বিশ্ব

শিক্ষা, প্রযুক্তি ও উন্নয়নে আরও ঘনিষ্ঠ হচ্ছে বাংলাদেশ-রাশিয়া সম্পর্ক

  • 10:20 pm - July 31, 2026
  • পঠিত হয়েছে:১৪১ বার
ছবি: সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ৩১ জুলাই: ভৌগোলিক অবস্থান, জলবায়ু, ভাষা ও সংস্কৃতিতে বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে বিস্তর পার্থক্য থাকলেও শিক্ষা, প্রযুক্তি, জ্বালানি, বিজ্ঞান ও মানবসম্পদ উন্নয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে দুই দেশের সম্পর্ক ক্রমেই শক্তিশালী হচ্ছে। স্বাধীনতার পর থেকে কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সহযোগিতার পাশাপাশি শিক্ষা ও প্রযুক্তি বিনিময়ও নতুন মাত্রা পেয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু হওয়া বন্ধুত্ব

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্র সপ্তম নৌবহর বঙ্গোপসাগরে পাঠালে সোভিয়েত ইউনিয়ন পাল্টা নৌবহর ও একটি পারমাণবিক সাবমেরিন মোতায়েন করে।

স্বাধীনতার পর চট্টগ্রাম বন্দরের মাইন অপসারণ, উদ্ধারকাজ এবং দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারেও সোভিয়েত নৌবাহিনী সহায়তা দেয়। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭১ সালেই সোভিয়েত ইউনিয়ন দেশটিকে স্বীকৃতি দেয়। পরে ১৯৭২ সালের ২৫ জানুয়ারি দুই দেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়।

অর্থনীতি ও জ্বালানি খাতে বিস্তৃত সহযোগিতা

স্বাধীনতার পর থেকে রাশিয়া বাংলাদেশের অন্যতম উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে কাজ করছে। বাংলাদেশ রাশিয়া থেকে সার, খাদ্যপণ্য, প্রযুক্তি এবং বিভিন্ন সামরিক সরঞ্জাম আমদানি করে।

দুই দেশের সহযোগিতার সবচেয়ে বড় উদাহরণ রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্প। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অবকাঠামো প্রকল্পটি রাশিয়ার কারিগরি সহায়তা ও অর্থায়নে বাস্তবায়ন হচ্ছে। এ প্রকল্পে রাশিয়া বড় অঙ্কের ঋণও দিয়েছে।

সাহিত্য ও সংস্কৃতিতেও রয়েছে গভীর সম্পর্ক

অর্থনৈতিক সহযোগিতার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও দুই দেশের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের অনেক সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবী লিও টলস্টয়, ফিওদর দস্তয়েভস্কি, ইভান তুর্গেনেভসহ বিখ্যাত রুশ সাহিত্যিকদের রচনা বাংলায় অনুবাদ করেন।

এসব অনুবাদ বাংলাদেশের সাহিত্য, সংস্কৃতি ও চিন্তাচর্চায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে এবং দুই দেশের সাংস্কৃতিক সম্পর্ককে আরও গভীর করেছে।

দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ

স্বাধীনতার পর নানা প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির অন্যতম দেশে পরিণত হয়েছে।

দেশের অর্থনীতিতে কৃষি, তৈরি পোশাক শিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি, প্রবাসী আয় এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পে বাংলাদেশ বর্তমানে চীনের পর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানিকারক দেশ।

এ ছাড়া তথ্যপ্রযুক্তি, ফ্রিল্যান্সিং, স্টার্টআপ ও অনলাইনভিত্তিক কর্মসংস্থানে তরুণদের অংশগ্রহণ বাড়ছে, যা দেশের অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে।

শিক্ষায় বাড়ছে সহযোগিতা

বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ-রাশিয়া সম্পর্কের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি এখন শিক্ষা।

প্রতি বছর শত শত বাংলাদেশি শিক্ষার্থী চিকিৎসাবিজ্ঞান, প্রকৌশল, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন বিষয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য রাশিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি হচ্ছেন।রাশিয়া সরকারও বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তির সংখ্যা বাড়িয়েছে। ২০১৮ সালে যেখানে ৬৫টি বৃত্তি ছিল, ২০২৬ সালে তা বেড়ে ২০০টিতে পৌঁছেছে।

এ ছাড়া বিশ্ব যুব উৎসব, ইস্টার্ন ইকোনমিক ফোরামসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক কর্মসূচিতে বাংলাদেশি তরুণদের অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। চলতি বছর প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নির্বাচিত ছয়জন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ‘চিলড্রেন ফর পিস’ আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন।

রাশিয়ায় পড়াশোনা শেষে দেশে ফিরে এসব শিক্ষার্থী বিভিন্ন খাতে কাজ করার পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে জ্ঞান ও সংস্কৃতির সেতুবন্ধন হিসেবেও ভূমিকা রাখছেন।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে রাশিয়ার শক্ত অবস্থান

রাশিয়া দীর্ঘদিন ধরেই বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও গবেষণায় বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ দেশ।

বিশ্বের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ ‘স্পুটনিক’ উৎক্ষেপণ এবং মহাকাশে প্রথম মানুষ হিসেবে ইউরি গ্যাগারিনকে পাঠানোর কৃতিত্ব রাশিয়ার। বর্তমানে দেশটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মহাকাশ গবেষণা, পারমাণবিক প্রযুক্তি, চিকিৎসাবিজ্ঞান ও উন্নত প্রকৌশলে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জন করেছে।

রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রোসাটম বিশ্বজুড়ে পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। একই সঙ্গে রাশিয়ান একাডেমি অব সায়েন্সেস দেশটির অন্যতম প্রধান বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিশ্বব্যাপী পরিচিত।

ভিন্ন সংস্কৃতি, কিন্তু অভিন্ন লক্ষ্য

জলবায়ু, ইতিহাস ও জীবনধারায় বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। নদীমাতৃক বাংলাদেশে কৃষি, পরিবার ও সামাজিক বন্ধন মানুষের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অন্যদিকে রাশিয়া তার সমৃদ্ধ সাহিত্য, সংগীত, শিল্পকলা ও ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত।

তবে এই পার্থক্য দুই দেশের সম্পর্ককে দুর্বল করেনি। বরং শিক্ষা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও মানবসম্পদ উন্নয়নে সহযোগিতা বাড়ার ফলে দুই দেশের জনগণের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও বন্ধুত্ব আরও দৃঢ় হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতেও শিক্ষা, গবেষণা, প্রযুক্তি, জ্বালানি এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে যৌথ উদ্যোগ বাংলাদেশ ও রাশিয়ার সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করবে এবং দুই দেশের জন্য নতুন সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি করবে।

 

এই শাখার আরও খবর

দক্ষিণ আফ্রিকায় দুই মাসে ১০ নারীর মরদেহ উদ্ধার

দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গের পূর্বাঞ্চলীয় একুরহুলেনি এলাকায় গত দুই মাসে ১০ নারীর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সর্বশেষ শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) তেম্বিসার ভুসিমুসি এলাকায়…

অসৎ মানুষের হাতে এআই গেলে ১০০ কোটি মানুষের মৃত্যু হতে পারে: বিল গেটস

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের সম্ভাব্য ভয়াবহ ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করেছেন মাইক্রোসফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস। তার আশঙ্কা, সর্বাধুনিক এআই প্রযুক্তি অসৎ উদ্দেশ্যসম্পন্ন মানুষের হাতে গেলে এমন…

বিদেশি পর্যটক কমছে বাংলাদেশে, ছয় মাসে আগমন কমেছে ২০ শতাংশ

রাজনৈতিক অস্থিরতা, নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এবং পর্যটন অবকাঠামো ও সেবার ঘাটতির কারণে বাংলাদেশে বিদেশি পর্যটকের আগমন ধারাবাহিকভাবে কমছে। চলতি ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে দেশে…

চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি, সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও গুড়িয়ে দিল বিএনপির নেতাকর্মীরা

চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানানোর জেরে কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) মধ্যরাতে রাজধানীর ইসিবি চত্বর এলাকার নিউগ্রিনি…

৩৪ লাখ শিশুকে দ্রুত টিকা দেওয়ার আহ্বান বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার

বাংলাদেশে হাম সংক্রমণ অব্যাহত থাকায় আগের টিকাদান কর্মসূচির সময় টিকা না পাওয়া প্রায় ৩৪ লাখ শিশুকে দ্রুত টিকার আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা…

পারমাণবিক শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের নতুন চুক্তি

শান্তিপূর্ণভাবে পারমাণবিক শক্তির ব্যবহার এবং বেসামরিক পারমাণবিক প্রযুক্তিতে সহযোগিতা আরও গভীর করতে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র কৌশলগত বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতার বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au