাহলে পরে তা মোকাবেলা কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। আমি মনে করি, এ সরকারের যেহেতু দুই মাস হয়েছে, তারা যদি এটা নিয়ে দৃঢ়ভাবে অবস্থান নেয়, তাহলে উত্তরণের সুযোগ আছে। নাহলে সামনের দিনগুলোতে এরা সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।’
সূত্রঃ কালের কণ্ঠ