বাংলাদেশে হামে আরও ৪ শিশুর মৃত্যু, মৃতের সংখ্যা ১ হাজার ১১৪।ছবিঃ সংগৃহীত
বাংলাদেশে হামের প্রকোপে আরও চার শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এতে চলতি বছরে হাম ও হামের মতো উপসর্গে নিশ্চিত ও সন্দেহভাজন মৃত্যুর সম্মিলিত সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১১৪ জনে। শুক্রবার সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় এই চারজনের মৃত্যু হয়েছে বলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যের বরাতে জানিয়েছে ইউনাইটেড নিউজ অব বাংলাদেশ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, সর্বশেষ মারা যাওয়া চার শিশুর মধ্যে একজনের মৃত্যু হামে নিশ্চিত হয়েছে। বাকি তিনজনের মৃত্যু হামের সন্দেহভাজন হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, দেশে নিশ্চিত হামে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে ১০২ জনে এবং সন্দেহভাজন মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১২ জনে।
এদিকে হামের সংক্রমণও দ্রুত বাড়ছে। আগের ২৪ ঘণ্টায় দেশে হামের ১ হাজার ২২১টি নতুন সন্দেহভাজন রোগী শনাক্ত হয়েছে। এতে চলতি বছরে সন্দেহভাজন রোগীর মোট সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৯৪ হাজার ৮৪ জনে। একই সময়ে নতুন করে ২১ জনের শরীরে হামের সংক্রমণ পরীক্ষায় নিশ্চিত হয়েছে। ফলে দেশে лаборатরি পরীক্ষায় নিশ্চিত হামে আক্রান্তের মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২১ হাজার ৬২৩ জনে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হামের মতো উপসর্গ নিয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ লাখ ৭২ হাজার ২১ জন। তাদের মধ্যে ১ লাখ ৬৬ হাজার ৯৩৩ জন সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন।
চলতি বছরের মার্চ থেকে দেশে হামের সংক্রমণ ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সরকার এপ্রিল ও মে মাসে জরুরি টিকাদান কর্মসূচি এবং জুলাইয়ের শেষ দিকে বিশেষ টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনা করলেও এরপরও মৃত্যু ও হাসপাতালে রোগী ভর্তির সংখ্যা কমেনি। সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে নিশ্চিত ও সন্দেহভাজন মৃত্যুর সম্মিলিত সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়ে যায়।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এর আগে হামের সংক্রমণ বাড়ার পেছনে আগের বছরগুলোর টিকাদান কর্মসূচিতে ঘাটতি এবং হাসপাতাল ও রোগী ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন সমস্যার কথা বলেছেন। বিশেষ করে আক্রান্ত শিশুদের দ্রুত শনাক্ত করা, প্রয়োজন অনুযায়ী আলাদা রাখা এবং চিকিৎসা ব্যবস্থায় সময়মতো পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ বলে তারা উল্লেখ করেছেন।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হুসাইন দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, টিকা নেওয়ার পর শিশুদের শরীরে পর্যাপ্ত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হতে সাধারণত তিন থেকে চার সপ্তাহ সময় লাগে। সে কারণে বর্তমান সংক্রমণ, হাসপাতালে ভর্তি এবং মৃত্যুর প্রবণতা আরও অন্তত এক মাস অব্যাহত থাকতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
এদিকে কানাডাভিত্তিক গ্লোবাল সেন্টার ফর ডেমোক্রেটিক গভর্ন্যান্সের এক প্রতিবেদনে ২০২৬ সালের বাংলাদেশের হামের পরিস্থিতিকে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম গুরুতর জনস্বাস্থ্য সংকট হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ‘প্রিভেন্টেবল ট্র্যাজেডি: বাংলাদেশস ২০২৬ মিজলস আউটব্রেক’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মহামারির মতো সংক্রমণটি হঠাৎ দেখা দিলেও এর পেছনে আগের কয়েক বছরের বিভিন্ন ঘাটতি ভূমিকা রেখেছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
প্রতিবেদনটিতে ২০২৪ ও ২০২৫ সালে টিকা সরবরাহ ও স্বাস্থ্য কর্মসূচিতে বিঘ্ন, নিয়মিত টিকাদান থেকে অনেক শিশুর বাদ পড়া, নির্ধারিত অতিরিক্ত টিকাদান কর্মসূচি বাতিল, টিকা সংগ্রহে প্রশাসনিক বিলম্ব এবং ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীকে সময়মতো শনাক্ত করতে না পারার মতো বিষয়গুলোকে সংকটের সম্ভাব্য কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশে হামের সংক্রমণ এখনো অব্যাহত রয়েছে এবং প্রতিদিন নতুন রোগী শনাক্তের পাশাপাশি মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে। ফলে শিশুদের টিকাদান, আক্রান্তদের দ্রুত শনাক্তকরণ এবং সময়মতো চিকিৎসা নিশ্চিত করা নিয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ অব্যাহত রয়েছে।
সুত্রঃ এনডিটিভি