হাহাকারের ভেতরেই নতুন বন্যা আতঙ্ক: নেপালে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি
নেপালে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার ক্ষত না শুকাতেই নতুন করে বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ভোটোকেশী নদীর পানি দ্রুত বাড়তে থাকায় রোববার (৩০ আগস্ট) দেশটির কর্তৃপক্ষ সর্বোচ্চ…
নেপালে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার হাত থেকে একটি বিদ্যালয়ের ১ হাজার ৬৪৩ শিক্ষার্থীর জীবন রক্ষা করেছেন প্রধান শিক্ষক রাজেন্দ্র দাওয়াদি। শেষ মুহূর্তে বিপদের আশঙ্কা বুঝতে পেরে তিনি শিক্ষার্থীদের দ্রুত বিদ্যালয় থেকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেন। শিক্ষার্থীদের সরিয়ে নেওয়ার কিছুক্ষণ পরই প্রবল স্রোতে বিদ্যালয় ভবনটি ধ্বংস হয়ে যায়।
রাজেন্দ্র দাওয়াদি নেপালের ত্রিভুবন ত্রিশূলী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। পাশাপাশি তিনি বিদ্যালয়ে ইংরেজি পড়ান। বুধবার সকালে বিদ্যালয়ে অবস্থান করার সময় স্থানীয় সময় প্রায় সকাল ৯টা ২০ মিনিটে এক বন্ধু তাকে ফোন করে সতর্ক করেন। বন্ধু জানান, কাছের একটি গ্রাম নদীর পানিতে ভেসে গেছে এবং ভয়াবহ স্রোত দ্রুত বিদ্যালয়ের দিকে এগিয়ে আসছে। তিনি রাজেন্দ্রকে দ্রুত নিরাপদ স্থানে চলে যাওয়ার পরামর্শ দেন।
প্রথমে রাজেন্দ্র দাওয়াদি মনে করেছিলেন, বিদ্যালয়ের তিনতলা কংক্রিটের ভবনটি নিরাপদ। ভবনটি নদী থেকে প্রায় ৬০ মিটার উঁচু জায়গায় অবস্থিত হওয়ায় তার এমন ধারণা হয়েছিল। কিন্তু কিছুক্ষণ পর এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক বিদ্যালয়ে এসে জানান, পানির উচ্চতা দ্রুত বাড়ছে।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝতে পেরে আর সময় নষ্ট করেননি রাজেন্দ্র। তিনি বিদ্যালয়ের ঘণ্টা বাজিয়ে দেন এবং শিক্ষকদের দ্রুত শ্রেণিকক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের বের করে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে বিদ্যালয়ের বাসচালকদের ফোন করে দ্রুত শিক্ষার্থীদের সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করতে বলেন।
তবে একটি বাসের সঙ্গে তখন যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। ওই বাসটি সে সময় একটি সেতু পার হচ্ছিল। এদিকে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা দ্রুত উঁচু এলাকার দিকে যেতে শুরু করে। আতঙ্কের মধ্যে এক ছাত্রী অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে মোটরসাইকেলে করে পাহাড়ের ওপর নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। অন্য শিক্ষার্থীরা হেঁটে ও দৌড়ে উঁচু জায়গার দিকে চলে যায়।
সব শিক্ষার্থীকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার পর রাজেন্দ্র দাওয়াদিও বিদ্যালয় ছেড়ে তাদের পিছু নেন। পরে শিক্ষার্থীরা একটি বোধিবৃক্ষের নিচে আশ্রয় নেয়। এর কিছুক্ষণ পরই ভয়াবহ বন্যার পানি ওই এলাকায় আছড়ে পড়ে।
প্রবল স্রোতের সঙ্গে কাদা, পাথর, বরফ ও বিভিন্ন ধ্বংসাবশেষ ভেসে আসে। এতে আশপাশের বহু ঘরবাড়ি, সেতু ও অন্যান্য স্থাপনা ধ্বংস হয়ে যায়। এমনকি যে তিনতলা বিদ্যালয় ভবনটিকে রাজেন্দ্র প্রথমে নিরাপদ মনে করেছিলেন, সেটিও বন্যার স্রোতে ধ্বংস হয়ে যায়।
তবে সৌভাগ্যক্রমে বিদ্যালয়ের ১ হাজার ৬৪৩ শিক্ষার্থীর সবাই প্রাণে বেঁচে যায়। বিদ্যালয়ের অধিকাংশ কর্মীও নিরাপদে বের হতে সক্ষম হন। তবে বন্যার ভয়াবহ স্রোতে বিদ্যালয়ের দুই কর্মী নিখোঁজ হন এবং পরে তাদের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়।
নিহতদের একজন সন্তোষ পরিয়ার, বয়স ৩২ বছর। তিনি বিদ্যালয়ের সামাজিক ইতিহাসের শিক্ষক ছিলেন। বুধবার সকালে নদীর কাছে ভাড়া করা বাসায় খাবার রান্না করতে ফিরে যাওয়ার সময় প্রবল স্রোতে ভেসে যান তিনি। অপরজন বিদ্যালয়ের দারোয়ান সুলতান লামা। বিদ্যালয়ের দরজা বন্ধ করতে যাওয়ার পর তিনি নিখোঁজ হন।
নেপাল-তিব্বত সীমান্তের কাছাকাছি লাংতাং লিরুং শৃঙ্গ এলাকা থেকে বিপুল পরিমাণ বরফ ও পাথর ধসে পড়ার পর এই আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হয়। বরফ ও পাথরের বিশাল স্তূপ লেন্দে খোলা নদীর ওপরের দিকে প্রায় ১ হাজার ২০০ মিটার নিচে আছড়ে পড়ে। এতে নদীর পানির প্রবাহ হঠাৎ ভয়াবহ রূপ নেয় এবং আশপাশের এলাকায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ শুরু হয়।
এই দুর্যোগে নেপাল ও তিব্বতের বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক প্রাণহানি হয়েছে। নেপালে এখন পর্যন্ত ৭৬৮ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে এবং ২ হাজার ৫০০ জনের বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। অন্যদিকে চীনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তিব্বতে ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ৫৪৬ জন এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।
বন্যার কারণে বেশ কয়েকটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেলের ভেতরে শতাধিক শ্রমিক আটকা পড়ে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তাদের উদ্ধারে উদ্ধারকারী দল কাজ করছে। নেপালি সেনাবাহিনী ত্রিশূলী জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের একটি টানেলে পাইপের মাধ্যমে বাতাস পাঠানোর ব্যবস্থা করেছে।
ভয়াবহ এই দুর্যোগের মধ্যেও প্রধান শিক্ষক রাজেন্দ্র দাওয়াদির সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত, সাহস ও দ্রুত পদক্ষেপে ১ হাজার ৬৪৩ শিক্ষার্থীর প্রাণ রক্ষা পাওয়ার ঘটনা স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। নিজের নিরাপত্তার কথা না ভেবে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়ায় তাকে অনেকেই এই দুর্যোগের অন্যতম নায়ক হিসেবে দেখছেন।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au