মিরাজ শেখ নিখোঁজ: মানবাধিকার প্রতিশ্রুতির প্রথম বড় পরীক্ষায় বিএনপি
মেলবোর্ন, ২১ জুলাই: উপকূলীয় জেলে মিরাজ শেখের কথিত নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাকে ঘিরে বাংলাদেশে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, ২০২৪ সালের…
মেলবোর্ন, ২১ জুলাই- বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে একদিকে আমদানি ও শিল্প বিনিয়োগে স্থবিরতা, অন্যদিকে প্রত্যাশার তুলনায় দুর্বল রফতানি প্রবৃদ্ধি অর্থনীতির জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। শিল্পের কাঁচামাল ও মূলধনি যন্ত্রপাতির আমদানি কমে যাওয়ায় উৎপাদন কার্যক্রমে মন্থরতা দেখা দিয়েছে। একই সময়ে রফতানিও কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে না পারায় বাণিজ্য ঘাটতি প্রায় ২৪ শতাংশ বেড়েছে। তবে রেকর্ড পরিমাণ প্রবাসী আয় দেশের বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য রক্ষা এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রেখেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ইকোনমিক ইন্ডিকেটরস, ব্যালান্স অব পেমেন্ট (বিওপি) প্রতিবেদন এবং রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য বিশ্লেষণে এ চিত্র উঠে এসেছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, উচ্চ সুদের হার, বড় শিল্পগোষ্ঠীর আর্থিক সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং ব্যবসায়ীদের আস্থার ঘাটতির কারণে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বৈদেশিক বাণিজ্য প্রত্যাশিত গতি ফিরে পায়নি।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে ঋণপত্রের (এলসি) মাধ্যমে আমদানি দায় পরিশোধ হয়েছে ৭০ দশমিক ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় মাত্র শূন্য দশমিক ০৯ শতাংশ বেশি। শিল্প উৎপাদন ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমের অন্যতম সূচক হিসেবে বিবেচিত এই পরিসংখ্যান ইঙ্গিত দিচ্ছে যে দেশের শিল্প খাত এখনও পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। তবে নতুন আমদানি ঋণপত্র খোলার পরিমাণ ৭ শতাংশ বেড়ে ৭৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানো ভবিষ্যতে আমদানি কিছুটা বাড়ার সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক চিত্র দেখা গেছে শিল্পের কাঁচামাল ও মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানিতে। অর্থবছরে শিল্পের কাঁচামাল আমদানি ৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ কমে ২৩ দশমিক ১৮ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। একই সঙ্গে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি ১০ দশমিক ৬৮ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১ দশমিক ৮০ বিলিয়ন ডলারে। ভোগ্যপণ্য ও মধ্যবর্তী পণ্যের আমদানিও প্রায় ৭ শতাংশ কমেছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, নতুন বিনিয়োগ কমে যাওয়া ভবিষ্যতের উৎপাদন ও রফতানির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে জ্বালানি খাতে ব্যতিক্রমী প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। পেট্রোলিয়াম পণ্যের আমদানি বেড়ে হয়েছে ১০ দশমিক ৬৮ বিলিয়ন ডলার।
ব্যাংকার ও ব্যবসায়ীদের মতে, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর কয়েকটি বড় শিল্পগোষ্ঠীর উৎপাদন কার্যক্রম সীমিত হয়ে পড়েছে। নাসা গ্রুপ, বেক্সিমকো গ্রুপ ও গাজী গ্রুপের অনেক কারখানা বন্ধ অথবা সীমিত সক্ষমতায় পরিচালিত হচ্ছে। পাশাপাশি উচ্চ সুদের হার, ঋণের ব্যয় বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগ অনিশ্চয়তাও আমদানি কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ।
রফতানি খাতেও প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের মোট পণ্য রফতানি হয়েছে প্রায় ৪৮ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় শূন্য দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। অথচ সরকারের লক্ষ্য ছিল ৫৫ বিলিয়ন ডলার। দেশের মোট রফতানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশই আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। এই খাত থেকে আয় হয়েছে প্রায় ৩৮ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার। রফতানিকারকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক, ইউরোপীয় বাজারে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি, বৈশ্বিক চাহিদা কমে যাওয়া, জ্বালানি সংকট এবং লজিস্টিকস ব্যয় বৃদ্ধির কারণে রফতানি কাঙ্ক্ষিত হারে বাড়েনি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে দেশের আমদানি হয়েছে ৬৪ দশমিক ০২ বিলিয়ন ডলার এবং একই সময়ে রফতানি হয়েছে ৪০ দশমিক ০৪ বিলিয়ন ডলার। ফলে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৩ দশমিক ৯৮ বিলিয়ন ডলারে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২৪ শতাংশ বেশি। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদে এই প্রবণতা বৈদেশিক খাতের ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
তবে বৈদেশিক খাতের সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিক ছিল রেকর্ড প্রবাসী আয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশে এসেছে ৩৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স, যা আগের বছরের তুলনায় ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ বেশি। এই প্রবাহ চলতি হিসাবের ঘাটতি কমিয়েছে এবং আর্থিক হিসাবে ৪ দশমিক ১৬ বিলিয়ন ডলারের উদ্বৃত্ত সৃষ্টি করেছে। একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও বেড়ে বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে ৩২ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা এক বছর আগে ছিল ২৬ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার।
বৈদেশিক বাণিজ্যে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে সরকার দেশের প্রথম ফ্রি ট্রেড জোন (এফটিজেড) চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে এফটিজেডে বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন ও আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় নীতিমালা জারি করেছে। নতুন ব্যবস্থায় এলসি ছাড়াই কাঁচামাল আমদানি, শুল্কমুক্ত সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, পুনঃরফতানি ও সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও সহজ করার সুযোগ থাকবে। ব্যবসায়ীদের আশা, এতে উৎপাদন ব্যয় কমবে, রফতানি প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ সহজ হবে।
বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, শিল্পের কাঁচামাল ও মূলধনি যন্ত্রপাতির আমদানি কমে যাওয়া ভবিষ্যৎ উৎপাদন ও রফতানির জন্য সতর্কবার্তা। তিনি মনে করেন, ব্যবসার ব্যয় কমানো, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, বন্দর ও লজিস্টিকস ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং নতুন বাজারে প্রবেশ নিশ্চিত করা ছাড়া বৈদেশিক বাণিজ্যে কাঙ্ক্ষিত গতি ফিরবে না।
অন্যদিকে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, এলডিসি থেকে উত্তরণ, বৈশ্বিক সংঘাত এবং প্রতিযোগী দেশগুলোর মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির কারণে আগামী দিনগুলো আরও চ্যালেঞ্জিং হবে। তার মতে, ব্যবসা সহজীকরণ, ন্যাশনাল সিঙ্গেল উইন্ডো কার্যকর করা, রফতানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনা এবং দ্রুত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদনের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রেমিট্যান্স আপাতত বৈদেশিক খাতকে স্বস্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদে টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য উৎপাদনমুখী বিনিয়োগ বাড়ানো, শিল্পের সক্ষমতা পুনরুদ্ধার, রফতানি পণ্য ও বাজারে বৈচিত্র্য আনা এবং কার্যকর বাণিজ্য সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই। অন্যথায় বর্তমান বৈদেশিক বাণিজ্যের চাপ আগামী অর্থবছরগুলোতেও দেশের অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকতে পারে।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au