সংখ্যালঘু নির্যাতন হলে মন্ত্রিত্ব ছাড়তেও প্রস্তুত: ধর্মমন্ত্রী কায়কোবাদ
মেলবোর্ন, ১১ মে- দেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বা ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের ওপর কোনো ধরনের নির্যাতন সহ্য করা হবে না বলে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ…
মেলবোর্ন, ১১ মে- বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর কোন দেশে হবে, তা নিয়ে কূটনৈতিক অঙ্গনে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। সম্ভাব্য গন্তব্য হিসেবে চীন, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের নাম সামনে এলেও সাম্প্রতিক কূটনৈতিক তৎপরতা ইঙ্গিত দিচ্ছে, বেইজিংই হতে পারে তার প্রথম বিদেশ সফরের গন্তব্য। বিশ্লেষকদের মতে, এই সফর শুধু একটি দ্বিপক্ষীয় সফর হবে না, বরং দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি ও আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান এবং বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আগামী জুনে চীন সফরে নেওয়ার জন্য সক্রিয়ভাবে কাজ করছেন। জানা গেছে, গুয়াংজুতে দ্রুত একটি বিডা কার্যালয় চালু করতে একটি চীনা ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠান নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং সেই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তারেক রহমানকে উপস্থিত রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে এই উদ্যোগ আদৌ বড় ধরনের বিনিয়োগ আনতে পারবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সংশ্লিষ্ট মহলের অনেকে মনে করছেন, এর মাধ্যমে মূলত আশিক চৌধুরীর অবস্থান আরও শক্তিশালী করার চেষ্টা চলছে। এর আগে তিনি চীনের তিনটি প্রদেশে উচ্চপর্যায়ের বিনিয়োগ বৈঠক করলেও উল্লেখযোগ্য সাফল্য আসেনি। গত দুই বছরে বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগের স্থবিরতা কাটেনি বলেও আলোচনায় উঠে এসেছে।
গত মাসে বিএনপির মিত্র কয়েকটি রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি দল চীন সফর করে। এরপর প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসনবিষয়ক উপদেষ্টা ইসমাইল জাবিউল্লাহর নেতৃত্বে বিএনপির নেতারাও চীন যান। পরে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা রাশেদ আল তিতুমীরও বেইজিং সফর করেন। এর আগে তিস্তা প্রকল্পকেন্দ্রিক আলোচনায় অংশ নিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানও একটি প্রতিনিধি দল নিয়ে চীন সফর করেন।
এর আগে ভারতের সঙ্গে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা হলেও প্রধানমন্ত্রীর প্রথম বিদেশ সফরের বিষয়ে কোনো সমঝোতা হয়নি। ভারত সফরের ক্ষেত্রে দিল্লি আগে সফরের এজেন্ডা চূড়ান্ত করতে চেয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র সফরের ক্ষেত্রে তারেক রহমানের প্রবেশসংক্রান্ত জটিলতা এখনও পুরোপুরি কাটেনি বলে জানা গেছে।
৭ মে ঢাকার ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে বিএনপির আয়োজিত এক নৈশভোজে বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন অংশ নেন। পরদিন একই হোটেলে “চীন-বাংলাদেশ শাসনব্যবস্থা অভিজ্ঞতা বিনিময়” শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য চীন সফর দুই দেশের কৌশলগত অংশীদারত্বকে আরও শক্তিশালী করবে।
ইয়াও ওয়েন বলেন, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং জনকল্যাণমূলক খাতে বাংলাদেশকে পূর্ণ সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে চীন। তিনি আরও বলেন, নতুন সরকার গঠনের পর দুই দেশের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ বেড়েছে এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাম্প্রতিক চীন সফর ও যৌথ বিবৃতি প্রকাশ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি।
চীনের রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি বেইজিংয়ের দৃঢ় সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন। একই সঙ্গে “এক চীন নীতি” সমর্থনের জন্য বাংলাদেশের প্রতি কৃতজ্ঞতাও জানান।
তিনি দাবি করেন, নতুন সরকার গঠনের পর চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশে প্রায় ১০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে, যা থেকে প্রায় ১০ হাজার কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে। তিস্তা মহাপরিকল্পনা, মোংলা বন্দর আধুনিকীকরণ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের জন্য আন্তর্জাতিক মানের আবাসিক হল নির্মাণসহ একাধিক বড় প্রকল্পে কাজ করছে চীন।
এ ছাড়া সবুজ জ্বালানি, তথ্যপ্রযুক্তি ও বৈদ্যুতিক যানবাহন খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর আগ্রহও প্রকাশ করেন ইয়াও ওয়েন। তিনি বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বাংলাদেশের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে চায় বেইজিং।
উল্লেখযোগ্যভাবে, নতুন বিএনপি সরকার ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা নিয়েছে এবং আগামী মাসে এ সংক্রান্ত নীতিমালা ঘোষণার সম্ভাবনা রয়েছে।
মানুষে-মানুষে যোগাযোগ বৃদ্ধির দিকটিও গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরেন চীনের রাষ্ট্রদূত। তিনি জানান, চলতি বছরে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশিদের জন্য ৩২ হাজার ভিসা ইস্যু করা হয়েছে এবং বছর শেষে এ সংখ্যা এক লাখ ছাড়িয়ে যেতে পারে। বর্তমানে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে প্রতি সপ্তাহে ৪৫টি সরাসরি ফ্লাইট চলাচল করছে।
অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ভারত দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশিদের জন্য পর্যটক ভিসা কার্যত স্থগিত রেখেছে বলেও আলোচনায় উঠে এসেছে।
৭ মে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ঢাকার ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে চীনকে ধন্যবাদ জানিয়ে একটি নৈশভোজের আয়োজন করেন। সেখানে বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতাদের পাশাপাশি চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন এবং দূতাবাসের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। ওই নৈশভোজের পর জানানো হয়, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর আগামী জুনে তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর হতে পারে চীন।
এরপর থেকেই বাংলাদেশের কূটনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন আনুষ্ঠানিকভাবে তারেক রহমানকে চীন সফরের আমন্ত্রণ জানান এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও প্রধানমন্ত্রী লি চিয়াংয়ের শুভেচ্ছা পৌঁছে দেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এই সফর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ওপর “গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব” ফেলবে এবং কৌশলগত সহযোগিতামূলক অংশীদারত্ব আরও জোরদার করবে।
বিএনপি ও চীনা দূতাবাসের নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো বলছে, আগামী মাসে তারেক রহমানের চীন সফর প্রায় নিশ্চিত। সফরের মূল এজেন্ডায় রয়েছে বহুদিন ধরে আলোচনায় থাকা তিস্তা প্রকল্প এবং বাংলাদেশ-চীন-মিয়ানমার সড়ক যোগাযোগ প্রকল্প, যা কুনমিং পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব প্রকল্প শুধু উন্নয়ন বা বাণিজ্যিক উদ্যোগ নয়, বরং সরাসরি ভূরাজনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত। বাংলাদেশ যদি চীনের সহায়তায় এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পারে, তাহলে দক্ষিণ এশিয়ায় শক্তির ভারসাম্যে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বঙ্গোপসাগর ভবিষ্যতে এশিয়ার অন্যতম কৌশলগত শক্তিকেন্দ্র হয়ে উঠছে। মালাক্কা প্রণালিতে কোনো সংকট তৈরি হলে বিকল্প বাণিজ্য ও সামরিক রুটের প্রয়োজন হবে চীনের। এ কারণেই চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলের কৌশলগত গুরুত্ব দ্রুত বাড়ছে।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে দেশটি বর্তমানে জটিল এক ত্রিমুখী ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার কেন্দ্রে অবস্থান করছে। চীন বাংলাদেশে বাণিজ্যিক ও কৌশলগত সামরিক প্রবেশাধিকার চায়, যুক্তরাষ্ট্র চীনের আঞ্চলিক প্রভাব নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায় এবং ভারত তার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আগ্রহী।
বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে বাংলাদেশ বড় শক্তিগুলোর প্রক্সি প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রেও পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। সে কারণে তারেক রহমানের সম্ভাব্য চীন সফর শুধু একটি কূটনৈতিক সফর নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত ভবিষ্যতের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সূত্রঃ নর্থইস্ট নিউজ
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au