ঢাকায় ফিরলেও বাইরে বের হতে ভয় পাচ্ছেন বাঁধন, ভেনিসের হামলার ট্রমা কাটেনি এখনও
ওটিএন বাংলা রিপোর্ট : ইতালির ভেনিসে হামলা ও হেনস্তার ঘটনার এক মাস পেরিয়ে গেলেও সেই অভিজ্ঞতার মানসিক ধকল কাটিয়ে উঠতে পারেননি অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধন।…
ওটিএন বাংলা রিপোর্ট : ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন রোববার (১ নভেম্বর) হঠাৎ সহিংস রূপ নেয়। রাজধানীর মিরপুর, সাভার-আশুলিয়া ও গাজীপুরের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে দিনভর বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এতে যান চলাচল ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বন্ধ হয়ে যায় বহু কারখানার উৎপাদন।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) তথ্য অনুযায়ী, এদিন বিকেল সাড়ে ৩টা পর্যন্ত পাঁচটি শিল্পাঞ্চলের ৫২৯টি কারখানার শ্রমিকেরা কর্মস্থল ছেড়ে বেরিয়ে যান। কাজে যোগ দেননি প্রায় ৯ লাখ ৮৭ হাজার শ্রমিক। তবে এসব কারখানার সবগুলো বন্ধ ছিল না; শ্রম অসন্তোষের কারণে ৩১৮টি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ ছিল।
মিরপুর-১০ ও মিরপুর-১১ এলাকায় শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। একপর্যায়ে পুলিশের গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। কয়েকটি দোকান ও ব্যাংকের শাখায় ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করে। গাজীপুর ও আশুলিয়াতেও সড়ক অবরোধ, সংঘর্ষ ও অগ্নিসংযোগের খবর পাওয়া যায়।
আন্দোলনের তীব্রতা বাড়লেও মূল দাবি একই—মাসিক ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ। বর্তমানে পোশাকশ্রমিকদের সর্বনিম্ন মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা। দ্রব্যমূল্য, বাসাভাড়া, চিকিৎসা ও যাতায়াত ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় এই মজুরিতে সংসার চালানো কঠিন বলে দাবি শ্রমিকদের। বকেয়া বেতন পরিশোধ, ছাঁটাই বন্ধ এবং কালোতালিকাভুক্ত শ্রমিকদের কাজে ফেরানোর দাবিও রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে রোববার সকালে পোশাক খাতের জন্য ছয় সদস্যের নতুন নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা দেন শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। বোর্ডের কাজ হবে শ্রমিকদের জন্য নতুন মজুরি কাঠামো পর্যালোচনা ও সুপারিশ করা। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, দাবি বিবেচনায় নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে; তাই শ্রমিকদের কাজে ফিরে যাওয়া উচিত।
তবে মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণার পরও আন্দোলন থামেনি। শ্রমিকদের বক্তব্য, বোর্ড গঠন আর বাস্তবে মজুরি বাড়ানো এক বিষয় নয়। অতীতেও মজুরি নির্ধারণের পর জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে তার সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তাই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নতুন মজুরি কার্যকর করার নিশ্চয়তা চান তাঁরা।
আন্দোলন ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্কও তৈরি হয়েছে। শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী অভিযোগ করেছেন, শ্রমিকদের ন্যায্য দাবিকে ব্যবহার করে কিছু রাজনৈতিক শক্তি শিল্প খাতে অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করছে। তাঁর দাবি, শ্রমিকদের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক নেই—এমন গোষ্ঠী বিভিন্ন সংগঠনের মাধ্যমে পরিস্থিতি ঘোলাটে করছে।

গাজীপুরে পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের সংঘর্ষ। ছবি: সংগৃহীত
শিল্প পুলিশও আন্দোলনে তৃতীয় পক্ষের ইন্ধনের আশঙ্কা প্রকাশ করেছে। শিল্প পুলিশের প্রধান গাজী জসিম উদ্দিন বলেছেন, মজুরি বোর্ড গঠনের পরও সহিংস বিক্ষোভ অব্যাহত থাকায় এর পেছনে তৃতীয় পক্ষের প্ররোচনা থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এই অভিযোগের পক্ষে তদন্তে পাওয়া সুনির্দিষ্ট প্রমাণ প্রকাশ করা হয়নি।
মিরপুরে পুলিশের গাড়িতে আগুন ও ভাঙচুরের ঘটনায় রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও সামনে এসেছে। পুলিশ দাবি করেছে, সাবেক এক সংসদ সদস্যের স্বজন আলিফ মোল্লা শতাধিক ব্যক্তিকে আন্দোলনে যুক্ত হতে সংগঠিত করেছিলেন। গোয়েন্দা পুলিশের একটি সূত্রের দাবি, নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাকর্মীদের কয়েকজনও সহিংসতায় জড়িত ছিলেন। এসব অভিযোগের সত্যতা তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হবে।
রোববার সন্ধ্যায় শ্রমিক অসন্তোষ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেন শ্রমমন্ত্রীসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কারখানার স্বাভাবিক উৎপাদন, মানুষের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। বৈঠক শেষে মন্ত্রী বলেন, ডিসেম্বরকে সামনে রেখে সরকারকে অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্রের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
পোশাক খাত বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। প্রায় ৪০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে এ খাত থেকে। ফলে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা তৈরি হলে উৎপাদন, রপ্তানি আদেশ, বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা এবং শ্রমিকদের আয়—সবকিছুই ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
শিল্প মালিকদের পক্ষ থেকেও উদ্বেগ জানানো হয়েছে। উৎপাদন বন্ধ থাকলে নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ কঠিন হয়ে পড়বে। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা, উৎপাদন ব্যয় ও জ্বালানি সংকটের মধ্যে মজুরি বাড়ানোর চাপ সামলানো কঠিন বলেও মালিকপক্ষের যুক্তি। অন্যদিকে শ্রমিকদের প্রশ্ন, শিল্পের আয় ও রপ্তানি বাড়লেও তাঁদের জীবনযাত্রার মান কেন সেই অনুপাতে উন্নত হচ্ছে না।
আন্দোলনের বিস্তার ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সতর্ক অবস্থানে রাখা হয়েছে। গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। অন্যদিকে সহিংসতার ঘটনায় আটক ও গ্রেপ্তারের খবরও এসেছে। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার নামে যেন শান্তিপূর্ণ আন্দোলন দমন না হয়, সে বিষয়েও সতর্ক থাকার দাবি শ্রমিক সংগঠনগুলোর।
এখন বড় প্রশ্ন, মজুরি বোর্ডের মাধ্যমে শ্রমিকদের আস্থা ফিরবে, নাকি আন্দোলন আরও ছড়িয়ে পড়বে? শ্রমিকদের দাবি, মালিকপক্ষের সামর্থ্য এবং সরকারের রাজনৈতিক অবস্থানের মধ্যে সমঝোতা না হলে সংকট কাটবে না। দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য মজুরি নির্ধারণ না হলে শিল্পাঞ্চলে উত্তেজনা আবারও বাড়তে পারে।
ঢাকার জন্যও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। মিরপুরসহ রাজধানীর শিল্পাঞ্চলে নতুন করে অবরোধ বা সংঘর্ষ হলে গণপরিবহন, অফিস-আদালত ও স্বাভাবিক জনজীবন ব্যাহত হবে। একই সঙ্গে পোশাক খাতের উৎপাদন ও রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি, রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং শিল্পের স্থিতিশীলতা—এই তিনের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠাই এখন সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au