প্রাথমিকে ঝরে পড়া শিশুদের বৃহত অংশের গন্তব্য মাদ্রাসা,কর্মমুখী শিক্ষা থেকে পিছিয়ে মাদ্রাসাগুলো । ছবি: সংগৃহীত
প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ, দেশে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া এসব শিশুদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বিভিন্ন কারণে শিক্ষাজীবনের মাঝপথে ঝরে পড়ছে।ঝরে পড়া এসব শিশুর বড় একটি অংশ পরবর্তীতে বিভিন্ন ধরনের মাদ্রাসায় ভর্তি হচ্ছে।
বিশেষ করে বিনামুল্যে বা স্বল্প ব্যায়ে শিক্ষার সুযোগ নিতে নিম্ন আয়ের দরিদ্র পরিবার গুলো সন্তানদের মাদ্রাসা মুখী করছে।নিম্ন আয়ের কর্মমুখী পরিবারের বাবা-মা দুজনকেই যখন কাজের খাতিরে বাহিরে থাকতে হচ্ছে,তখন সন্তানের দেখাশুনার পাশাপাশি নাম মাত্র মুল্যে পড়াশুনার নামই হচ্ছে মাদ্রাসা।দেশের শিল্প শহড় গুলোতে এই প্রবনতা বেশী হবার কারনে যত্রতত্র মাদ্রাসা গড়ে উঠেছে।মাদ্রাসা গুলো ধর্মীয় অনুভুতিকে পুঁজি করে ইসলামি শিক্ষা প্রদান করলেও নেই কর্মমুখী শিক্ষার ব্যাবস্থা,ফলে মাদ্রাসা শিক্ষা শেষ করে বৃহত একটি অংশ প্রতিযোগীতা মুলক কর্মসংস্থান বাজার থেকে ছিঁটকে পড়ছে।
শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষা ব্যবস্থায় মৌলিক সংস্কার না এলে ধর্মভিত্তিক শিক্ষার প্রতি এই ঝোঁক আরও বাড়তে পারে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রাথমিক শিক্ষায় ভর্তি হার বৃদ্ধি পেলেও বিদ্যালয় ত্যাগের হার এখনও উদ্বেগজনক। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রাথমিক স্তরে ঝরে পড়ার হার প্রায় ১৩-১৬ শতাংশের মধ্যে ওঠানামা করছে।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের (ডিপিই)বার্ষিক প্রাথমিক বিদ্যালয় শুমারি এপিএসসি/এপিএসএস এর প্রতিবেদন অনুযায়ী,বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষায় সাইকেল ড্রপআউট রেট ২০২০ সালে ১৭.২০%শতাংশ,২০২১সালে ১৪.১৫% শতাংশ ২০২২ সালে১৩.৯৫% শতাংশ,২০২৩ সালে ১৩.১৫% শতাংশ,২০২৪ সালে ১৬.২৫% শতাংশ,
২০২৫ সালের প্রতিবেদন হাতে পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে দেশে নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত মাদ্রাসার সংখ্যা দুই দশক ধরে উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।শিক্ষা সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী—দেশে সরকারি বেসরকারি মিলিয়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা প্রায় ৬৫ হাজারের বেশি।
২০২৬ সালে সংসদে দেওয়া ভাষনে শিক্ষামন্ত্রীর তথ্য অনুযায়ী কওমী মাদ্রাসার সংখ্যা ২৫ হাজার, বেসরকারি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী সেটি ৩৬ হাজার এবং ছাত্র ছাত্রীর সংখ্যা ৭০লাখ বলে দাবী করা হয়।
কওমি মাদ্রাসাগুলোর একটি বড় অংশ সরাসরি সরকারি নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির বাইরে পরিচালিত হয়।দরিদ্র পরিবারের অনেক শিক্ষার্থী আবাসন, খাদ্য ও কম খরচে শিক্ষার সুবিধার কারণে মাদ্রাসায় ভর্তি হচ্ছে।শিক্ষা উপকরণের ব্যয় বাড়ার চাপে অভিভাবকরা উদ্বিগ্ন, প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে মাধ্যমিকে ভর্তি হওয়ার পর পাঠ্যপুস্তক, খাতা, পোশাক, কোচিং, যাতায়াত ও অন্যান্য শিক্ষা উপকরণের ব্যয় মিটাতে নিম্ন আয়ের পরিবারের অনেক অভিভাবক হিমশিম খাচ্ছেন।
মাদ্রাসায় পড়া শিক্ষার্থীর অভিভাবক রমযান আলী বলেন, “সরকারি স্কুলে পড়াতে বই-খাতা, পোশাক আর অন্যান্য খরচ মেলাতে কষ্ট হয়। মাদ্রাসায় থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থাও থাকে, তাই দারিদ্রতার মাঝে সন্তান কে শিক্ষা দিতে অনেকের মত আমিও স্কুল থেকে নিয়ে সন্তানকে মাদ্রাসায় দিয়েছি”
মাদ্রাসাগুলোতে তদারকির অভাবে গুনগত মানের শিক্ষার অভাব থাকায় অভিভাবকদের উদ্বেগ বৃদ্ধি পেয়েছে,শিক্ষাবিদ ও শিশু অধিকার কর্মীদের অভিযোগ, দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও মানদণ্ড ছাড়াই অনেক মাদ্রাসা গড়ে উঠছে। এসব প্রতিষ্ঠানের একটি অংশে পর্যাপ্ত তদারকি না থাকায় শিক্ষার মান, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও শিশু অধিকার নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
সাম্প্রতিক সময়ে সংবাদমাধ্যমে শিশু নির্যাতন, শারীরিক শাস্তি এবং যৌন নির্যাতনের মত ভয়াবহ অভিযোগ সামনে এলেও অনেক ঘটনা সামাজিক ও পারিবারিক কারণে আড়ালেই থেকে যাচ্ছে, ফলে দোষীরা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাহিরে এমন দাবি সচেতন মহলের।
মাদ্রাসা গুলোতে ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি কর্মমুখী শিক্ষা ব্যাবস্থা না থাকায় বৃহত একটি অংশ প্রতিযোগীতা মুলক কর্মসংস্থানে পিছিয়ে পড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রচলিত মাদ্রাসা শিক্ষার অনেক ধারায় আধুনিক বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও কর্মমুখী শিক্ষার পর্যাপ্ত সুযোগ না থাকায় শিক্ষার্থীদের একটি অংশ মূলধারার চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে।ফলে উপায়ন্ত না পেয়ে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে ইমামতি,খতিব বা শিক্ষকতার মতো পেশায় যুক্ত হন।কেউ কেউ নিজ এলাকায় নতুন মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করে শিক্ষকতা শুরু করেন।
২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি জাতীয় গবেষণায় ২০২২ সালের হাউস হোল্ড ইনকাম এন্ড এক্সপেন্ডিটর সার্ভে তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে। মাদ্রাসা শিক্ষাপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা সাধারণ শিক্ষার শিক্ষার্থীদের তুলনায় কর্মসংস্থানে পিছিয়ে আছেন। বিশেষ করে কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে কম এবং আয় অনেকাংশে কম।গবেষণাটিতে আরও দেখা যায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থানের হার ছিল প্রায় ৪১.৬% শতাংশ সেখানে আলিয়া মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে তা ৩৮.৩% শতাংশ।কওমি মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে ৩৯.৯% শতাংশ।
কওমি মাদ্রাসা থেকে আসা ব্যক্তিরা তুলনামূলক বেশি অনানুষ্ঠানিক, স্বনিয়োজিত ও কৃষিভিত্তিক কাজে যুক্ত হবার সংখ্যা বহুলাংশে বেশী।
বিভিন্ন গবেষণা ও শিক্ষাবিদদের পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ স্বল্প বেতনে মসজিদে ইমাম, মুয়াজ্জিন বা খতিব হিসেবে কাজ করেন নতুবা মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করেন, অথবা ক্ষুদ্র ব্যবসা বা স্বনিয়োজিত পেশায় যুক্ত হন।
সীমিত সংখ্যক শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষায় গিয়ে সরকারি- বেসরকারি চাকরিতে প্রবেশ করেন।
ব্রাক ইনস্টিটিউট অফ গভর্নেন্স ডেভলপমেন্ট (বিআইজিডি)র এক গবেষণায় দাবি করা হয়েছে, মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ শ্রমবাজারে কাঙ্ক্ষিত চাকরি পান না এবং দক্ষতার ঘাটতির কারণে অনেকেই বেকার থাকেন।
গবেষণাটিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে প্রায় ৭৫ শতাংশ মাদ্রাসা শিক্ষার্থী উপযুক্ত কর্মসংস্থান থেকে বঞ্চিত থাকে বলে গবেষকদের পর্যবেক্ষণ মনে করে।
লালমনিরহাট বেগম কামরুন্নেছা ডিগ্রি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ শিক্ষাবিদ আমিরুল হায়াত মুকুল বলেন, মাদ্রাসা শিক্ষা একদিকে ধর্মীয় শিক্ষার প্রসার ঘটালেও অন্যদিকে দেশের কর্মমুখী ও প্রযুক্তিনির্ভর মানবসম্পদ গঠনের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
তার মতে, মাদ্রাসা শিক্ষাকে সময়োপযোগী ও আধুনিক করতে বিজ্ঞান, তথ্যপ্রযুক্তি, কারিগরি ও কর্মমুখী বিষয়গুলো বাধ্যতামূলকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি সকল ধরনের মাদ্রাসার জন্য একীভূত নিবন্ধন, নিয়মিত তদারকি, শিশু সুরক্ষা নীতিমালা এবং জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।এর পাশাপাশি দরিদ্র পরিবার গুলো যাতে অর্থনৈতিক কারণে সন্তানদের মূল ধারার শিক্ষা থেকে সরিয়ে নিতে বাধ্য না হয়, সেজন্য মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষা উপকরণে ভর্তুকি, বৃত্তি বৃদ্ধি এবং স্কুলভিত্তিক সহায়তা কর্মসূচি চালু করা জরুরি।
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্র বিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ড. মোঃ তানজিউল ইসলাম বলেন, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাকে আরও সাশ্রয়ী, মানসম্মত ও কর্মমুখী করা না গেলে আগামী দিনে আরও বেশি শিক্ষার্থী মাদ্রাসা ভিত্তিক শিক্ষার দিকে ঝুঁকতে পারে। তাই জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, মাদ্রাসা শিক্ষার সংস্কার এবং কার্যকর তদারকির মাধ্যমে সকল শিশুর জন্য সমান ও মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরী বলে মনে করেন।
মতামত: মিজানুর রহমান